আগামী এক দশকে নিজেদের ব্যবসায়িক মডেল পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছেন দেশের ৫৭ শতাংশ সিইও (প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা)। সিইওদের এ ভাবনা নতুন ব্যবসায়িক ধারণা উদ্ভাবন এবং টেকসই উদ্যোগের বিশ্বব্যাপী প্রবণতাকে প্রতিধ্বনিত করে।
সিইওরা মনে করছেন, তাদের ব্যবসার মান উন্নয়ন এবং উৎপাদিত দ্রব্যাদির মান উন্নয়নের জন্য নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ করতে হবে। এ নতুন প্রযুক্তি নিজস্ব কর্মীদল গঠনের মাধ্যমেই তৈরি করতে হবে।
শনিবার প্রাইসওয়াটারহাউজকুপারস (পিডব্লিউসি) প্রকাশিত এক জরিপ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। ‘চলমান পুনঃউদ্ভাবনের যুগে উন্নতি’ শীর্ষক এ প্রতিবেদন প্রকাশ করে পিডব্লিউসি।
১০৫টি দেশের ৪ হাজার ৭০২ জন সিইওর ওপর জরিপ চালায় পিডব্লিউসি, যেখানে বাংলাদেশ থেকে অংশ নেন বিভিন্ন শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৫২ জন সিইও। ২০২৩ সালের ২ অক্টোবর থেকে ১০ নভেম্বর পর্যন্ত জরিপটি চালানো হয়। এতে ব্যবসা ও অর্থনৈতিক অবস্থার বিশদ ধারণা পেতে সিইওদের সাক্ষাতকার নেয়া হয়েছে। সাক্ষাতকারে সিইওরা কোম্পানিকে জটিলতা এবং অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে পরিচালনার কথা জানিয়েছেন।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, জরিপে অংশ নেয়া ৫৭ শতাংশ সিইও মনে করেন- আগামী দশকে উল্লেখযোগ্য ব্যবসায়িক মডেল পরিবর্তনের করতে হবে। ৪৭ শতাংশ সিইও ব্যবসার মান উন্নয়ন এবং উৎপাদিত দ্রব্যাদির মান উন্নয়নের জন্য নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ করেছেন। একই সাথে ২৮ শতাংশ সিইও নিজস্ব কর্মীদল গঠন করে নতুন প্রযুক্তি তৈরির কথা জানিয়েছেন।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, আগামী ১২ মাসে বাংলাদেশের অর্থনীতির উন্নতির সম্ভাবনা বেশি বলে মনে করছেন সিইওরা। প্রায় ৩৬ শতাংশ সিইও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার উন্নতির আশা করছেন, যা গত বছর পরিচালিত সমীক্ষায় ছিল ৩১ শতাংশের কাছাকাছি। দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি সম্পর্কে বাংলাদেশের সিইওদের আস্থা অনেক বেশি। ৪৩ শতাংশ সিইও আগামী ৩ বছরে, ২৪ শতাংশ ১২ মাসে কোম্পানির রাজস্ব প্রবৃদ্ধির আশা প্রকাশ করেছেন।
দেশের সিইওরা নিজস্ব কোম্পানির ডিকার্বনাইজেশনের উন্নয়নে ভালো করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করে বলা হয়, ৭২ শতাংশ সিইও ব্যবসায় জ্বালানি ও বিদ্যুৎ ব্যবহারের দক্ষতা বৃদ্ধি করতে সক্ষম হয়েছেন। সিইওরা নিজের প্রতিষ্ঠানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইর প্রভাব সম্পর্কে আশাবাদী বলে জানিয়েছেন। বাংলাদেশের প্রায় ৭৯ শতাংশ সিইও আশা করেন, জেনারেটিভ এআই তাদের নিজস্ব কাজের সময়ে দক্ষতা বাড়াবে এবং ৭৪ শতাংশ সিইও পরবর্তী ১২ মাসে তাদের কর্মীদের দক্ষতা উন্নত করবে বলে মত প্রকাশ করেন। ৫৭ শতাংশ সিইও রাজস্ব বৃদ্ধির আশা করেন এবং ৬০ শতাংশ একই সময়ের মধ্যে জেনারেটিভ এআইর কারণে ব্যবসায়িক লাভ বৃদ্ধির প্রত্যাশা করেন।
জরিপে অংশ নেওয়া বাংলাদেশী সিইওদের কাছে পিডব্লিউসি জানতে চেয়েছিল, আগামী এক বছর তাদের কোম্পানিগুলোর ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে কোন তিনটি দেশ বা অঞ্চল বড় ভূমিকা রাখবে? জবাবে সর্বোচ্চ ৪৩ শতাংশ সিইও জানিয়েছেন, এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা থাকবে ভারতের। ৪০ শতাংশের মতে, দ্বিতীয় শীর্ষ ভূমিকা রাখবে যুক্তরাষ্ট্র। আর ২৯ শতাংশ সিইও মনে করেন, তৃতীয় শীর্ষ ভূমিকা রাখবে চীন।
জরিপে জানতে চাওয়া হয়েছিল, আগামী তিন বছরের মধ্যে কোন ধরনের পরিবর্তন কোম্পানিগুলোর ব্যবসার ক্ষেত্রে বড় প্রভাব ফেলবে? এর জবাবে বাংলাদেশের ৬৭ শতাংশ সিইও জানিয়েছেন, ভোক্তার অগ্রাধিকার পরিবর্তনই আগামী তিন বছরে ব্যবসায়ে বড় প্রভাব ফেলবে। ৬৪ শতাংশ সিইও বলেন, সরকারের বিধিবিধান ব্যবসার ক্ষেত্রে বড় প্রভাব রাখবে। আর ৬০ শতাংশ সিইও মনে করেন, প্রযুক্তির পরিবর্তনই এ সময়ে ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে বড় প্রভাব ফেলবে।
জরিপের বিষয়ে পিডব্লিউসি বাংলাদেশের ডিরেক্টর এবং অফিস ম্যানেজিং পার্টনার অরিজিৎ চক্রবর্তী বলেন, বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান সংখ্যক সিইও জলবায়ু পরিবর্তন এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতির মতো গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক মেগাট্রেন্ডের ক্ষেত্রে তাদের সংস্থার দীর্ঘমেয়াদী প্রাসঙ্গিকতার পুঙ্খানুপুঙ্খ মূল্যায়ন করতে আগ্রহী। এই কারণে তাদের অনেকেই মনে করেন, তাদের বর্তমান ব্যবসার রূপান্তর না হলে তা আগামী ১০ বছরের মধ্যে প্রাসঙ্গিকতা হারাবে।
পিডব্লিউসি বাংলাদেশের কান্ট্রি ক্লায়েন্টস এবং মার্কেটস লিডার মামুন রশীদ বলেন, বাংলাদেশের সিইওরা তাদের ব্যবসার জন্য স্বল্পমেয়াদী চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা এবং দীর্ঘমেয়াদী সুযোগের সদ্ব্যবহার সাফলোর সাথে করে চলেছেন। ক্রমবর্ধমান সংখ্যক সিইও প্রযুক্তি গ্রহণের মাধ্যমে তাদের প্রতিষ্ঠানের রূপান্তরে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনগুলো পরিচালনা করছেন এবং তাদের স্টেকহোল্ডারদের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ ফলাফল প্রদান করছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, কৌশলগত প্রভাব এবং নেতৃত্বের দিকনির্দেশনার জন্য জরিপের ফলাফলগুলো বাংলাদেশের ব্যবসায়িক নেতাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পর্যালোচনা বহন করে। বিকশিত বাজারের গতিশীলতার সাথে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাওয়ার জন্য সিইওদের অবশ্যই রূপান্তরমূলক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। একই সাথে অভিযোজনযোগ্যতা, উদ্ভাবন এবং টেকসই উদ্যোগের ওপর জোর দিতে হবে। ডিজিটাল প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করা, ক্রমাগত শেখার সংস্কৃতিকে উৎসাহিত করা এবং মূল ব্যবসায়িক কৌশলগুলোতে পরিবেশবান্ধব নীতি গ্রহন করা গুরুত্বপূর্ণ। উপরন্তু, টেকসই প্রবৃদ্ধি এবং প্রতিযোগিতার জন্য ভোক্তাদের পছন্দ এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার আইনসমূহ পরিবর্তনের সাথে সাথে সাংগঠনিক উদ্দেশ্যগুলোর পরিমার্জন ও পরিবর্ধন করা অপরিহার্য।










