কভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীদের বিশেষায়িত হাসপাতালে রেখে চিকিৎসা দেয়া হয়। সরাসরি রোগীর সংস্পর্শে আসায় এসব হাসপাতালের স্বাস্থ্যকর্মীরা বেশি আক্রান্ত হবেন এমন আশঙ্কা ছিল সবার। অথচ ঘটছে তার উল্টোটা। এ পর্যন্ত যত চিকিৎসক করোনা আক্রান্ত হয়েছেন, তার ৯৯ দশমিক ৫ শতাংশই নন-কভিড হাসপাতালে কর্মরত ছিলেন। আর আক্রান্ত নার্সদের ৮৯ দশমিক ৭ শতাংশও নন-কভিড হাসপাতালের।
নন-কভিড হাসপাতালে আক্রান্তের হার বেশি হওয়ার পেছনে ব্যক্তিগত সুরক্ষা উপকরণের (পিপিই) সঠিক ব্যবহার না হওয়াকেই দায়ী করছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। তবে স্বাস্থ্যকর্মীরা বলছেন, সুরক্ষা উপকরণের ব্যবহার ও সংরক্ষণবিষয়ক সুনির্দিষ্ট কোনো প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা তাদের জন্য এখনো করা হয়নি।
চিকিৎসকদের সংগঠন বাংলাদেশ ডক্টরস ফাউন্ডেশনের (বিডিএফ) হিসাব মতে, গতকাল পর্যন্ত সারা দেশে ৬১২ জন চিকিৎসক কভিড-১৯-এ আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে মাত্র তিনজন ছিলেন কভিড-১৯ চিকিৎসায় নির্ধারিত হাসপাতালের চিকিৎসক। বাকি ৬০৯ জনই নন-কভিড হাসপাতালের চিকিৎসক, যা মোট আক্রান্তের ৯৯ দশমিক ৫ শতাংশ।
চিকিৎসকরা বলছেন, করোনা চিকিৎসার জন্য নির্ধারিত হাসপাতালগুলোর চেয়ে নন-কভিড হাসপাতালগুলোতে বেশিসংখ্যক চিকিৎসক সংক্রমিত হচ্ছেন। কারণ হিসেবে তারা বলছেন, নন-কভিড হাসপাতালগুলোতে পিপিইর সংকট রয়েছে। পাশাপাশি সরকারিভাবে যেসব পিপিই দেয়া হচ্ছে, সেগুলোও যথেষ্ট মানসম্মত নয়। অথচ কভিড উপসর্গ আড়াল করে অধিকাংশ রোগীই নন-কভিড হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসেন। এছাড়া নন-কভিড হাসপাতালগুলোতে পিপিই ব্যবহারের কোনো প্রশিক্ষণই দেয়া হচ্ছে না।
নার্সদের নিয়ে কাজ করে সোসাইটি ফর নার্সেস সেফটি অ্যান্ড রাইটস। সংগঠনটির হিসাব মতে, গত রোববার পর্যন্ত সারা দেশে ৪৭টি সরকারি হাসপাতাল ও ২২টি বেসরকারি হাসপাতালের ৩৭০ জন নার্স কভিড-১৯-এ আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে কভিড-১৯ চিকিৎসায় সরকার নির্ধারিত হাসপাতালের নার্স রয়েছেন ৩৮ জন। আর নন-কভিড হাসপাতালের রয়েছেন ৩৩২ জন, যা মোট আক্রান্তের ৮৯ দশমিক ৭ শতাংশ।
বিভিন্ন হাসপাতালে কর্মরত নার্সরা জানান, কভিড-১৯-এর জন্য নির্ধারিত হাসপাতালগুলোর বাইরে অন্য হাসপাতালগুলোয় কর্মরত নার্সদের অধিকাংশই পিপিইর পূর্ণাঙ্গ সেট পাননি। ফলে ঝুঁকি নিয়ে তাদের রোগীর সেবা কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে হচ্ছে। আর যারা পিপিই পেয়েছেন, সেগুলোও মানসম্মত নয়। তাছাড়া পিপিই ব্যবহারের ওপর সেভাবে তাদের প্রশিক্ষণও দেয়া হয়নি।
এদিকে নন-কভিড হাসপাতালের সেবা প্রদানকারীদের অতিমাত্রায় কভিড-১৯ আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে নির্দেশনা জারি করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলো) ডা. মো. আমিনুল হাসান স্বাক্ষরিত ওই নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ইদানীং লক্ষ্য করা যাচ্ছে, নন-কভিড হাসপাতালে কর্মরত সেবা প্রদানকারীরা অধিকতর হারে সংক্রমিত হচ্ছেন। এ সংক্রমণের হার কভিড হাসপাতালে সেবা প্রদানকারীদের তুলনায় অনেক বেশি। যদিও উভয় হাসপাতালে একই ধরনের পিপিই সরবরাহ করা হচ্ছে। তবুও সংক্রমণের কারণ জানা যাচ্ছে না।
এতে আরো বলা হয়, ইনফেকশন প্রিভেনশন অ্যান্ড কন্ট্রোলের গাইডলাইন সঠিকভাবে অনুসরণ, হাত ধোয়া এবং সঠিক উপায়ে পিপিই ব্যবহার বিশেষ করে পিপিই খোলার সময় সঠিক নিয়ম অনুসরণ না করলে এ ধরনের অবস্থা হতে পারে। সব সেবা প্রদানকারীকে সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে বিষয়গুলো অনুসরণ করার জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে অনুরোধ করা হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনাটি সব মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সদর হাসপাতাল, সিভিল সার্জন এবং উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো হয়েছে।
তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এ বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন চিকিৎসকদের সংগঠন বিডিএফের প্রধান সমন্বয়ক ডা. নিরুপম দাস। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, চিকিৎসকদের নিরাপত্তার জন্য পিপিই, উন্নত মানের গাউন, মাস্ক ও বিশেষ চশমার বিকল্প নেই। সেই সঙ্গে এসব নিরাপত্তা সরঞ্জামের সঠিক ব্যবহার জানাতে চিকিৎসকদের জন্য পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণেরও ব্যবস্থা করা হয়নি। এক কথায় বলতে গেলে, কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ ছাড়াই কভিড-১৯ মোকাবেলায় সামনের সারিতে অংশগ্রহণ করানো হয়েছে চিকিৎসকদের।
নার্স দিয়ে কাজ করা সংগঠন সোসাইটি ফর নার্সেস সেফটি অ্যান্ড রাইটসও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছে। সংগঠনের মহাসচিব সাব্বির মাহমুদ তিহান বণিক বার্তাকে বলেন, আমরা শুরু থেকেই নার্সদের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী পূর্ণাঙ্গ ও মানসম্পন্ন পিপিই সরবরাহ এবং নার্সদের ট্রেনিং নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে আসছি। কিন্তু এখনো অনেক হাসপাতালে পূর্ণাঙ্গ পিপিই ও ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করা হচ্ছে না। এমন অবহেলা চলতে থাকলে দেশের স্বল্পসংখ্যক নার্সের মধ্যে অনেকেই সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। নার্সরা সংক্রমিত হলে করোনা মোকাবেলা সম্ভব নয়। তাই নার্সদের সুরক্ষায় সরকারকে জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে। নইলে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা দ্রুত ভেঙে পড়বে।










