দেশে চালু থাকা কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সক্ষমতা বর্তমানে ২ হাজার ৮৭০ মেগাওয়াটের মতো। বিদ্যুতের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে আরো অন্তত ৬ হাজার ২০০ মেগাওয়াটের তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের কাজ চলমান। তিন বছরের মধ্যে এগুলো উৎপাদনে যাওয়ার কথা রয়েছে। ফলে এসব বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালাতে বিপুল পরিমাণ কয়লা আমদানির প্রয়োজন পড়বে। অর্থাৎ চাহিদা বিবেচনায় ২০২৫ সালের মধ্যে যদি পাঁচ হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতার বিদ্যুৎ কেন্দ্রও চালানো হয়, তাতে বছরে কয়লার প্রয়োজন পড়বে ১ দশমিক ৯ মিলিয়ন বা প্রায় দুই কোটি টন। প্যারিসভিত্তিক এনার্জি খাতের নীতিনির্ধারণী ও তথ্য সরবরাহকারী স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি (আইইএ) এ পূর্বাভাস দিয়েছে।

‘কোল ২০২২: অ্যানালাইসিস অ্যান্ড ফোরকাস্ট ২০২৫’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদনে দক্ষিণ এশিয়ায় কয়লার উচ্চমূল্য, প্রভাব ও চাহিদাসংক্রান্ত অধ্যায়ে বাংলাদেশের তাপভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে কয়লার চাহিদার বিষয়টি তুলে ধরেছে আইইএ। প্রতিবেদনে সংস্থাটি জানায়, বাংলাদেশে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সক্ষমতা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০২৫ সাল নাগাদ এর সক্ষমতা দাঁড়াবে পাঁচ হাজার মেগাওয়াট। আর এসব বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালাতে সংশ্লিষ্ট সময়ে বাংলাদেশের কয়লার চাহিদা ১৯ মিলিয়ন টনে গিয়ে দাঁড়াবে।

দেশে কয়লাভিত্তিক আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তির দুটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু রয়েছে। এর একটি পটুয়াখালীতে ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট সক্ষমতার পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং অন্যটি বাগেরহাটের রামপালে ৬৬০ (প্রথম ইউনিট) মেগাওয়াটের মৈত্রী সুপার থার্মাল পাওয়ার প্লান্ট। রামপালের বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির মোট সক্ষমতা যদিও ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট। দ্বিতীয় ইউনিটের কাজ পুরোপুরি শেষ না হওয়ায় এখনো তা উৎপাদনে যেতে পারেনি।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট সক্ষমতার একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র ২৪ ঘণ্টা চালাতে প্রায় ১২ হাজার টন কয়লার প্রয়োজন। আইইএর সক্ষমতার হিসাব অনুযায়ী, পাঁচ হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতার বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালাতে দৈনিক ৪৬ হাজার টন কয়লার প্রয়োজন। আর বিপুল এ পরিমাণ কয়লা আমদানি করতে হবে।

জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে কয়লার বৃহৎ মজুদ থাকলেও তা বৃহৎ আকারে উত্তোলনের কোনো পরিকল্পনা নেই। ফলে আমদানি করেই এসব বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালাতে হবে। আন্তর্জাতিক বাজারে কয়লার দাম এখন কিছুটা নিম্নমুখী থাকলেও চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় আগামী বছরে তা পুনরায় ঊর্ধ্বমুখী হবে বলেই ধারণা করা যায়। এর মধ্যে দেশে ডলারের সংকট থাকায় বিদ্যমান কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পুরোটা চালানো যাচ্ছে না প্রয়োজনীয় জ্বালানি আনতে না পারায়। এর মধ্যে কয়লাভিত্তিক সব প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে সেগুলো কীভাবে চালানো হবে তা নিয়েও রয়েছে উদ্বেগ।

এ বিষয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ভূতত্ত্ববিদ অধ্যাপক বদরূল ইমাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমদানিনির্ভর জ্বালানি বাজার বরাবরই অস্থিতিশীল। অথচ আমাদের দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা অনেকটাই নির্ভর করছে আমদানীকৃত তেল, গ্যাস ও কয়লার ওপর। কয়লার বৈশ্বিক বাজার আগামীতে আরো অস্থিতিশীল হতে পারে। ফলে এ ধরনের বিদ্যুৎ কেন্দ্র পরিচালনা করতে গিয়ে সংকটে পড়তে হতে পারে আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশকে।’

দেশের তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো বর্তমানে চালানো হচ্ছে ইন্দোনেশিয়া থেকে আমদানি করা কয়লা দিয়ে। আর কয়লা কেনার ক্ষেত্রে বিপিডিবি ইন্দোনেশিয়ান কোল ইনডেক্স ও অস্ট্রেলিয়ার নিউক্যাসল ইনডেক্স অনুসরণ করে থাকে। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চমূল্য এবং দেশে ডলার সংকটের কারণে এলসি (ঋণপত্র) জটিলতায় বন্ধ করে দিতে হয় রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের কয়লা আমদানি। বন্ধের শঙ্কা তৈরি হয় পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রেরও। বর্তমানে কয়লা সংকটের কারণে বন্ধ রয়েছে রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি। এর আগেও কয়লা সংকটে পড়ায় দুই দফায় বন্ধ রাখতে হয়েছে রামপালকে।

আইইএর প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিশ্ববাজারে কয়লার চাহিদা বাড়বে। বিদ্যমান সক্ষমতার চেয়ে বাড়বে আরো আট বিলিয়ন টন। বিশেষ করে সংশ্লিষ্ট সময়ে চীনের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ব্যবহার বাড়লে কয়লার এ চাহিদা তৈরি হবে। কেননা বিশ্বের মোট চাহিদার ৫৩ শতাংশ কয়লাই ব্যবহার করে চীন। ২০২১ সালে দেশটিতে জ্বালানিটির এ চাহিদা বেড়ে দাঁড়াবে ৪ দশমিক ৬ মিলিয়ন টন। যদিও বছরের দ্বিতীয়ার্ধে দেশটির কয়লা চাহিদা কমতে শুরু করে।

এদিকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে বিশ্বব্যাপী প্রাকৃতিক গ্যাসের সংকট তৈরি হলে কয়লার চাহিদা বেড়ে যায়। ফলে গত বছরের জুলাই নাগাদ পণ্যটির দামও বাড়ে দ্বিগুণের বেশি। ওই সময় নিউক্যাসল ইনডেক্সে ছয় হাজার কিলোক্যালরি (এফওবি) কয়লার দাম টনপ্রতি ৪৫০ ডলারে উঠে যায়। ফলে পণ্যটি আমদানি করতে গিয়ে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও শ্রীলংকার মতো দেশ পর্যাপ্ত জ্বালানি সংগ্রহে ব্যর্থ হয়। ফলে তার প্রভাব পড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। তীব্রভাবে বেড়ে যায় লোডশেডিং। যদিও বর্তমানে ৬ হাজার এফওবি কয়লার দাম টনপ্রতি ১৮৫-১৯০ ডলারে ওঠানামা করছে।

কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো পরিচালনার বিষয়ে জানতে চাইলে বিদ্যুতের নীতি ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক প্রকৌশলী মোহাম্মদ হোসাইন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সরকারের পরিকল্পনা হলো কম মূল্যের জ্বালানি ব্যয়ে বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন। ফলে সাশ্রয়ী জ্বালানিকে বরাবরই প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে। আগামীতে যেসব বিদ্যুৎ কেন্দ্র বিশেষত কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র আসবে, সেগুলোর জ্বালানি জোগান নিয়ে পরিকল্পনা রয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগের। আমরা মূল্য সাশ্রয়ী বিবেচনায় ইন্দোনেশিয়া থেকে কয়লা আমদানি করছি। কয়লার মান ও পরিবহন খরচ ও দাম বিবেচনায় অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকার বাজারও আমদানির তালিকায় রাখা হয়েছে।’