গতকাল রাজনৈতিক নেতা ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সম্মানে জাতীয় সংসদের বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী আয়োজিত ইফতার মাহফিলে দেয়া বক্তব্যে তিনি এ আহ্বান জানান। রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে এর আয়োজন করা হয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষ অনেক প্রত্যাশা, আশা-আকাঙ্ক্ষা নিয়ে আমাদের সবার দিকে তাকিয়ে আছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক দলগুলোর দিকে। আজকের এ ইফতার মাহফিলে আসুন আমরা আল্লাহর নামে শপথ গ্রহণ করি যে আমাদের আগামীর কাজগুলো হবে এ দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য। আল্লাহর কাছে সে রহমত চাই যার মাধ্যমে আমাদেরকে মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন ও দেশের ভাগ্য পরিবর্তনে কাজ করার তৌফিক দেবেন।’
তিনি আরো বলেন, ‘আজকে দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সবাই এখানে একত্র হয়েছি। কিছুদিন আগে দেশে নির্বাচন হয়েছে। এর মাধ্যমে গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হয়েছে। যে গণতন্ত্রের জন্য বাংলাদেশের মানুষ প্রায় এক যুগের বেশি সময় ধরে অকাতরে জীবন দিয়েছে। বিভিন্ন অত্যাচার, নির্যাতন, গুম-খুনের শিকার হয়েছে। এত ত্যাগের বিনিময়ে আমরা আজকে যে গণতন্ত্রের সূচনা করার সুযোগ পেয়েছি। তাদের আত্মত্যাগের মাধ্যমে বাকস্বাধীনতা, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও গণতন্ত্র অধিকার চর্চার সুযোগ পেয়েছি। তার জন্য আমরা আল্লাহর কাছে শোকরিয়া আদায় করি।’ এ সময় প্রধানমন্ত্রী বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের ধন্যবাদ জানান।
ডা. শফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের। মাহফিলে মোনাজাত পরিচালনা করেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক।
ইফতারে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘আজকের এ দিন দুটি দিক থেকে আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী শাসনের পর ২৪-এর ৩৬ জুলাই যে গণবিপ্লব বাংলাদেশে সংঘটিত হয়েছিল। আমাদের যুব সমাজের নেতৃত্বে যেখানে আমরা দল-মত-নির্বিশেষে শামিল হয়েছিলাম। সে দীর্ঘ প্রতিজ্ঞার পর ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন হয়েছে। এ নির্বাচনের হাত ধরে এরই মধ্যে সংসদ ও সরকার গঠিত হয়েছে। সরকার ও সংসদের কাছে জনগণের বিপুল প্রত্যাশা। আমার মনে হচ্ছে গত ১৮ বছর এমন একটি দিনের অপেক্ষায় ছিলেন সবাই। এর প্রেক্ষাপটে আজকের ইফতার মাহফিল ভিন্ন বার্তা ও আবেদন নিয়ে হাজির হয়েছে। আরেকটি কারণ হচ্ছে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের নন্দিত ও ভালোবাসার মানুষ দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে ২০১৩ সালের এ দিন বিশেষ আদালতের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেছি। সেদিন জামায়াতের নেতাকর্মী ছাড়াও সারা দেশের মানুষ প্রতিবাদ জানায়। তাদের প্রতিবাদকে দমন করার জন্য অস্ত্রের ভাষা খুঁজে নিয়েছিল এবং একদিনে ৭০ জন মানুষকে খুন করেছিল। এক সপ্তাহে ১৬৪ জনকে খুন করা হয়েছিল। আমি জানি না পৃথিবীর ইতিহাসে দ্বিতীয় এমন কোনো নজির আছে কিনা।’
জামায়াত আমির বলেন, ‘এসব মানুষকে খুন করা হলো, আবার তাদের আপনজনের বিরুদ্ধে হত্যার মামলা ঠুকে দেয়া হলো। একইভাবে আমাদের সাবেক ১১ জন নেতাকে বিদায় করা হয়েছে। আল্লাহ তাদের সবাইকে মর্যাদাবান শহীদ হিসেবে কবুল করুন। এ সময়ে আমরা কৃতজ্ঞ সে সময়ের বিরোধীদলীয় নেত্রী (খালেদা জিয়া) বিদেশ সফর শেষে এ অন্যায়ের প্রতিবাদ করেন। আমরা জেল থেকে শুনেছি, দেখেছি। তিনি এটাকে গণহত্যা বলে আখ্যায়িত করেছিলেন এবং ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে মুক্তিকামী মানুষের লড়াই বলে অবহিত করেছিলেন। এ প্রতিবাদের সঙ্গে একাত্ম হয়ে সারা দেশে হরতাল দিয়েছিলেন। আমরা চিরদিন তার ভূমিকা স্মরণ করব।’
জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকায় নিজেদের অবস্থানের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমরা গতানুগতিক কোন দল হিসেবে এ সংসদে ফাংশন করতে চাই না। আমরা চাই এ সংসদ হোক অর্থবহ, জনগণের সব চাওয়া-পাওয়ার কেন্দ্র। সরকারি দল যেমন দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবেন, তেমনি বিরোধী দল হিসেবে আমরা দায়িত্বশীল ও গঠনমূলক ভূমিকা পালন করতে চাই।’ এ সময় তিনি ১৯৫২ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত দেশের জন্য প্রাণ দেয়া সব শহীদ স্মরণ করেন।
ইফতার মাহফিলে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা মির্জা আব্বাস, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান, জাতায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের, এটিএম আজহারুল ইসলাম, নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, এলডিপির চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ, এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন, মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) মুখপাত্র রাশেদ প্রধান প্রমুখ।










