দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়া ডেঙ্গুর প্রকোপ করে নতুন বাড়তে শুরু করেছে উপকূলীয় জেলা বরগুনায়। মশাবাহিত এ রোগে আক্রান্তের সংখ্যা ছাড়িয়েছে সাত হাজার। চলতি বছরের মে ও জুনে প্রতিদিনই অন্তত ১০০-১২০ জন রোগী আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছে বরগুনা জেনারেল হাসপাতালে। তবে আগস্টের শুরুতে আক্রান্তের সংখ্যা কিছুটা কমলেও সেপ্টেম্বরের শেষদিকে আবারো বাড়তে শুরু করেছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য বলছে, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আক্রান্ত হয়েছে আরো ৪৬ জন। এ নিয়ে জেলায় মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৮৩ জনে। এখন পর্যন্ত মারা গেছেন ১১ জন। তবে বেসরকারি হিসাবে মৃতের সংখ্য অর্ধশত।
চিকিৎসকরা বলছেন, দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়া ডেঙ্গুর প্রকোপ চলতি বছর বরগুনায় বেশি দেখা গেছে। এরই মধ্যে উপকূলীয় এ জেলাকে ডেঙ্গুর হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করেছে স্বাস্থ্য বিভাগ। তবে হাসপাতালে চিকিৎসক সংকট, অপর্যাপ্ত ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রীর সংকট পরিস্থিতিকে আরো বেশি বিপদাপন্ন করে তুলছে। এ কারণে ঠিকমতো চিকিৎসাসেবা পাচ্ছে না রোগীরা। গুরুতর রোগীদের নিয়মিত পাঠানো হচ্ছে বরিশাল বা ঢাকার হাসপাতালগুলোয়।
বরগুনা ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. তাজকিয়া সিদ্দিকাহ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সেপ্টেম্বরের শুরুতে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা কমলেও শেষের দিকে আবারো বাড়তে শুরু করেছে। পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছিল সেপ্টেম্বরেই রোগীর সংখ্যা কমে যাবে, কিন্তু কিছুদিন ধরে ৮০-১০০ জন রোগী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকছে। বছরের শুরু থেকে যেভাবে হাসপাতালে রোগী ভর্তি হয়েছে, তাদের জন্য সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতায় যে পরিমাণ স্যালাইন ও ওষুধ পেয়েছি, তা দিয়ে এখন পর্যন্ত আমরা চিকিৎসাসেবা দিতে পেরেছি। তবে পরীক্ষার প্রয়োজনীয় সবকিছু পর্যাপ্ত থাকলেও সিবিসি পরীক্ষার রি-এজেন্টের কিছুটা সংকট তৈরি হয়েছে।’
চলতি বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ও মৃত্যু আগের সব রেকর্ড ভেঙেছে। পরিসংখ্যান বলছে, সরকারি হিসাবে বরগুনায় প্রথম ডেঙ্গুর প্রকোপ শুরু হয় ২০২২ সালে। এ সময় হাসপাতালে ভর্তি হয় ৪৮৫ জন। ২০২৩ সালে ভর্তি হন ৪ হাজার ৫৯২ জন। মারা যান সাতজন। ২০২৪ সালে আক্রান্তের হার কমে দাঁড়ায় ২ হাজার ৪৩৪ জনে। ওই বছর মারা যান চারজন। অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে চলতি বছর আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৮৩ জনে।
বরগুনা সিভিল সার্জন অফিসের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী এ বছর জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে এখন পর্যন্ত বিভিন্ন হাসপাতালে ৭ হাজার ৩৭ জন চিকিৎসা নিয়েছে। তাদের মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ৬ হাজার ৯০৬ জন। তবে আক্রান্ত রোগীর মধ্যে বরগুনা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয়েছে নয়জনের। পাথরঘাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয়েছে আরো দুজনের। এছাড়া দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় জেলার আরো অন্তত ৪০ জনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। সদর উপজেলার পর পাথরঘাটা উপজেলায় সব থেকে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেশি এবং মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে বেশি। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটিতে এখন পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছে ৬০৩ জন।
হঠাৎ আবার ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার বিষয়ে বরগুনা জেনারেল হাসপাতালের মেডিসিন কনসালট্যান্ট ডা. মো. আশিকুর রহমান বলেন, ‘এ বছর বরগুনায় ডেঙ্গুর প্রকৃত সময়ের আগেই মানুষ আক্রান্ত হতে শুরু করে। তবে নভেম্বরের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা বেশি থাকে। মানুষের মাঝে সচেতনতা কমে যাওয়া আবারো আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছে। আমরা নিয়ম অনুযায়ী চিকিৎসাসেবা দিচ্ছি, তবে আক্রান্তের সংখ্যা কমাতে সবার সচেতন হওয়ার বিকল্প নেই।’
বরগুনার সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ আবুল ফাত্তাহ বলেন, ‘গত ২৪ ঘণ্টায় বরগুনায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৩৭ জন। জেলা সদর হাসপাতালে বর্তমানে চিকিৎসাধীন আছেন ৮৩ জন। প্রতিদিনই ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী বেড়েই চলেছে।’ এমন পরিস্থিতিতে ডেঙ্গুর প্রকোপ কমাতে স্থানীয়দের সচেতন হওয়ার পাশাপাশি ব্যাপক পরিসরে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান এবং মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনার তাগিদ দেন তিনি।










