ঈদুল ফিতর সামনে রেখে চাঁদপুরের ৫৫ হাজার জেলে পরিবারে চলছে হতাশা, নেই কোনো আনন্দ তাদের মাঝে। সর্বত্র ঈদের কেনাকাটা, প্রাণচাঞ্চল্য থাকলেও জেলেপাড়ায় বিপরীত। জেলায় সরকারিভাবে নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ৪৫ হাজার। সরকারি-বেসরকারি মিলে ৫৫ হাজার জেলে রয়েছেন।
জানা যায়, জাটকা রক্ষায় দুই মাস মার্চ-এপ্রিল নদীতে মাছ ধরা বন্ধ। আয়-রোজগার নেই তাদের। সরকার যা দিয়েছে সেই পর্যন্ত সীমাবদ্ধ। জেলা প্রশাসন থেকে উপহার জিআরওর ১০ কেজি করে চাল দেয়া হয়েছে বলে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. গোলাম মেহেদী হাসান গতকাল (৭ মার্চ) বণিক বার্তাকে জানান।
তিনি আরো জানান, প্রতিজনকে প্রতি মাসে ৪০ কেজি করে ১৬০ কেজি চাল দেয়া হচ্ছে। এর মধ্যে ফেব্রুয়ারি, মার্চ ও এপ্রিল—এ তিন মাসের চাল দেয়া শেষ হয়েছে। ঈদের পর মে মাসের চাল বিতরণ করা হবে। জেলেদের বিকল্প আয় বাড়ানোর উপকরণ হিসেবে সেলাই মেশিন, ছাগল, গরু ও পরিবেশবান্ধব জালসহ বিভিন্ন উপকরণ দেয়া হয়েছে, যা তাদের নিয়মিত প্রণোদনা। বিশেষ কোনো উৎসবের জন্য নয়। ঈদুল ফিতর উপলক্ষে বিশেষ কোনো প্রণোদনা নেই জেলেদের জন্য বলে জানিয়েছেন জেলা মৎস্য কর্মকর্তা।
অন্যদিকে নিবন্ধনের বাইরে থাকা জেলেরা কিছুই পাননি। তারা মানবিক জীবনযাপন করছেন। তাদের পরিবারেও একই অবস্থা বিরাজ করছে। আসন্ন ঈদুল ফিতর উপলক্ষে সন্তানদের জন্য নতুন পোশাক কিনতে পারছেন না । ঈদের দিন চিনি-সেমাই কেনারও সামর্থ্য নেই অনেকের বলে জেলেরা জানান। কেউ কেউ আশা করছেন, শেষ মুহূর্তে বিভিন্ন সংস্থা, ব্যক্তি থেকে কিছু ঈদ উপলক্ষে কিছু প্রণোদনা পাবেন।
স্থানীয় প্রশাসন থেকে জানা গেছে, ঈদ উপলক্ষে বিপুলসংখ্যক জেলেকে সহযোগিতা করা আপাতত সম্ভব না হলেও কয়েকশ অতিদরিদ্র জেলেকে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে ঈদ উপহার দেয়া হয়েছে।
নদীর তীরে দেখা যায়, মাছ ধরা বন্ধ থাকায় বেকার সময় পার করছেন অধিকাংশ জেলে। সামনে ঈদ অথচ তাদের মন মরা, তারা হতাশ। আনন্দ নেই। অনেকে জাল সেলাই এবং নৌকা মেরামতকাজে ব্যস্ত।
সদর উপজেলার বহরিয়ার জেলে মোবারক বলেন, ‘ঈদে ছেলেমেয়ে, বাবা-মাকে নতুন কাপড় কিনে দিতে পারিনি। ঈদের বাজার করার সামর্থ্য নেই। সেমাই-চিনি কিনতেও পারব না। ঈদ আমাদের মাটি হয়ে গেছে।’
হাইমচরের জেলে জুম্মন জানান, ‘আমাগো কোনো কামকাজ নাই। ঈদ আসতেছে। বাচ্চাদের কিছু দিতে পারিনি। বেতন দিতে পারি না। ঈদে আমাগো কোনো উপায় নাই। চলতেই তো কষ্ট হইতাছে। আমাদের কাছে টেকা-পয়সা নাই, চিনি-সেমাই যতটুকু হোক, গোশত তো চোখে দেখব না।’
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. গোলাম মেহেদী হাসান বলেন, ‘জেলেদের সেলাই মেশিন, ছাগল, গরু ও পরিবেশবান্ধব জালসহ বিভিন্ন উপকরণ দেয়া হয়েছে, যা তাদের জীবনমান উন্নয়নে এগুলো করা হচ্ছে। ভিজিএফ কর্মসূচির আওতায় নিবন্ধনকৃত প্রত্যেক জেলেকে প্রতি মাসে ৪০ কেজি করে চার মাসে ১৬০ কেজি চাল দেয়া হয়। বাকি এক মাসের চাল সহযোগিতা ঈদের পরে দেয়া হবে।’
চাঁদপুরের জেলা প্রশাসক কামরুল হাসান বলেন, ‘বর্তমান সরকার জেলেদের চাল, বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন সময় সহযোগিতা করছে। ঈদ সামনে রেখে এরই মধ্যে জেলেদের প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে ঈদ উপহার দেয়া হয়েছে। সবাইকে দেয়া সম্ভব হয়নি। তবে যারা খুব দরিদ্র তাদের ঈদ উপহার দেয়া হয়েছে। এছাড়া নিবন্ধিত সব জেলেকে ঈদের আগেই সরকারি চাল সহায়তা দেয়া হয়েছে। তাদের সহায়তা বাড়ানোর বিষয়টি সরকারিভাবে চিন্তা করতে হবে।’
উল্লেখ্য, জাটকা রক্ষা ও ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধিতে সরকার মতলব উত্তর উপজেলার ষাটনল থেকে লক্ষ্মীপুর জেলার চর আলেকজান্ডার পর্যন্ত ১০০ কিলোমিটার, চাঁদপুর সদর উপজেলার রাজরাজেশ্বর থেকে শরীয়তপুর জেলার ভেদরগঞ্জ উপজেলার তারাবুনিয়া থেকে নড়িয়া উপজেলার ভোমকারা পর্যন্ত পদ্মা নদীর ২০ কিলোমিটারসহ মোট পাঁচটি অভয়াশ্রম অঞ্চলের প্রায় ৪০০ কিলোমিটার নদী অঞ্চলে মার্চ-এপ্রিল দুই মাস অভয়াশ্রম ঘোষণা করে সব ধরনের জাল ফেলা ও মাছ ধরা নিষিদ্ধের কার্যক্রম চলছে। এ সময় অভয়াশ্রম অঞ্চলে লাখ লাখ জেলে পরিবার বেকার হয়ে পড়ে। সরকার অভয়াশ্রমে ক্ষতিগ্রস্ত জেলে পরিবারকে নিবন্ধিত করে ফেব্রুয়ারি থেকে মে—চার মাস; প্রতি মাসে ৪০ কেজি করে ভিজিএফ চালসহ বিভিন্ন সহায়তা দিয়ে থাকে।










