ফলে পরীক্ষার চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ফলাফল পেতে সময়ও দীর্ঘ হচ্ছে। স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, জেলা ও উপজেলা পর্যায় থেকে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক স্যাম্পল ঢাকায় পাঠানো হচ্ছে। কিন্তু একটি ল্যাবের সক্ষমতা সীমিত হওয়ায় দ্রুত পরীক্ষা সম্পন্ন করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এতে রোগ শনাক্তে বিলম্ব হচ্ছে, যা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম অত্যন্ত সংক্রামক হওয়ায় দ্রুত শনাক্ত ও আইসোলেশন অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু পরীক্ষার ফল পেতে দেরি হলে আক্রান্ত ব্যক্তি অজান্তেই অন্যদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে দিতে পারে। ফলে প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণ আরো কঠিন হয়ে ওঠে। বর্তমান পরিস্থিতিতে শুধু একটি কেন্দ্রীয় ল্যাবের ওপর নির্ভরশীলতা ঝুঁকিপূর্ণ। তারা আঞ্চলিক পর্যায়ে আরো পরীক্ষাগার স্থাপন এবং বিদ্যমান ল্যাবের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছেন।
জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট থেকে পাওয়া তথ্যানুসারে, জানুয়ারিতে নমুনা আসে ৩৮০টি, যার মধ্যে হাম শনাক্ত হয় ৫১টির। ফেব্রুয়ারিতে আসা নমুনার সংখ্যা ছিল ৬৬০ এবং শনাক্ত হয় ১৫০টি। মার্চে আসে ১ হাজার ১৯০টি, যার মধ্যে শনাক্ত হয় ৪৬৪টি। বিগত বছরগুলোতে শনাক্তের হার ছিল ১ থেকে ৫ শতাংশ, যা এ বছর বেড়ে ৩০-৩৫ শতাংশে পৌঁছেছে।
প্রতিষ্ঠানটির বায়োকেমিস্ট ডা. রাশেদা ইয়াসমিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আগে এক মাসে যে পরিমাণ নমুনা আসত, এখন একদিনে পুরো দেশ থেকে সে পরিমাণ নমুনা আসে। আমাদের জনবল সংকট নেই, কিটের ঘাটতিও নেই। তবে হুট করে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় চাপ কিছুটা বেড়েছে। যে কারণে আমাদের রিপোর্ট দিতে কিছুটা দেরি হয়। তবে আমরা চেষ্টা করি ৭২ ঘণ্টার মধ্যে রিপোর্ট দিতে।’
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের মুখপাত্র ও জরুরি বিভাগের ইনচার্জ ডা. শংকর কে বিশ্বাস বলেন, ‘এ রোগের নমুনাগুলো প্রথমে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার লোকজন সংগ্রহ করেন। পরে তা ঢাকায় পাঠানো হয়। পরীক্ষা সেখনেই হয়। স্বাভাবিকভাবেই এটি সময়সাপেক্ষ বিষয়। তারা প্রতিদিনের রিপোর্ট নিয়মিতভাবে পাঠাচ্ছে না, তাই বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিত করে আপনাদের জানাতে পারছি না।’
তবে নমুনার চাপ থাকায় বন্ধের দিনগুলোতেও জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের ল্যাব সচল রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির ভাইরোলজিস্ট আমিরুল হুদা ভূইঞা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ছুটির দিনগুলোতে প্রশাসনিক কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও ল্যাব সচল থাকছে। হুট করে হামের প্রাদুর্ভাব বাড়ার পেছনের কারণগুলোও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আমরা যতটুকু জানতে পেরেছি হামে যারা মারা যাচ্ছে, তারা বেশির ভাগই দীর্ঘমেয়াদি কোনো রোগে আক্রান্ত ছিল। এছাড়া টিকা না দেয়া এবং ভেরিয়েন্টের ধরনে কোনো পরিবর্তন আছে কিনা, সেটি নিয়েও গবেষণা চলমান রয়েছে।’
দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় (৪ এপ্রিল সকাল ৮টা থেকে ৫ এপ্রিল সকাল ৮টা পর্যন্ত) হামের উপসর্গে ১০ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে আরো দুই শিশু। এ সময় নতুন করে আরো ৯৭৪ শিশুর শরীরে হামের উপসর্গ পাওয়া গেছে। গতকাল সন্ধ্যায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা বিভাগে সর্বোচ্চ ৩৯২ জনের মধ্যে হামের উপসর্গ দেখা গেছে। এর মধ্যে ল্যাব পরীক্ষায় ৩৮ জনের সংক্রমণ নিশ্চিত করা হয়েছে। এছাড়া চট্টগ্রামে ১৯৫ জন, রাজশাহীতে ১২৪ ও খুলনায় ৮২ জনের মধ্যে নতুন করে হামের উপসর্গ শনাক্ত হয়েছে। একই সময়ে খুলনায় পাঁচজন, রাজশাহীতে তিন ও চট্টগ্রামে দুজন হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন। অন্যদিকে ঢাকা ও ময়মনসিংহে ল্যাব পরীক্ষায় হামে আক্রান্ত হিসেবে নিশ্চিত হওয়া রোগীদের মধ্যে একজন করে মোট দুজনের মৃত্যু হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত ১৫ মার্চ থেকে ৫ এপ্রিল পর্যন্ত দেশে মোট ৭ হাজার ৬১০ জন হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে গেছে। এর মধ্যে ল্যাব পরীক্ষায় ৯২৯ জনের শরীরে এ ভাইরাসের উপস্থিতি মিলেছে। এ সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ১১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। আর হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ১৭ শিশু।










