অবস্থানগত ও পরিবেশগত বৈচিত্র্যের কারণে বান্দরবানে সুপেয় পানির তীব্র সংকট রয়েছে। পানি সংকটের কারণে পাহাড়ের অধিবাসীরা প্রতি বছরই পানিবাহিত বিভিন্ন রোগে ভুগছে। এসব রোগে ভুগে তাদের অনেকের মৃত্যুও ঘটছে। পাহাড়ের বাসিন্দাদের পানি সংকট দূর করতে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার উদ্যোগ রয়েছে। সরকারও তাদের সুপেয় পানির সংকট মেটাতে আন্তরিক। তবে স্থানীয়রা বলছেন, এসব উদ্যোগ সীমিত। পাহাড়ের পানি সমস্যা দূর করতে টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।
বান্দরবানের রোয়াংছড়ি উপজেলার কচ্ছপতলি বাজার এলাকা পর্যটকদের কাছে ইদানীং বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে দেবতাখুম বা নাহ্ অইং নামে পরিচিত একটি রহস্যঘেরা জলাশয়ের কারণে। এ এলাকায় বর্তমানে রয়েছে তীব্র পানির সংকট। অথচ ছোটবেলায় এমন পরিস্থিতি দেখেননি বলে জানালেন তঞ্চঙ্গ্যা পাড়ার প্রধান রুতিসেন তঞ্চঙ্গ্যা।
‘পানির সংকট প্রতি বছরই বাড়ছে। এখন বর্ষা বাদে ছড়া বা ঝরনার পানির পরিমাণ খুবই কমে যায়। এ পানিই আবার ঘোলা হয়ে যায়, ময়লায় ভরে যায় শুষ্ক মৌসুমে। বিকল্প উৎস না থাকায় সে সময় এলাকার বাসিন্দাদের নিরুপায় হয়ে এ ময়লা পানিই পান করতে হয়,’ বলেন
রুতিসেন।
একই ধরনের তথ্য দেন উ চো মারমাও। তিনি জানান, তার ক্যবু পাড়াতেও পানির সংকট রয়েছে। বাধ্য হয়ে দূষিত ও ময়লা পানি পান করে ২০১৭ সালে মারা যায় প্রতিবেশী উং সং মারমার আড়াই বছর বয়সী ছেলেটা।
পার্বত্য এলাকায় বছরের প্রায় ছয় মাসই সুপেয় পানি পাওয়ার জন্য চরম কষ্ট করে আদিবাসীরা। ছোট ঝিরি থেকে পানি সংগ্রহ করতে হয় দু-তিন কিলোমিটার পাহাড়ি পথ হেঁটে। গ্রীষ্মে সংকট শুরু হয়ে বর্ষার আগ পর্যন্ত পানির সংকট চলতে থাকে।
স্থানীয়রা জানান, বান্দরবানের থানচি, আলীকদম, নাইক্ষ্যংছড়ি, রুমাসহ বিভিন্ন উপজেলার পাহাড়ি গ্রামগুলোতে বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকটের কারণে বর্ষা মৌসুমে ডায়রিয়া, পেটের পীড়াসহ বিভিন্ন ব্যাধিতে আক্রান্ত এবং মৃত্যুর খবরও পাওয়া যায় প্রতি বছর।
সাধারণত জুন-জুলাইয়ে পাড়াগুলোতে পানিবাহিত রোগের প্রকোপ দেখা দেয়। জেলা সিভিল সার্জনের কার্যালয় সূত্র জানায়, গত বছর নারী-শিশুসহ বান্দরবানে ৪ হাজার ২০৪ জন পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়েছে।
পানি
সংকট কেন
বাড়ছে?
পানি সংকট বৃদ্ধির পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব যেমন দায়ী, তেমনি পার্বত্য এলাকায় বসবাসকারীদের জীবনযাত্রা আর চাষ পদ্ধতিতে পরিবর্তন আসাও কম দায়ী নয়।
কানাডার সাসকাচোয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটির পিএইচডি গবেষক মোস্তফা কামাল পলাশ আমেরিকার গ্লোবাল ল্যান্ড ডাটা অ্যাসাইমিলেশন মডেল থেকে প্রাপ্ত ডাটা বিশ্লেষণ করে জানান, ‘গত ২০ বছরে বান্দরবান জেলার ভূ-পৃষ্ঠ থেকে ২ মিটার উচ্চতায় বায়ুর গড় তাপমাত্রা দশমিক ৫ থেকে ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেড়েছে, বিশেষ করে সর্বশেষ সাত বছরে তাপমাত্রা দেড় ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেড়েছে। বায়ুর তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে মাটির তাপমাত্রাও বেড়ে গেছে এবং বাষ্পীভবন বেড়ে গিয়ে মাটি বেশি শুষ্ক হয়ে যাচ্ছে। ফলে নদী ও ছড়াগুলোতেও পানির প্রবাহ কমে যাচ্ছে শুষ্ক মৌসুমে।’ জাবারাং কল্যাণ সমিতির নির্বাহী পরিচালক মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা বলেন, ‘আগে পাহাড়ে ঘন জঙ্গল ছিল। পাহাড় না কেটে ঘর-বাড়ি বানানোর রীতিও ছিল। কিন্তু এখন বন-জঙ্গল উজাড় করে জনবসতি গড়ে উঠছে। আগে পাহাড়কে তার স্বাভাবিক প্রকৃতিতে রেখেই কৃষিকাজ করা হতো। এখন পাহাড় কেটে বাণিজ্যিক কৃষির আবাদ বেড়েছে।’
তাছাড়া এখন ছড়ার পাথর তোলা, বনের বড় বড় গাছ বিক্রি নিয়মিত ঘটনা। রাস্তাসহ অবকাঠামো তৈরিতে ঝিরির পাথরের চাহিদাও বেড়েছে।
বান্দরবান জেলা সদরের টংকাবতী, রোয়াংছড়ির নোয়াপতং, লামার লাইনঝিরি, কাঁকড়াঝিরি, হরিণঝিরি, টাকের পানছড়ি মৌজা, শীলের তোয়া, কাঁঠালছড়া, নন্দির বিল, ফাঁসিয়াখালী, রুমা, থানচি, আলীকদম প্রভৃতি এলাকায় উন্নয়নকাজের জন্য ঝিরি ও পাহাড় খুঁড়ে পাথর উত্তোলন চলছে। বাইরে থেকে পাথর আনা অর্থনৈতিক দিক থেকে ব্যয়বহুল হওয়ায় স্থানীয় ঠিকাদাররা এ কাজটা অবাধেই করছেন। ফলে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের পাশাপাশি পানির স্তর নিচে চলে যাচ্ছে ।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত বান্দরবানের পাহাড়গুলোতে সম্প্রতি সারা দেশ থেকে আসা পর্যটকদের সংখ্যাও বেড়েছে প্রচুর। পর্যটনস্থল, জলপ্রপাত ও ঝরনা দেখতে নদী ও ঝিরিগুলোতে মানুষের চলাচল বেড়ে যাওয়া ও তাদের ব্যবহার্য অপচনশীল দ্রব্য যেখানে-সেখানে ফেলার কারণেও পানি দূষিত হচ্ছে।
এ সবকিছুর প্রভাব পড়ছে পাহাড়ের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহে। পানির উৎস-কাঠামো ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, দূষিত হচ্ছে। ফলে সৃষ্টি হচ্ছে সুপেয় পানির তীব্র সংকট।
এ প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনের মিল্টেনি বায়োটেকের প্রিন্সিপাল সায়েন্টিস্ট মংসানু মারমা বলেন, পরিবেশগত কারণে পানির সমস্যাটা প্রকট হচ্ছে। প্রাকৃতিক বন উজাড় হওয়ার কারণে পাহাড়গুলো এখন প্রায় ন্যাড়া হয়ে পড়েছে। পাহাড় বৃষ্টির পানি ধারণ করতে পারছে না । এতে প্রাকৃতিক উৎস; যেমন পাহাড়ি ঝরনা, কুয়া ইত্যাদি থেকে যারা খাওয়ার পানি সংগ্রহ করেন, তারা আর আগের মতো পানি পাচ্ছেন না। ফলে প্রায় সারা বছরই সুপেয় পানির সংকট দেখা দিচ্ছে।
আছে
দিনবদলের উদ্যোগও
সরকারি হিসাব মতে, বাংলাদেশের প্রায় ৯৮ শতাংশ মানুষের সুপেয় পানি পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে বিভিন্ন বেসরকারি গবেষণার তথ্যে উঠে এসেছে দেশের আদিবাসীদের ৫২ শতাংশ এখনো সুপেয় পানি প্রাপ্তির সুবিধার বাইরে রয়ে গেছে। পাহাড়ি এলাকায় স্থানভেদে এ হার কোথাও কোথাও আরো বেশি বলে তারা বলছেন।
পার্বত্য এ জেলার পানি সংকট দূর করতে কাজ করছে বেশকিছু বেসরকারি সংস্থা। বান্দরবান সদর উপজেলার রাজবিলা ইউনিয়নের ৩ নং ওয়ার্ডের ঝাংকাপাড়ায় এনজিও ফোরাম ফর পাবলিক হেলথ নামের একটি এনজিও কমিউনিটিভিত্তিক বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের প্রযুক্তি স্থাপন করেছে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে রাজবিলা ইউনিয়নের ঝাংকাপাড়া, থংজমাপাড়া, ক্যাংড়াছড়িপাড়া, তঞ্চঙ্গ্যাপাড়া, তাইংখালিপাড়া ও রিনিপাড়ার অধিবাসীরা বিশুদ্ধ পানি সুবিধার আওতায় এসেছে।
পাহাড়িদের সুপেয় পানির ব্যবস্থা করতে কাজ করছে বলিপাড়া নারী কল্যাণ সমিতি (বিএনকেএস)। বান্দরবানের স্থানীয় এ এনজিও রুমা উপজেলার পাইন্দু গ্রামে ট্যাংক বসিয়ে বৃষ্টির পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা করেছে। ট্যাংকে জমা পানি ফিল্টারিং করে পাইন্দু গ্রামের বিভিন্ন পরিবারে সারা বছর রান্না, কাপড় ধোয়া ও পানীয় জলের জোগান দিয়ে থাকে।
‘স্থানীয়দের পানি সমস্যা সমাধানে আমরা একাধিক উদ্যোগ পরিচালনা করেছি। আমরা পাইন্দু গ্রামে বৃষ্টির পানি ধরে রাখার জন্য একটি জলাধার তৈরি করেছি, যার পানি বিশুদ্ধ করে খাওয়ার পানি ও দৈনন্দিন কাজে ব্যবহার করা হয়। তবে এখন অর্থায়নের অভাবে নতুন উদ্যোগ নেয়া সম্ভব হয়নি’, জানান
বিএনকেএসের নির্বাহী পরিচালক হ্লা সিং নু মারমা।
২০১৯-২০ অর্থবছর বান্দরবানের প্রতিটি ইউনিয়নে ২৬টি করে গভীর নলকূপ স্থাপনের উদ্যোগ নেয় সরকারের জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগও। চলতি অর্থবছরের মধ্যে তারা প্রাথমিক পর্যায়ে মোট ২৬০টি গভীর নলকূপ স্থাপন করবে বলে বিভাগ সূত্রে জানা গেছে। তবে পার্বত্য এলাকায় সুপেয় পানির চাহিদার তুলনায় এসব উদ্যোগ ‘খুবই সীমিত’ বলে মন্তব্য করেছেন স্থানীয়রা। তারা বলছেন, পাহাড়ের পানি সমস্যা সমাধানে এনজিও ও সরকার যেসব উদ্যোগ নিয়েছে, তার বেশির ভাগই টেকসই না হলেও অনেক উদ্যোগই ফলপ্রসূ হয়েছে। সফল উদ্যোগগুলোকে মডেল হিসেবে ধরে সেগুলো সম্প্রসারণের উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন তারা। এজন্য তারা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা তৈরির ওপর জোর দিয়েছেন।
নীতিনির্ধারকরা
যা বলছেন
এ প্রসঙ্গে জানতে চাওয়া হলে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী বীর বাহাদুর উশৈসিং, এমপি পার্বত্য এলাকায় সুপেয় পানির সমস্যার কথা স্বীকার করে বলেন, ‘পাহাড়ের
পানি সমস্যার সমাধানে সরকারের পক্ষ থেকে এরই মধ্যে নানা উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বন বিভাগ, পাড়ার হেডম্যান ও স্থানীয়দের সঙ্গে নিয়ে আমরা পানির উৎস সংরক্ষণের ওপর জোর দিচ্ছি।’
তবে বৃষ্টির পানির ব্যবহার বাড়ানো নিয়ে এ মুহূর্তে কোনো উদ্যোগ না থাকলেও ভবিষ্যতে এটিকে নিয়ে বড় আকারের কাজ করার ভাবনা সরকারের রয়েছে বলে মন্ত্রী জানান।
তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন
সময় অনেক প্রকল্প নেয়া হলেও সেগুলোর ধারাবাহিকতা রক্ষা করা হয়নি ।’
‘যেসব বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে স্থানীয়রা উপকৃত হয়েছেন, তাদের সেসব প্রকল্প আরো বিস্তৃত করা যায় কিনা, সেটিও আমরা ভাবব’, বলেন
তিনি।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নানও বলেন, ‘পাহাড়ের
ভূপ্রকৃতি আলাদা হওয়ায় ওখানে অনেক গভীরে গিয়েও অনেক সময় পানি পাওয়া যায় না। পানি সমস্যাসহ অন্যান্য সমস্যা সমাধানে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের আওতায় বেশকিছু উন্নয়ন প্রকল্প চলমান রয়েছে, যার কিছু সুফল তারা পাচ্ছেন। সেজন্য সরকার পাইপলাইনের মাধ্যমে পানি সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নিচ্ছে।’
(প্রতিবেদনটি থমসন রয়টার্স ফাউন্ডেশনের মিডিয়া স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রকল্পের আওতায় তৈরি করা হয়েছে)










