১৯৯৯ থেকে ২০১৯ সময়কালে কৃষি উৎপাদনের মোট মূল্য বার্ষিক গড়ে ৩ দশমিক ৫৪ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি, কৃষি উপকরণের ওপর ক্রমবর্ধমান নির্ভরতা এবং ফসল-পরবর্তী ক্ষতিসহ নানামুখি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে এ খাত। ১৯৭০-এর দশকে দেশের জিডিপিতে কৃষি খাতের অংশ ছিল প্রায় ৩৮ শতাংশ, যা বর্তমানে কমে ১১ দশমিক ২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। কৃষি খাতে সরকারি বিনিয়োগ ও নীতিগত গুরুত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে। সঙ্গত কারণে বাজেটে এ খাতে মোট বরাদ্দও কিছুটা বেড়েছে। কিন্তু এর সুফল ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের কাছে কার্যকরভাবে পৌঁছে দেয়ার ক্ষেত্রে এখনও নানা ঘাটতি রয়ে গেছে।

সম্প্রতি রাজধানী ঢাকার গুলশানের একটি হোটেলে ’জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭: ফসলভিত্তিক কৃষি বিষয়ক কৌশলগত আলোচনা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বিশিষ্টজনরা এ অভিমত ব্যক্ত করেন। আন্তর্জাতিক কনসালট্যান্ট প্রতিষ্ঠান লাইটক্যাসল পার্টনার্স ও সুইজারল্যান্ড ভিত্তিক বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা সাসটেইনবল এগ্রিকালচার ফাউন্ডেশন (এসএএফ) যৌথভাবে এ বৈঠকের আয়োজন করে।

২০২৬-২৭ অর্থবছরে কৃষি খাত উন্নয়নে প্রস্তাবিত বাজেটে বরাদ্দ, প্রধান কৌশল, নীতিগত দিকনির্দেশনাগুলো অগ্রাধিকার দেয়া ও বাস্তবায়নের সুপারিশ তুলে ধরতে এ বৈঠকের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস প্রফেসর এবং এসএএফ বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. এম. এ. সাত্তার মণ্ডল। সূচনা বক্তব্য দেন লাইটক্যাসল পার্টনার্সের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাহেদুল আমিন। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন লাইটক্যাসল পার্টনার্সের সোশ্যাল রিসার্চ অ্যান্ড ইমপ্যাক্ট অ্যাডভাইজার জীশান আবেদিন। সমাপনী বক্তব্য দেন এসএএফ বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক মো. ফরহাদ জামিল।

উপস্থাপনায় বলা হয়, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে কৃষি মন্ত্রণালয়ের জন্য ২৮ হাজার ৮৮১ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যার মধ্যে উন্নয়ন ব্যয়ের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৭ হাজার ৯৪৬ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরে কৃষি মন্ত্রণালয়ের মূল বরাদ্দ ছিল ২৭ হাজার ২২৪ কোটি টাকা। আরো বলা হয়েছে, কৃষি ভর্তুকি বরাদ্দ প্রায় ১ দশমিক ৪ শতাংশ কমানো হয়েছে এবং শিল্প খাতের জন্য কিছু প্রণোদনা কর-সুবিধার মাধ্যমে স্থানান্তর করা হয়েছে।

তবে বরাদ্দ করা অর্থের ব্যবহার নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন আলোচকরা। ২০২২-২৩ অর্থবছরে এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল ৯৩ শতাংশ এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ছিল ৯৫ শতাংশ। কিন্তু ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কমে ৬০ শতাংশ এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৬২ শতাংশে নেমে আসে।

এ সময় সাবেক সচিব ও বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের বোর্ড পরিচালক আনোয়ার ফারুক বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর শুল্ক হ্রাস, সার উপকরণের কর ছাড় এবং কৃষক কার্ড কর্মসূচি সম্প্রসারণসহ বেশ কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ রয়েছে। তবে এসব সুবিধা কার্যকরভাবে কৃষকদের কাছে পৌঁছাতে হবে এবং উৎপাদন ব্যয় কমাতে বাস্তবসম্মত ভূমিকা নিতে হবে।

আলোচকরা বলেন, বরাদ্দ করা অর্থের যথাযথ ব্যবহার না হওয়ায় কৃষির আধুনিকায়ন ও সামগ্রিক উন্নয়ন ব্যাহত হচ্ছে। তারা বাজেটে কৃষি ও কৃষকের উন্নয়নে বাজার ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন, ফসল-পরবর্তী ক্ষতি হ্রাস এবং কৃষকদের আরো কার্যকর সহায়তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

আলোচনায় আরো অংশ নেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অ্যাডমিন অ্যান্ড ফাইন্যান্স (প্রশাসন ও অর্থ) বিভাগের পরিচালক মো. হাবিবুল্লাহ, বরেন্দ্র বহুমূখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ও কৃষিবিদ মো. হাসান জাফির তুহিন, বাংলাদেশ এগ্রিকালচারাল রিচার্স কাউন্সিলের (বিএআরসি) সাবেক নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. ওয়াইজ কবির, বাংলাদেশস্থ নেদারল্যান্ডস দূতাবাসের সিকিউরিটি অ্যান্ড এগ্রিকালচার বিষয়ক সিনিয়র পলিসি অ্যাডভাইজার একে ওসমান হারুনি, বিশ্ব ব্যাংকের প্রতিনিধি প্রমুখ।