আসন্ন কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে শুরু হয়েছে পশু কেনাবেচা। দেশে চাহিদার চেয়ে কোররবানির পশুর অতিরিক্ত জোগান রয়েছে ২২ লাখেরও বেশি। তবু দাম কিছুটা বাড়বে বলে জানিয়েছেন খামারিরা। এক্ষেত্রে গো-খাদ্যের ২০-৩০ শতাংশ পর্যন্ত মূল্যবৃদ্ধি এবং সার্বিক লালন-পালন ব্যয় বেড়ে যাওয়াকে কারণ হিসেবে সামনে আনছেন তারা। আবার সাম্প্রতিক তীব্র তাপপ্রবাহে পশুর জন্য বাড়তি যত্ন নিতে গিয়েও ব্যয় বাড়ছে তাদের। তাই এবার পশুর দাম ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।

যদিও এবার অন্য সময়ের তুলনায় পশুর অর্ডার সেভাবে আসছে না। খামারিরা জানিয়েছেন, এখনো পশু বিক্রির চাহিদা সেভাবে দেখা যাচ্ছে না। তবে কভিড-১৯ মহামারী এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে পশুখাদ্যের দাম বাড়ার পর আর কমেনি। পাশাপাশি ফসলের মৌসুম হওয়ায় বেড়েছে শ্রমিকের বেতন। তীব্র গরমে আইপিএস ব্যহার করতে হচ্ছে। ২৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহে বাড়ছে বিল। বাড়তি যত্ন নিতে গিয়ে লালন-পালনের ব্যয়ও বেড়েছে। তাই গতবারের তুলনায় এবার দাম কিছুটা বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন খামারিরা।

তবে কৃষি অর্থনীতিবিদরা বলছেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রভাবে এবার অধিকাংশ মানুষের আর্থিক অবস্থা ভালো না। তাই পশুর চাহিদা কমে গিয়ে বিক্রি আগের তুলনায় বেশি নাও হতে পারে। এতে অনেক পশু অবিক্রীত থেকে যেতে পারে। ফলে বিপাকে পড়তে পারেন খামারিরা।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে এবার গবাদিপশুর সর্বোচ্চ সম্ভাব্য চাহিদা ১ কোটি ৭ লাখ ২ হাজার ৩৯৪টি। যার বিপরীতে দেশে কোরবানিযোগ্য পশু আছে ১ কোটি ২৯ লাখ ৮০ হাজার ৩৬৭টি। যা গত বছরের তুলনায় ৪ লাখ ৪৪ হাজার ৩৪টি বেশি। সে হিসেবে চাহিদার চেয়ে ২২ লাখ ৭৭ হাজার ৯৭৩টি অতিরিক্ত গবাদিপশু রয়েছে। এসব পশুর মধ্যে গরু ৫২ লাখ ৬৮৪টি, মহিষ ১ লাখ ৬০ হাজার ৩২০টি, ছাগল ৬৮ লাখ ৫০ হাজার ৫৮টি, ভেড়া ৭ লাখ ৬৭ হাজার ৭৪৩টি এবং অন্য প্রজাতির ১ হাজার ৮৫০টি পশু রয়েছে।

পশুর খাবারের দাম নিয়মিত প্রকাশ করে থাকে ইন্টিগ্রেটেড ডেইরি রিসার্চ নেটওয়ার্ক (আইডিআরএন)। সংস্থাটির তথ্যমতে, বছরের ব্যবধানে পশুখাদ্যের দাম বেড়েছে ২০ শতাংশ পর্যন্ত। এ বিষয়ে সংস্থাটির প্রধান সমন্বয়ক বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পশুপালন বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মুহিউদ্দীন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌আমাদের মূলত সয়ামিল, ভুট্টা ও গম আমদানি করতে হয়। এখন আমরা পুরোপুরি আমদানিনির্ভর না। তবে বিশ্ববাজারের চেয়ে দেশে সবসময় ১০ শতাংশ বেশি দাম থাকে। গত বছরের মার্চের পর বিশ্ববাজারে বাড়ার কারণে দেশে দাম বাড়লেও পরে আর কমেনি। গতবারের তুলনায় এবার পশুখাদ্যের দাম বেড়েছে প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত।’

খামারিরাও উৎপাদন ব্যয় বাড়ায় বাড়তি দাম না পেলে লোকসানে পড়বেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। এ বিষয়ে বগুড়ার ভান্ডার এগ্রোর মালিক বিপ্লব বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌এবার পশুর খাবারের দাম বেড়েছে ৩০-৪০ শতাংশ। গরমের কারণে সবসময় ফ্যান চালাতে গিয়ে বিদ্যুৎ বিল বেশি আসছে। তাও গরমে অনেকের গরু মারা যাচ্ছে। গরু খাবার কম খাচ্ছে। ফলে ওজন কমে যাচ্ছে। তাই এত ব্যয়ের পর এবার বাড়তি দাম না পেলে আমাদের লস হয়ে যাবে।’

চট্টগ্রাম প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর জানায়, চট্টগ্রামে প্রায় দেড় কোটি জনসংখ্যার জন্য কোরবানির পশুর চাহিদা প্রায় ৮ লাখ ৭৯ হাজার ৭৬৫টি। সেখানে চট্টগ্রাম মহানগরসহ বিভিন্ন উপজেলা থেকে ব্যক্তিগত ও খামার পর্যায়ে কোরবানির জন্য পশুর প্রাপ্যতা আছে ৮ লাখ ৪২ হাজার ৩৫৯টি। অর্থাৎ প্রায় ৩৭ হাজার ৪০৬টির মতো কোরবানির পশুর ঘাটতি রয়েছে। এ বিষয়ে চট্টগ্রাম জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. নজরুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌মূলত চট্টগ্রাম মহানগর ও বাণিজ্যিক এলাকা হওয়ায় কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, যশোর এবং উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গের খামারিরা কোরবানির পশু এখানে বিভিন্ন হাটে বিক্রি করতে নিয়ে আসেন।’ চট্টগ্রামে কাগজে-কলমে উৎপাদন কম থাকলেও বাস্তবে তেমন কোনো সংকট হয় না বলে জানান তিনি।

খাবারের দামের পাশাপাশি তীব্র দাপদাহের প্রভাব পড়ছে পশু ব্যবসায়। তাই অনেক ছোট ব্যাপারী ঢাকার মতো দূর গন্তব্যে গরু আনার সাহস পাচ্ছেন না। এ বিষয়ে নেত্রো এগ্রোর মালিক নাদিম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌চলমান তাপপ্রবাহ না কমলে পশুর রোগবালাই বাড়তে পারে। তাছাড়া তীব্র গরমে রাস্তায় গরু মরে যাওয়ার আশঙ্কায় অনেক ছোট ব্যাপারী এবার ঢাকায় গরু পাঠাবেন না।’

গরমের কারণে পশুর বাড়তি খরচের বিষয়ে জারিফ এগ্রোর এই স্বত্বাধিকারী বলেন, ‘‌অতিরিক্ত গরমের কারণে আইপিএস দিয়ে ফ্যান চালাতে হচ্ছে। দিনে দুবার গোসল করাতে হচ্ছে। পশুকে ২৪ ঘণ্টা বাতাসের মধ্যে রাখতে হয়। খাবারের সঙ্গে সোডা দিতে হয়। প্রতিনিয়ত শ্বাস-প্রশ্বাস পরীক্ষা করতে হয়। আবার ফসলের মৌসুম হওয়ায় শ্রমিকের মজুরি বেশি দিতে হচ্ছে।’

দেশে প্রচলিত পশুখাদ্যের উপাদানগুলোর মধ্যে রয়েছে সয়াবিন খৈল, গমের ভুসি, রাইস পলিশ, মসুর ভুসি, সরিষার খৈল, ভুট্টা, মুগ ভুসি ও মটর ভুসি। এসব উপাদানের দাম এবার ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। এ বিষয়ে সিরাজগঞ্জের আব্দুল কুদ্দুস জানান, ১০ বছর আগে গমের ভুসি ছিল ৮-১০ টাকা কেজি। এখন তা প্রতি কেজি ৬০-৬২ টাকা। এক মণ খেসারি ডালের ভুসির দাম ১ হাজার ৪০০ টাকা। এক মণ খড়ের দাম এখন ৫০০-৬০০ টাকা, যা গত বছর ছিল ৩০০ টাকা।

আরেক খামারি জিয়াউর রহমান বলেন, ‘‌এক বছরে গো-খাদ্য বস্তাপ্রতি ২০০-৩০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। গমের ভুসির দাম বস্তাপ্রতি বেড়েছে ২০০ টাকা। ডালের ভুসি ৫০০ থেকে বেড়ে এখন ৮০০ টাকা।’

অনেক ব্যাপারী শুধু কোরবানির জন্যই কয়েক মাস আগে পশু কিনে ব্যবসা করেন। তাদের মতো একজন শহীন। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘‌৬৫ হাজার টাকায় গরু কিনেছি। ২০ হাজার টাকার খাবার খাওয়ানো হয়েছে। এখন যদি ১ লাখ থেকে ১ লাখ ১০ হাজার টাকা দাম না পাই তাহলে পোষাবে না।’

এদিকে এবার দাম বাড়লেও পশুর চাহিদা কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন কৃষি অর্থনীতিবিদরা। এ বিষয়ে কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে এবার দেশের অধিকাংশ মানুষের অর্থিক অবস্থা ভালো না। তাই অনেকে এবার যৌথভাবে কোরবানি দেবে। আবার যারা যৌথভাবে দিত, তারা হয়তো খাসির মতো ছোট পশুতে ঝুঁকবে। তাই এবার সর্বোচ্চ ১ কোটি ৫ লাখ পশু বিক্রি হতে পারে। অনেক পশু অবিক্রীত অবস্থায় থাকতে পারে। ফলে সমস্যায় পড়তে পারেন খামারিরা। আর পশুখাদ্য ও ওষুধের দাম বাড়ায় এবার পশুর মূল্য ২০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।’

তবে বাড়তি উৎপাদন ব্যয় এরই মধ্যে সমন্বয় হয়ে যাওয়ায় দাম আর বাড়বে না বলে মনে করছেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি বিভাগের চেয়ারম্যান ড. রিপন কুমার মণ্ডল। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘‌গরুর মাংস এরই মধ্যে ৭০০ টাকার বেশি হয়ে গেছে। ৬০০ টাকা কেজি হলেই দাম উঠে লাভ থাকে। তাই নতুন করে আর দাম বাড়ার আশঙ্কা নেই। কারণ দামটা চাহিদা ও জোগানের ওপর নির্ভর করে।’

গতবারের তুলনায় এবার অগ্রিম বুকিং কম হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ডেইরি ফার্মার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. ইমরান হোসেন। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘‌চাহিদার চেয়ে অনেক বেশি পশু থাকায় এবার দাম বেশি না। আমরা গতবার কেজিতে ৫২৫ টাকা করে বিক্রি করলেও এবার কেজিপ্রতি ৫০০ টাকা করে বিক্রি করছি। কারণ যেসব গরু বড় করেছি তা ঈদের সময়ই বিক্রি করতে হবে। লস হলেও বিক্রি করতে হবে। তবে গরমের কারণে ঢাকার বাইরে থেকে গরু কম এলে দাম বাড়তে পারে। কারণ গরমে গরু ট্রাকে হিট স্ট্রেসে পড়তে পারে। আবার বিক্রি না হলে গরু ফেরত নিয়ে গেলে অনেক টাকা ব্যয় হয়ে যায়। তাই অনেকে এবার ঢাকায় গরু নাও আনতে পারেন।’

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মো. আব্দুর রহমান গত বৃহস্পতিবার এ প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের বলেন, ‘‌চোরাই পথে যেন পশু না আসে, সে ব্যাপারে আমরা সতর্ক ও সজাগ থাকব।’ পশুর দাম নিয়ে তিনি বলেন, ‘‌চাহিদা ও সরবরাহে পার্থক্য থাকলে দামটা সামনে আসে। এবার যেহেতু যাচাই-বাছাই করে পশু উৎপাদনের পরিসংখ্যান তৈরি করা হয়েছে, তাই চাহিদা জোগানে বেশি পার্থক্য থাকবে না। সেজন্য মনে হয় দাম ঠিকই থাকবে।’

(প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন বণিক বার্তার চট্টগ্রাম ব্যুরো দেবব্রত রায় ও সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি অশোক ব্যানার্জী)