আগামী অর্থবছরের (২০২১-২২) উন্নয়ন বাজেটে নির্ধারিত ব্যয়সীমার অতিরিক্ত প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ চায় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ। তবে চলতি বাজেটের প্রথম আট মাসে বরাদ্দকৃত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) মাত্র ২০ শতাংশ বাস্তবায়ন করতে পেরেছে বিভাগটি। তার পরও কভিডকালে স্বাস্থ্য খাতের সর্বোচ্চ গুরুত্বকে বিবেচনায় নিচ্ছে অর্থ মন্ত্রণালয়। এ কারণে নির্ধারিত ব্যয়সীমার চেয়েও বরাদ্দ আরো ৩ হাজার কোটি টাকা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে অর্থ বিভাগ। এর ফলে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ আগামী অর্থবছরে বরাদ্দ পেতে যাচ্ছে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা। এছাড়াও বৈঠকে চলতি বাজেটের মতো আগামীটিতেও করোনা মোকাবেলা ও টিকা ক্রয়ের জন্য আলাদা তহবিল গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
আগামী বাজেটে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অনুকূলে এডিপি বরাদ্দ চূড়ান্ত করতে গতকাল অর্থ বিভাগের সিনিয়র সচিব আব্দুর রউফ তালুকদারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সভায় স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. আবদুল মান্নান, অতিরিক্ত সচিব (পরিকল্পনা অনুবিভাগ) মো. হেলাল উদ্দিনসহ অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে অর্থ বিভাগের প্রাক্কলন বলছে, আগামী অর্থবছরে বাজেটের আকার হতে পারে ৫ লাখ ৯৩ হাজার কোটি টাকা। বাজেট প্রণয়নের কাজও সেভাবেই এগোচ্ছে। সে অনুযায়ী স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের উন্নয়ন বাজেটে প্রাথমিকভাবে ১০ হাজার ৮৫৮ কোটি টাকার ব্যয়সীমা নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছিল। এর মধ্যে প্রকল্প সাহায্য হিসেবে নির্ধারণ করা হয় ৭ হাজার ৪৬২ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। সরকারের নিজস্ব বরাদ্দ ৩ হাজার ৩৯৫ কোটি ৩৪ লাখ টাকা।
কিন্তু করোনা মোকাবেলাসহ অন্যান্য প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের পক্ষ থেকে অর্থ বিভাগে আরো ৪ হাজার ৯৫১ কোটি ৩৯ লাখ টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দ চেয়ে চিঠি দেয়া হয়। চিঠিতে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ সব মিলিয়ে আগামী অর্থবছরের জন্য মোট ১৫ হাজার ৮০৯ কোটি ৫৬ লাখ টাকা বরাদ্দ চায়। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিবের দেয়া ওই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে গতকালের বৈঠকে বিভাগটির জন্য বরাদ্দ ৩ হাজার কোটি টাকা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়। এর ফলে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের উন্নয়ন ব্যয়সীমা বেড়ে দাঁড়াচ্ছে ১৩ হাজার ৮৫৮ কোটি টাকায়। বৈঠকে উপস্থিত একাধিক সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (পরিকল্পনা অনুবিভাগ) মো. হেলাল উদ্দিন বণিক বার্তাকে বলেন, গৃহীত প্রকল্পগুলোর সঠিক বাস্তবায়নে তাদের অতিরিক্ত বরাদ্দের প্রয়োজন। তবে তারা মানুষকে চিকিৎসা সেবা দিতে কাজ করে। তাই এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা থাকে। স্বাস্থ্য খাত হচ্ছে সরকারের অগ্রাধিকার খাত। তাই এ খাতে যে বরাদ্দ দেয়া হয় তার শতভাগ ব্যবহারে তারা কাজ করছে। এজন্য একটি মনিটরিং টিমও গঠন করে দেয়া হয়েছে। আশা করা যাচ্ছে আগামী বরাদ্দের শতভাগের মানসম্মত বাস্তবায়ন সম্ভব হবে।
এদিকে চলতি অর্থবছরে এডিপি বাস্তবায়নের দিক থেকে এখনো বেশ পিছিয়ে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বৈঠকে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) একটি প্রতিবেদন উপস্থাপন করে। ওই প্রতিবেদনে দেখা যায়, চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আট মাসে মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর গড় এডিপি বাস্তবায়নের হার ৩৩ দশমিক ৮৩ শতাংশ। সেখানে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের আট মাসে এডিপি বাস্তবায়নের হার মাত্র ২০ দশমিক ৩১ শতাংশ।
অন্যদিকে চলতি অর্থবছরে বিশেষ উন্নয়ন থোকসহ উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ রয়েছে ১০ হাজার ৩৫২ কোটি ৯ লাখ টাকা। যার মধ্যে সরকারের নিজস্ব অর্থ ৭ হাজার ৮৩ কোটি ১১ লাখ টাকা এবং প্রকল্প সাহায্য ৩ হাজার ২৬৮ কোটি ৯৮ লাখ টাকা।
বৈঠকে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের পক্ষ থেকে বলা হয়, এ বিভাগ হচ্ছে সেবাকেন্দ্রিক। এখানে শুধু ঠিকাদার নিয়োগ দিয়ে দিলেই কাজ হয় না। এখানে অনেকগুলো বিষয় জড়িত। তাছাড়া স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের প্রকল্পগুলোর পরিচালক হিসেবে যাদের নিয়োগ দেয়া হয়, তারা সবাই অন্য প্রেক্ষাপট থেকে আসা। নিয়ম অনুযায়ী প্রকল্প পরিচালক হিসেবে সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের ডাক্তারদেরই নিয়োগ দেয়া হয়। তারা কেউ ব্যবস্থাপক হতে চায় না। কিন্তু প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যবস্থাপনার কাজটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে প্রকল্প পরিচালকদের ব্যবস্থাপনা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। পাশাপাশি মন্ত্রণালয় থেকে প্রকল্পের কাজ তদারকিতে মনিটরিং টিম গঠন করা হয়েছে। এটি কঠোরভাবে মনিটরিং কার্যক্রম শুরু করে দিয়েছে। তাই আগামী কয়েক মাসে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ বাকি কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে নিতে চায়। এমনকি আগামী জুনে প্রকল্পের অগ্রগতি বিষয়ে অর্থ বিভাগের সামনে প্রতিবেদনও উপস্থাপন করতে চায় বিভাগটি।
এসব আলোচনার পর স্বাস্থ্যসেবা খাত সরকারের অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত হওয়ায় বরাদ্দ ৩ হাজার কোটি টাকা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়।
অতিরিক্ত ৩ হাজার কোটি টাকায় যেসব প্রকল্পের বাস্তবায়নে অগ্রাধিকার পাবে সেগুলো হচ্ছে ‘ফিজিক্যাল ফ্যাসিলিটিজ ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম’, ‘নন-কমিউনিকেবল ডিজিজ কন্ট্রোল’, ‘কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল স্থাপন (প্রথম সংশোধিত)’, ‘শেখ হাসিনা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল স্থাপন, টাঙ্গাইল (প্রথম সংশোধিত)’, শেখ হাসিনা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল এবং জামালপুর নার্সিং কলেজ স্থাপন, জামালপুর (প্রথম সংশোধিত)’, ‘এস্টাবলিশমেন্ট অব ৫০০ বেডেড হসপিটাল অ্যান্ড এনসিলারি ভবন ইন যশোর, কক্সবাজার, পাবনা ও আব্দুল মালেক উকিল মেডিকেল কলেজ এবং জননেতা নুরুল হক আধুনিক হাসপাতাল, নোয়াখালী’, ‘বিভাগীয় শহরে সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১০০ শয্যা বিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ ক্যান্সার চিকিৎসা ইউনিট স্থাপন’, এবং এইচপিএনএসপিভুক্ত চলমান ও নতুন প্রকল্পগুলো।
এদিকে অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, করোনা মোকাবেলায় চলতি বাজেটে আলাদা ১০ হাজার কোটি টাকার থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এ বরাদ্দ থেকে করোনার টিকা ক্রয়সহ অন্যান্য কাজে এখন পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। আগামী বাজেটেও একটি থোক বরাদ্দ রাখার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। তবে কত টাকার তহবিল হবে সেটা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।










