ষাটের দশকের শুরুতে পাঞ্জাবি ট্রেডার্সের হাত ধরে যে ট্যানারি শিল্পের যাত্রা শুরু হয়েছিল, ২০১৭-১৮ সালে সাভারে ট্যানারিগুলো স্থানান্তরের মধ্য দিয়ে সে অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে। এরপর প্রায় ২৫ হেক্টরজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ২০০টিরও বেশি ট্যানারির ভবন জনশূন্য ও ভুতুড়ে অবকাঠামোয় পরিণত হয়েছিল। কিন্তু মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে সেই হাজারীবাগই এখন নতুন ধরনের বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠছে।
সরজমিনে দেখা যায়, গত পাঁচ বছরে হাজারীবাগের বিভিন্ন এলাকায় প্রতি বর্গফুট জায়গার ভাড়া কোনো কোনো ক্ষেত্রে চার গুণেরও বেশি বেড়েছে। একসময় নামমাত্র মূল্যে ভাড়া দেয়া পরিত্যক্ত ভবনগুলো এখন গুদাম, ওয়্যারহাউজ, ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের স্টোরেজ, জুতা ও ব্যাগ কারখানা, কাঁচা চামড়া প্রক্রিয়াকরণ ইউনিট, রাসায়নিকের গুদাম থেকে শুরু করে ক্রিয়েটিভ আর্ট স্টুডিও ও আর্কিটেকচারাল ফার্মের ঠিকানায় পরিণত হয়েছে।
হাজারীবাগের এ নবযাত্রার শুরুর দিকের সাক্ষী স্টুডিও ভাস্কর্মীর শিল্পী রুপম রায়। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘২০১৮-১৯ সালের দিকে ট্যানারিগুলো পুরোপুরি স্থানান্তরের পর ভবনগুলো মালিকদের কাছে একধরনের বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। তখন শিল্পীরা বড় বড় স্পেস অত্যন্ত সাশ্রয়ী ভাড়ায় নিতে পারতেন। ভাস্কর ও সিরামিকশিল্পীদের জন্য প্রয়োজনীয় বড় জায়গা এবং কাজের স্বাধীনতা থাকায় অনেকেই এখানে আসেন। সে সময় প্রতি বর্গফুটের ভাড়া ছিল ২০-২৫ টাকা, অনেক ক্ষেত্রে তারও কম।’
কিন্তু সে চিত্র এখন বদলে গেছে। দাগী আর্ট গ্যারেজের রাসেল চৌধুরী বণিক বার্তাকে জানান, বর্তমানে ভালো মানের স্পেসের জন্য প্রতি বর্গফুটের ভাড়া ৪০-৫০ টাকা পর্যন্ত দাবি করা হচ্ছে। কয়েক বছর আগে যেখানে নামমাত্র ভাড়ায় পুরো একটি ফ্লোর পাওয়া যেত, সেখানে এখন ছোট একটি স্টুডিওর মাসিক ভাড়াই ২০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
মনেশ্বর এলাকার ঢাকা ট্যানারির মোড়, তিন মাজার মোড়, চার রাস্তা ও শেরেবাংলা রোড ঘুরে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ট্যানারিগুলো চলে যাওয়ার পর মালিকেরা জায়গা খালি না রেখে মাত্র ৫-১০ টাকায়ও প্রতি বর্গফুট ভাড়া দিতেন। বর্ণ সুজের মোহাম্মদ সানি বলেন, ‘পাঁচ-ছয় বছর আগে ভালো অবস্থানের দোকানের ভাড়া ছিল প্রতি বর্গফুট ২০-২৫ টাকা, যা এখন বেড়ে ৬০-৬৫ টাকায় দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি অগ্রিম বা ডিডের অর্থও কয়েক গুণ বেড়েছে। আগে যেখানে ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকায় ডিড করা যেত, এখন দোকানের অবস্থান ও আকারভেদে তা ৫-১০ লাখ টাকা পর্যন্ত গড়িয়েছে।’
তিনি জানান, ২০১৯ সালের শেষ দিকে ১ হাজার ৪০০ বর্গফুটের একটি দোকান তারা মাসিক ১০ হাজার টাকায় ভাড়া নিয়েছিলেন, যা বর্তমানে বেড়ে ২০ হাজার টাকায় পৌঁছেছে। নতুন কেউ একই ধরনের জায়গা নিতে চাইলে তাকে আরো বেশি অর্থ গুনতে হবে।
হাজারীবাগের এ পরিবর্তনের পেছনে বড় কারণ অবকাঠামোগত সুবিধা। প্রশস্ত সড়ক ও বড় ভবনের কারণে নয়াবাজার, পুরান ঢাকা, এলিফ্যান্ট রোড ও কাঁটাবনের ব্যবসায়ীরা এখানে গুদাম ও স্টক পয়েন্ট গড়ে তুলছেন। বড় ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান অনায়াসে প্রবেশ করতে পারায় মালপত্র লোড-আনলোডও সহজ হচ্ছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের ওয়্যারহাউজ, টাইলস ও স্যানিটারিসামগ্রীর গুদাম এবং অনেক ক্ষুদ্র উৎপাদন ইউনিট এখন এ এলাকায় সক্রিয়।

স্টুডিও ভাস্কর্মী
ছোট একটি ট্যানারির মালিক মোহাম্মদ মহিউদ্দিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ট্যানারি স্থানান্তরের পরও অনেক রাসায়নিকের গুদাম হাজারীবাগেই থেকে গেছে। একই সঙ্গে ট্যানারির সাবেক শ্রমিকদের অনেকে ছোট ছোট জায়গা ভাড়া নিয়ে জুতা ও ফুটওয়্যার কারখানা গড়ে তুলেছেন। তারা বিভিন্ন ব্র্যান্ড ও দোকানের অর্ডার অনুযায়ী পণ্য উৎপাদন করছেন।’
ব্ল্যাক স্নো লেদার ক্র্যাফটসের মালিক ও হাজারীবাগের বাসিন্দা রফিকুল আলম বলেন, ‘ট্যানারি স্থানান্তরের আকস্মিক সিদ্ধান্তে অনেক শিপমেন্ট বাতিল হয়, বিদেশী ক্রেতারা মুখ ফিরিয়ে নেন এবং ক্ষুদ্র-মাঝারি উদ্যোক্তারা ব্যাংক ঋণের চাপে পড়ে যান। তখন টিকে থাকার জন্য অনেকে নামমাত্র ভাড়ায় নিজেদের জায়গা ছেড়ে দিতে বাধ্য হন।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সাবেক ট্যানারি মালিক জানান, একসময় তিনি ৫-৭ টাকায় প্রতি বর্গফুট দোকান ও গুদাম ভাড়া দিয়েছিলেন। এখন ৫০০-৭০০ বর্গফুটের দোকান ৫০-৫৫ টাকায় প্রতি বর্গফুট ইজারা দেয়া যাচ্ছে। তবে প্রধান সড়কসংলগ্ন সম্পত্তির মালিকরাই সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাচ্ছেন।
একসময় পরিবেশ দূষণের কারণে ‘রেড জোন’ হিসেবে পরিচিত এবং জমি কেনাবেচা সীমিত থাকা হাজারীবাগকে নিয়ে ‘গোল্ডেন সিটি’ বা পর্যটন কেন্দ্র গড়ার নানা পরিকল্পনার কথা শোনা গিয়েছিল। বাস্তবে সেই পরিকল্পনা আলোর মুখ না দেখলেও ট্যানারি স্থানান্তরের পর পরিত্যক্ত ভবনগুলোকে কেন্দ্র করে হাজারীবাগে নতুন ধরনের বাণিজ্যিক কার্যক্রমের বিস্তার ঘটেছে।
ট্যানারি স্থানান্তরের পরও হাজারীবাগের সম্পত্তির ওপর রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) বিভিন্ন বিধিনিষেধের কারণে অনেকে জমি বা স্থাপনা বিক্রি করতে না পারায় শত শত কোটি টাকার সম্পদ অচল অবস্থায় পড়ে আছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে রাজউকের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আশরাফুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে যে নিষেধাজ্ঞা ছিল, তা কিছু নীতিগত নির্দেশনা সাপেক্ষে প্রত্যাহার করা হয়েছে। নির্ধারিত নির্দেশনা মেনে তারা তাদের জমি উন্নয়ন করতে পারবেন, এতে কোনো সীমাবদ্ধতা নেই। এসব নীতিমালা সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের অংশগ্রহণেই প্রণয়ন করা হয়েছে।’
রাজউকের নীতিমালা জমির মালিকদের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছে কিনা সে প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘যে টাউনশিপের স্বপ্ন উনারা দেখেন সেজন্য জমির সঠিক মূল্যায়ন পেতে এবং আধুনিক জনপদ গড়ে তুলতে হলে ড্যাপের নতুন নিয়ম অনুযায়ী জমি থেকে ৪০ শতাংশ জায়গা উন্মুক্ত রাখতে হবে। হাজারীবাগের বর্তমান রাস্তাগুলো মাত্র ৬ থেকে ৮ ফুট প্রশস্ত, যা একটি আধুনিক শহরের জন্য কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। হাজারীবাগের বেশিরভাগ প্লট তিন থেকে পাঁচ কাঠার মতো ছোট ছোট। এ ছোট প্লটগুলোতে আলাদাভাবে উন্নয়ন না করে মালিকরা যদি একত্রিত হয়ে ব্লক ডেভেলপমেন্ট পদ্ধতিতে যান, তবে তারা প্রশস্ত রাস্তা, বড় প্লট এবং ভবনের কাঙ্ক্ষিত উচ্চতা পাবেন। মালিকরা চাইলে নিজেদের মধ্যে সমন্বয় করে, রাজউকের সঙ্গে যুক্ত হয়ে অথবা বেসরকারি খাতের সঙ্গে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে এ উন্নয়ন কাজ করতে পারেন। যদি পর্যাপ্ত জায়গা না ছাড়া হয়, তবে ভবিষ্যতে জলাবদ্ধতা এবং যানজটের সমস্যা আরো প্রকট হবে, যা পুরো শহরকে বসবাসের অযোগ্য করে তুলবে।’
তিনি আরো জানান, হাজারীবাগের মাটিতে ৮ থেকে ১০ ফুট গভীর পর্যন্ত ক্রোমিয়ামের ক্ষতিকর উপস্থিতি পাওয়া গেছে, যা মানবদেহের জন্য নির্ধারিত মানদণ্ডের চেয়ে অনেক বেশি। উন্নয়নের কাজ শুরু করার আগে এ দূষিত মাটির স্তরটি অবশ্যই অপসারণ করতে হবে। এ দূষিত মাটি যেখানে-সেখানে ডাম্পিং করা যাবে না, কারণ তাতে অন্য এলাকাও দূষিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে; তাই পরিবেশগত গাইডলাইন কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে। রাজউক চায় হাজারীবাগের মালিকরা তাদের স্বপ্নের টাউনশিপ গড়ে তুলুক, তবে তা অবশ্যই নির্ধারিত গাইডলাইন এবং আইন মেনে হতে হবে। মাটির দূষণ দূর করে এবং পর্যাপ্ত জায়গা ছেড়ে দিয়ে তবেই সেখানে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব।










