মাঝারি বৃষ্টিতেই হাঁটু থেকে কোমরপানিতে তলিয়ে যায় বন্দরনগরী চট্টগ্রামের অধিকাংশ এলাকা। এ মুহূর্তে এটি হচ্ছে দেশের বাণিজ্যিক রাজধানীর প্রধান সমস্যা। অথচ এ নগরের জলাবদ্ধতা দূর করতে সরকারের উদ্যোগের অভাব নেই। কয়েক বছর আগেই সাড়ে ৯ হাজার কোটি টাকারও বেশি ব্যয়ে তিনটি প্রকল্প গ্রহণ করে সরকার। এর মধ্যে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার দুটি প্রকল্পের বাস্তবায়ন শুরু হয় ২০১৭ সালে। প্রকল্প দুটির মেয়াদ এরই মধ্যে এক বছর করে বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু বাড়তি মেয়াদ শেষেও বাস্তবায়ন হয়েছে ৪০ শতাংশেরও কম। এছাড়া ২০১৮ সালে ১ হাজার ৬২০ কোটি টাকার আরো একটি প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। কিন্তু প্রায় তিন বছর পেরোলেও এ প্রকল্পের অগ্রগতি ৪ শতাংশেরও কম।
এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে এত দীর্ঘসূত্রতার কারণ জানতে এবং একই সঙ্গে প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি পর্যালোচনায় গত ১৬ জুন সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে ভার্চুয়ালি বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউস। ওই বৈঠক থেকে জানা যায়, প্রকল্পগুলো একাধিক সংস্থার মাধ্যমে বাস্তবায়ন হচ্ছে। এ সংস্থাগুলোর মধ্যে রয়েছে সমন্বয়ের অভাব। এছাড়া ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতাও প্রকল্প বাস্তবায়নে বড় অন্তরায়। বৈঠকের কার্যপত্র সূত্রে জানা গেছে, এসব সমস্যার সমাধান করে প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি আনতে সমন্বয় সাধন ও তদারকিতে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার মো. কামরুল হাসান এনডিসিকে প্রধান করে একটি কমিটি গঠন করা হয়। এ কমিটিতে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক ও সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলোর পরিচালকদেরও রাখা হয়েছে। বলা হয়, কমিটি প্রতি মাসে বৈঠক করে উদ্ভূত সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি প্রতিবেদন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠাবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নগরের জলাবদ্ধতা নিরসনে ৫ হাজার ৬১৬ কোটি ৪৯ লাখ টাকা ব্যয়ে চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনকল্পে খাল পুনঃখনন, সম্প্রসারণ, সংস্কার ও উন্নয়ন শীর্ষক প্রকল্প এবং ২ হাজার ৩১০ কোটি ২৪ লাখ টাকা ব্যয়ে কর্ণফুলী নদীর তীর বরাবর কালুরঘাট সেতু থেকে চাক্তাই খাল পর্যন্ত সড়ক নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। এছাড়া ১ হাজার ৬২০ কোটি ৭৩ লাখ টাকা ব্যয়ে চট্টগ্রাম মহানগরীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ, জলমগ্নতা বা জলাবদ্ধতা নিরসন ও নিষ্কাশন উন্নয়ন শীর্ষক প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে যৌথভাবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও পানি উন্নয়ন বোর্ড।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার মো. কামরুল হাসান এনডিসি বণিক বার্তাকে বলেন, অতিসম্প্রতি আমরা দায়িত্ব পেয়েছি। এরই মধ্যে আমরা কাজ শুরু করে দিয়েছি। প্রকল্প পরিচালকরা বলছেন, মূলত জমি অধিগ্রহণে সমস্যা থাকায় প্রকল্পগুলো অগ্রসর হচ্ছে না। এছাড়া কিছু সমস্যা রয়েছে। কমিটির অন্যান্য সদস্যসহ আমি নিজে ওইসব এলাকা দেখে এসেছি। ভূমি অধিগ্রহণসহ অন্য যেসব সমস্যা রয়েছে সেগুলো চিহ্নিত করে সংশ্লিষ্টদের নিয়ে এগুলোর সমাধান করে প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়নে গতি আনতে কাজ করব।
এদিকে চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনকল্পে খাল পুনঃখনন, সম্প্রসারণ, সংস্কার ও উন্নয়ন শীর্ষক প্রকল্প পরিচালক সভায় বলেন, ২০১৭ সালের জুলাই থেকে ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত মেয়াদে ৫ হাজার ৬১৬ কোটি ৪৯ লাখ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে প্রকল্পটি অনুমোদিত হয়। পরবর্তী সময়ে ব্যয় বৃদ্ধি ছাড়াই প্রকল্পের মেয়াদ ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়। আরো এক বছর মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। চলতি বছরের মে পর্যন্ত এ প্রকল্পের আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে ৩১ শতাংশ ও ভৌত অগ্রগতি হয়েছে ৪৭ শতাংশ।
তিনি আরো বলেন, ৬ হাজার ৫১৬ কাঠা জমি অধিগ্রহণের জন্য ১ হাজার ৭২৭ কোটি ৮৮ লাখ টাকা বরাদ্দ আছে। এর মধ্যে ৪০০ কাঠা জমি অধিগ্রহণের কাজ চলমান রয়েছে ও ২৬ কোটি ১৩ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়েছে। প্রকল্পটি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাস্তবায়নের জন্য তিনি ভূমি অধিগ্রহণ ও সিভিল কাজের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ এবং বিভিন্ন খালে প্রতিনিয়ত আবর্জনা ফেলার যে প্রবণতা তা বন্ধ করার জন্য চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়ার অনুরোধ জানান।
কর্ণফুলী নদীর তীর বরাবর কালুরঘাট সেতু থেকে চাক্তাই খাল পর্যন্ত সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক সভায় জানান, এ প্রকল্পও ২০১৭ সালের জুন থেকে ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত মেয়াদে বাস্তবায়নের জন্য অনুমোদিত হয়। ২ হাজার ৩১০ কোটি ২৪ লাখ টাকা ব্যয়ে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। ব্যয় বৃদ্ধি ছাড়াই প্রকল্পের মেয়াদ ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। বর্তমানে আরো এক বছর বাড়ানোর প্রস্তাব প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। তিনি আরো বলেন, চলতি বছরের মে পর্যন্ত এ প্রকল্পের আর্থিক অগ্রগতি ৩৮ শতাংশ ও ভৌত অগ্রগতি ৪৯ দশমিক ১৩ শতাংশ। এছাড়া ভূমি অধিগ্রহণের অগ্রগতি ৪০ শতাংশ।
সভায় চট্টগ্রাম মহানগরীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ, জলমগ্নতা বা জলাবদ্ধতা নিরসন ও নিষ্কাশন উন্নয়ন শীর্ষক প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক জানান, প্রকল্পটি বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও পানি উন্নয়ন বোর্ড যৌথভাবে বাস্তবায়ন করছে। ১ হাজার ৬২০ কোটি ৭৩ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি ২০১৮ সালের অক্টোবর থেকে ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত মেয়াদে বাস্তবায়নের জন্য অনুমোদিত হয়। গত ১৫ জুন পর্যন্ত এ প্রকল্পেও আর্থিক অগ্রগতি ৩ দশমিক ৩৮ শতাংশ এবং ভৌত অগ্রগতি ৫ শতাংশ। তিনি আরো বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের মালিকানাধীন রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণে তাদের আপত্তির কারণে প্রকল্প বাস্তবায়ন কার্যক্রম কিছুটা গতি হারিয়েছে।
সভায় সিদ্ধান্ত হয় যে ভূমি অধিগ্রহণ কার্যক্রম গতিশীল করা এবং তিনটি প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে একাধিক সংস্থা জড়িত থাকায় প্রকল্পগুলোর কার্যক্রমে সমন্বয় সাধান ও তদারকির জন্য চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনারের নেতৃত্বে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক এবং সংশ্লিষ্ট প্রকল্প পরিচালকদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা হলো। কমিটি প্রতি মাসে বৈঠক করে এসব প্রকল্পে গতি আনতে কাজ করবে এবং অগ্রগতি প্রতিবেদন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠাবে। এছাড়া চট্টগ্রাম মহানগরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করবে। খালে ময়লা-আবর্জনা ও পলিথিন ফেলা রোধে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন সচেতনতামূলক কার্যক্রম বাস্তবায়ন করবে।










