ঢাকার জন্য বাস রুট র্যাশনালাইজেশন বা কোম্পানিভিত্তিক বাস সেবা প্রবর্তনের একটি রূপরেখা তৈরি করেছে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ)। সংস্থাটির প্রস্তাব অনুযায়ী, ৭ হাজার ৩৩৫টি বাস দিয়ে ঢাকার বিদ্যমান গণপরিবহন নেটওয়ার্ক পুনর্গঠন করা হবে। ৪২টি রুটে বাসগুলো পরিচালনার দায়িত্বে থাকবে ২২টি বেসরকারি কোম্পানি। প্রত্যেকটি কোম্পানি তাদের জন্য নির্ধারিত রুটেই কেবল বাস পরিচালনা করবে। তবে রাষ্ট্রায়ত্ত পরিবহন সংস্থা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনকে (বিআরটিসি) এ নিয়ম মানতে হবে না। পুনর্গঠিত সব রুটেই বিআরটিসির বাস চলতে দেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। আর ঢাকা চাকা ও গুলশান চাকা নামের দুটি কোম্পানি বর্তমানে যেভাবে বাস সেবা পরিচালনা করছে, তারা ঠিক সেভাবেই তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারবে।
ডিটিসিএকে কোম্পানিভিত্তিক বাস সেবা প্রবর্তনের রূপরেখাটি তৈরি করে দিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ফ্যাসিলিটেশন কোম্পানি (আইআইএফসি)। বাস সার্ভিস, রুটস রিস্ট্রাকচারিং অ্যান্ড ক্লাস্টারিং শিরোনামে একটি প্রতিবেদনের মাধ্যমে এ রূপরোখা তৈরি করেছে আইআইএফসি। এতে ঢাকার জন্য ২২টি বাস কোম্পানি এবং এদের জন্য রুট প্রস্তাব করার পাশাপাশি সেগুলো পরিচালনার পদ্ধতিও ঠিক করে দেয়া হয়েছে।
বিআরটিএ’র হিসাবে বর্তমানে রাজধানীর ২৯১টি রুটে চলাচল করা বাসের সংখ্যা ৯ হাজার ২৭। ঢাকার জন্য কোম্পানিভিত্তিক বাস সেবা প্রবর্তনের যে রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে, তাতে বাসের সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়েছে ৭ হাজার ৩৩৫টি। এগুলোর মধ্যে থাকবে ৫০ আসনবিশিষ্ট ৪ হাজার ৫২৩টি বড় বাস। তার মধ্যে ১ হাজার ১৫৮টি থাকবে এসি বাস। বাকি বাসগুলো হবে ৩৬ থেকে ৪০ আসনবিশিষ্ট বা মিনিবাস।
কোম্পানিভিত্তিক বাস সেবায় যুক্ত করার জন্য ২ হাজার ৪১৬টি বড় বাস কিনতে হবে। এসি বাস কিনতে হবে আরো ১ হাজার ১৫৮টি। বর্তমানে ঢাকায় যেসব বাস চলাচল করছে, সেগুলোর মধ্যে ৯৪৯টি বড় বাস এ সেবায় যুক্ত করা হবে। তবে কোনো মিনিবাস কেনা হবে না। যে ২ হাজার ৮১২টি মিনিবাস চলবে, তার সবই সংগ্রহ করা হবে বিদ্যমান বহর থেকে।
রুটের সংখ্যা ২৯১ থেকে কমিয়ে ৪২-এ নামানোর কথা বলা হয়েছে এ রূপরেখায়। তবে রুট সংখ্যা কমলেও ঢাকা ও আশপাশের সব এলাকা এর আওতায় আসবে বলে জানিয়েছেন ডিটিসিএর কর্মকর্তারা। বাসগুলো পরিচালনার জন্য ২২টি কোম্পানি গঠন করার কথা বলা হয়েছে। প্রত্যেক কোম্পানিতেই এসি ও নন-এসি থাকবে। কোনো কোম্পানিতেই ৫০০-এর বেশি বাস না রাখারও প্রস্তাব করা হয়েছে।
রূপরেখা অনুযায়ী পিংক ১, পিংক ২ ও পিংক ৩ নামে গঠন করা হবে তিনটি কোম্পানি। আব্দুল্লাহপুর-ঝিলমিলের চারটি রুটে এসব কোম্পানির ১ হাজার ১৪৩টি বাস চলাচল করবে। এর মধ্যে এসি বাস চলবে ২২৫টি। ব্লু ১ ও ব্লু ২ নামে গঠিত হবে দুটি কোম্পানি। আব্দুল্লাহপুর-আজিমপুর-হেমায়েতপুরের চারটি রুটে এ দুই কোম্পানি ৭০টি এসি বাসসহ ৪৬৭টি বাস পরিচালনা করবে।
মেরুন ১ ও মেরুন ২ নামে গঠিত কোম্পানি দুটি হেমায়েতপুর-সদরঘাটের পাঁটটি রুটে বাস পরিচালনা করবে। এ দুই কোম্পানির বাসের সংখ্যা হবে ৭৪৯, যার মধ্যে ৮৬টি থাকবে এসি বাস। একইভাবে অরেঞ্জ ১, অরেঞ্জ ২ ও অরেঞ্জ ৩ কোম্পানির বাসের সংখ্যা হবে ৯০৪। মিরপুর-নারায়ণঞ্জ রুটে বাস পরিচালনা করবে অরেঞ্জ কোম্পানি তিনটি।
গ্রিন ১, গ্রিন ২, গ্রিন ৩ ও গ্রিন ৪ কোম্পানি পরিচালনা করবে ১ হাজার ৩২৯টি বাস। এগুলো চলবে ঘাটারচর-আব্দুল্লাহপুরের আটটি রুটে। ভায়োলেট ১, ভায়োলেট ২ ও ভায়োলেট ৩ নামে কোম্পানির মাধ্যমে চলবে ১ হাজার ৭০টি বাস। এগুলো চলবে কাঁচপুর-আব্দুল্লাহপুরের ছয়টি রুটে।
নর্থ ১ ও নর্থ ২ নামে গঠন করা হবে দুটি কোম্পানি। কালিয়াকৈর-আব্দুল্লাহপুরের তিনটি রুটে এসব কোম্পানির ৭৬৩টি বাস চলবে। অন্যদিকে নর্থওয়েস্ট ১ ও নর্থওয়েস্ট ২ কোম্পানি দুটি ৮৪৫টি বাস পরিচালনা করবে চন্দ্রা-হেমায়েতপুরের তিনটি রুটে। সাউথ ১ নামে আরেকটি কোম্পানি গঠন করা হবে, যার মাধ্যমে মুন্সীগঞ্জ-ঝিলমিলের দুটি রুটে চলাচল করবে ৬৫টি বাস।
কোম্পানিগুলো গঠন করা হবে জয়েন্ট ভেঞ্চার পদ্ধতিতে। কোম্পানির স্টেকহোল্ডারদের মালিকানা, রাজস্বের ভাগসহ আনুষঙ্গিক বিষয়গুলো সমন্বয় করার জন্য একটি নীতিমালা তৈরি করেছে ডিটিসিএ, যার আলোকে কোম্পানিগুলো পরিচালিত হবে।
ঢাকার জন্য কোম্পানিভিত্তিক বাস ব্যবস্থা প্রবর্তনের জন্য বাস রুট র্যাশনালাইজেশন কমিটি গঠন করে দিয়েছে সরকার, পদাধিকারবলে যার সভাপতি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র। প্রস্তাবিত ২২টি কোম্পানি আর ৪২টি রুট ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থার চিত্রটি পুরোপুরি পাল্টে দেবে বলে মনে করছেন এ কমিটির অন্যতম সদস্য ও গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. এসএম সালেহ্ উদ্দিন। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ঢাকায় কোম্পানিভিত্তিক বাস সেবা প্রবর্তনের বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় বিস্তারিত রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে। কোম্পানিগুলো যেসব রুটে বাস পরিচালনা করবে, তা ঢাকা শহর এবং এর আশপাশের এলাকাগুলোয় গণপরিবহনের চাহিদা পুরোপুরি মেটাতে সক্ষম হবে। এর মাধ্যমে একটি নিরাপদ, সহজ ও সুশৃঙ্খল গণপরিবহন ব্যবস্থা প্রবর্তিত হবে।
ঢাকায় কোম্পানিভিত্তিক বাস সেবা প্রবর্তনের জন্য পরীক্ষামূলকভাবে ঢাকা নগর পরিবহন নামে একটি সেবা চালু হতে যাচ্ছে আগামী ১ ডিসেম্বর। কেরানীগঞ্জ-ঘাটারচর-কাঁচপুরের ২১ কিলোমিটার দীর্ঘ রুটে ঢাকা নগর পরিবহনের ১২০টি বাস পরিচালনা করা হবে। পরীক্ষামূলকভাবে এ সেবা চালুর মাধ্যমে ঢাকাবাসীর বহুল প্রতীক্ষিত কোম্পানিভিত্তিক বাস সেবা চালু দ্বারপ্রান্তে চলে এসেছে বলে সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে জানিয়েছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস।










