জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির বক্তব্যের ওপর আনীত ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধ, সংবিধান, জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া নিয়ে বিস্তৃত মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম।

আজ সংসদে মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের ফাউন্ডেশন—এ ব্যাপারে আমরা আনকমপ্রোমাইজিং।’

নাহিদ ইসলাম উল্লেখ করেন, সাম্প্রতিক জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেয়া নতুন প্রজন্মের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার একটি নবায়ন ঘটেছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্যে কোনো সাংঘর্ষিক সম্পর্ক নেই; বরং তিনি এটিকে একই ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে দেখেন। ‘মুক্তিযুদ্ধে আমরা সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের কথা বলেছি। জুলাই গণঅভ্যুত্থানেও আমরা বৈষম্যের বিরুদ্ধে কথা বলেছি। তাহলে পার্থক্য কোথায়?’—প্রশ্ন তোলেন তিনি।

তিনি আরো বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে কখনোই মুক্তিযুদ্ধের চেয়ে বড় হিসেবে উপস্থাপন করা হয়নি। ‘বাংলাদেশের ইতিহাসে জুলাই একটি বিশেষ ঘটনা, মুক্তিযুদ্ধ আরেকটি বিশেষ ঘটনা—তবে মুক্তিযুদ্ধই আমাদের রাষ্ট্রের ভিত্তি’, যোগ করেন তিনি।

রাষ্ট্রপতির বক্তব্য প্রসঙ্গে নাহিদ ইসলাম বলেন, তিনি রাষ্ট্রপতি মো. শাহাবুদ্দিনের বক্তব্য শোনেননি এবং এ বিষয়ে মন্তব্য করতে আগ্রহী নন। তবে রাষ্ট্রপতির অতীত ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বিভিন্ন অভিযোগ উত্থাপন করেন। তার দাবি, দুদকের কমিশনার হিসেবে শাহাবুদ্দিনকে কিছু নির্দিষ্ট দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল, যার মধ্যে ছিল বিরোধী নেতাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলার অগ্রগতি নিশ্চিত করা, পদ্মা সেতু সংক্রান্ত অভিযোগে সরকারকে দায়মুক্তি দেয়া এবং পূর্ববর্তী সময়ে আওয়ামী লীগের নেতাদের বিরুদ্ধে হওয়া মামলাগুলো থেকে অব্যাহতি দেয়া।

এই প্রেক্ষাপটে তিনি বলেন, ‘এমন একজন ব্যক্তিকে এখনো রাষ্ট্রপতি হিসেবে রাখা হয়েছে—এটি রাজনৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ সিদ্ধান্ত।’ রাষ্ট্রপতিকে অপসারণের দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন এবং নাহিদ ইসলাম বলেন, এ বিষয়ে এখন আর কোনো সাংবিধানিক বাধা থাকা উচিত নয়।

রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে নাহিদ ইসলাম বলেন, সাম্প্রতিক সংকটের সময় তাদের সামনে দুটি পথ ছিল—জাতীয় সরকার গঠন অথবা ক্ষমতা সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর। তার বক্তব্য অনুযায়ী, জাতীয় সরকার গঠনের প্রস্তাব গৃহীত না হওয়ায় সে উদ্যোগ এগোয়নি।

সংবিধান প্রসঙ্গে তিনি ১৯৭২ সালের সংবিধানকে একাত্তরের চেতনার সঙ্গে মিলিয়ে দেখার প্রবণতার সমালোচনা করেন। তার মতে, এই সংবিধান প্রণয়ন করেছিলেন ১৯৭০ সালের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা এবং এতে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ছিল স্পষ্ট। তিনি দাবি করেন, সংবিধানটি একজন ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে প্রণীত হয়েছিল এবং এতে নির্বাহী, আইন ও বিচার বিভাগের ক্ষমতা এক জায়গায় কেন্দ্রীভূত হয়েছে।

এছাড় তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের পরিবর্তে বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতাকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে, যা নিয়ে অতীতে বিভিন্ন রাজনৈতিক মহলে বিতর্ক ছিল।

‘জুলাই সনদ’ প্রসঙ্গে নাহিদ ইসলাম বলেন, গণঅভ্যুত্থানের পর তারা নতুন সংবিধান বা সংবিধান পুনর্লিখনের দাবি তুলেছিলেন। তবে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্যের কারণে সেই প্রক্রিয়ায় ভিন্নতা তৈরি হয়। তিনি অভিযোগ করেন, জুলাই সনদ প্রণয়নের সময় কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রস্তাবের সঙ্গে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ যুক্ত হওয়ায় এর গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

তিনি বলেন, “জুলাই সনদ স্বাক্ষরের দিন আমরা স্বাক্ষর করিনি; পরবর্তীতেও আমাদের অবস্থান ছিল মতামত প্রদানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। একটি রাজনৈতিক দলের প্রভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নোট অব ডিসেন্ট যুক্ত করা হয়েছে, যা পুরো প্রক্রিয়াকে বিতর্কিত করেছে।’