মাথায় ঝলমলে মুকুট, সামনে আলোকোজ্জ্বল মঞ্চ, আর সারা বিশ্বের কোটি মানুষের নজর—মিস ইউনিভার্স হওয়ার অভিজ্ঞতা নিঃসন্দেহে স্বপ্নের মতো। তবে এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বড় দায়িত্ব, নিয়মিত ভ্রমণ, গণমাধ্যমের সামনে উপস্থিতি এবং নানা সামাজিক কর্মকাণ্ড। সঙ্গে রয়েছে মোটা অঙ্কের অর্থ, নিউইয়র্কে থাকার ব্যবস্থা, ব্যক্তিগত স্টাইলিস্টসহ নানা সুযোগ-সুবিধা। অবশ্য সবচেয়ে দামি যে জিনিসটি, সেই মুকুটটি কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিজের করে রাখা যায় না!

মডেল ও অভিনেত্রী সামিরা খান মাহি এবার মিস ইউনিভার্সের মঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে যাচ্ছেন। গতকাল রাতে ‘মিস ইউনিভার্স বাংলাদেশ’-এর মুকুট জিতে এ সুযোগ নিশ্চিত করেছেন তিনি। আগামী ২৪ নভেম্বর ক্যারিবীয় দ্বীপাঞ্চল পুয়ের্তো রিকোয় বসবে প্রতিযোগিতাটির ৭৫তম আসর।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত যদি তিনিই জিতে যান, তাহলে কী অপেক্ষা করছে তার জন্য? শুধু মুকুট আর পরিচিতিই নয়, মিস ইউনিভার্সের খেতাবের সঙ্গে জড়িয়ে আছে কোটি টাকার সুযোগ-সুবিধার প্যাকেজ।

মুকুটের সঙ্গে মোটা অঙ্কের অর্থ

মিস ইউনিভার্স কর্তৃপক্ষ পুরস্কারের আনুষ্ঠানিক আর্থিক হিসাব প্রকাশ করে না। তবে গত বছরের প্রতিযোগিতার পুরস্কার প্যাকেজ নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বেশ কিছু তথ্য উঠে এসেছে।

২০২৫ সালের নভেম্বরে মিস ইউনিভার্সের মুকুট জেতেন মেক্সিকোর ফাতিমা বশ। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়, পুরস্কার হিসেবে তিনি পেয়েছেন আড়াই লাখ ডলার, বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় তিন কোটি টাকার বেশি। এর বাইরে মাসে ৫০ হাজার ডলার, অর্থাৎ প্রায় ৬১ লাখ টাকার ভাতাও পাওয়ার কথা রয়েছে তার।

তবে এই মাসিক অর্থকে সরাসরি বেতন ভাবলে ভুল হবে। মিস ইউনিভার্স কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে শুভেচ্ছাদূত হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য প্রাথমিক তহবিলের পাশাপাশি মাসিক অর্থ দেয়া হয়। ভ্রমণ, সাক্ষাৎকার ও বিভিন্ন প্রকল্পের খরচ মেটাতেই মূলত এই অর্থ বরাদ্দ।

samira_khan_mahi

নিউইয়র্কে বাড়ি, সঙ্গে ব্যক্তিগত স্টাইলিস্ট

অর্থের পাশাপাশি মিস ইউনিভার্স বিজয়ীকে এক বছরের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরে থাকার ব্যবস্থা করে দেয়া হয়। গত বছরের পুরস্কার প্যাকেজের বিবরণে ছিল ভ্রমণের সম্পূর্ণ আয়োজন, ব্যক্তিগত স্টাইলিস্ট, চুল ও মেকআপ বিশেষজ্ঞ এবং সৌন্দর্য ও স্বাস্থ্যসেবা।

বছরের বেশির ভাগ সময় যাকে বিমানে বিমানে ঘুরতে হবে, ক্যামেরার সামনে দাঁড়াতে হবে এবং বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নিতে হবে, তার জন্য এসব সুবিধা বিলাসিতা নয়, বরং কাজেরই অংশ।

পাঁচ মিলিয়ন ডলারের মুকুট, তবে নিজের নয়!

মিস ইউনিভার্স বিজয়ীর সবচেয়ে আকর্ষণীয় অনুষঙ্গ নিঃসন্দেহে তার মাথার মুকুট। তবে সেটি আজীবনের সম্পত্তি হয়ে যায় না।

গত বছরের বিজয়ী ফাতিমা বশের মাথায় উঠেছিল ‘লুমিয়ের দে লা ইনফিনি’ নামের একটি মুকুট। গয়না প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান জুয়েলমারের তৈরি এই মুকুটের আনুমানিক মূল্য ৫০ লাখ ডলার, বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় ৬১ কোটি টাকা।

তবে বিজয়ী পুরো বছর বিভিন্ন আনুষ্ঠানিক আয়োজনে মুকুটটি পরার সুযোগ পান। পরের বছর নতুন বিজয়ীর মাথায় মুকুট পরিয়ে দেয়ার মধ্য দিয়ে শেষ হয় তার রাজত্ব। অর্থাৎ এত দামি মুকুট মাথায় উঠলেও সেটি ব্যাংকের লকারে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই!

শুধু মুকুট নয়, খুলে যায় বিনোদনজগতের দরজাও

মিস ইউনিভার্সের এক বছরের দায়িত্ব শেষ হওয়ার পরও অনেক বিজয়ীর সামনে খুলে যায় নতুন সম্ভাবনার দরজা। আন্তর্জাতিক পরিচিতি কাজে লাগিয়ে তারা যুক্ত হন বিভিন্ন ব্র্যান্ডের প্রচার, টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রে। অবশ্য সামিরা খান মাহি আগে থেকেই মডেলিং ও অভিনয় জগতে পরিচিত মুখ।

samira_khan_mahi1

জাতীয় পর্যায়েও পুরস্কারের কমতি নেই

শুধু আন্তর্জাতিক মঞ্চের বিজয়ীরাই নন, জাতীয় পর্যায়ের সুন্দরী প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের জন্যও থাকে বড় পুরস্কার প্যাকেজ।

যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৬ সালের মিস ইউএসএ বিজয়ী জাস্টাস কেলি পেয়েছেন ৬ লাখ ৮৫ হাজার ডলারের বেশি মূল্যের পুরস্কার প্যাকেজ। বাংলাদেশী মুদ্রায় যা প্রায় ৮৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে রয়েছে দেড় লাখ ডলারের বেতন, একটি রেঞ্জ রোভার গাড়ি, মায়ামিতে বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্টে থাকার ব্যবস্থা এবং মিস ইউনিভার্স প্রতিযোগিতার জন্য পোশাক।

৩১ বছর বয়সী কেলি প্রতিযোগিতাটির ইতিহাসে প্রথম বিবাহিত নারী ও মা হিসেবে এই খেতাব জিতেছেন। প্রতিযোগিতার নিয়ম পরিবর্তনের ফলে বিবাহিত নারী ও মায়েদের অংশ নেয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছিল।

মাহির সামনে এখন বিশ্বমঞ্চ

বাংলাদেশের হয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে লড়তে যাচ্ছেন সামিরা খান মাহি। রাজধানীর ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটি বসুন্ধরায় অনুষ্ঠিত ‘মিস ইউনিভার্স বাংলাদেশ ২০২৫’-এর গ্র্যান্ড ফিনালেতে বিজয়ী হিসেবে তাঁর নাম ঘোষণার পর আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি। গত বছরের বিজয়ী তানজিয়া জামান মিথিলা তার মাথায় মুকুট পরিয়ে দেন। অনুষ্ঠানে অভিনেত্রী তমা মির্জাও উপস্থিত ছিলেন।

এর আগে ২০১৯ সালে শিরিন শিলা, ২০২৪ সালে আনিকা আলম এবং ২০২৫ সালে তানজিয়া জামান মিথিলা মিস ইউনিভার্স বাংলাদেশ নির্বাচিত হয়েছিলেন।

এবার মাহির সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ। পুয়ের্তো রিকোর মঞ্চে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রতিযোগীদের সঙ্গে লড়াই করে মুকুট জিততে পারলে তাঁর জন্য অপেক্ষা করবে আন্তর্জাতিক পরিচিতি, আর্থিক পুরস্কার, এক বছরের নানা সুযোগ-সুবিধা এবং বিনোদনজগতে নতুন সম্ভাবনা।

তবে আপাতত পাঁচ মিলিয়ন ডলারের মুকুটের মালিক হওয়ার স্বপ্ন দেখার আগে তাকে পার হতে হবে বিশ্বমঞ্চের কঠিন প্রতিযোগিতা। আর জিতলে? মুকুটটি নিজের না হলেও এক বছরের জন্য বিশ্বসুন্দরীর রাজত্ব তো থাকছেই!