মূল্যস্ফীতি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিসহ নানা কারণেই বেতন বাড়ানোর দাবি করে আসছে পোশাক শ্রমিক ও তাদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো। এদিকে বিদ্যমান শ্রম আইন অনুযায়ীও, পাঁচ বছর পরপর শিল্প খাতের শ্রমিকদের মজুরি পর্যালোচনার বিধান রয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতেই পোশাক খাতের শ্রমিকদের মজুরি পর্যালোচনায় নতুন বোর্ড গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এরই মধ্যে শিল্প মালিকদের প্রতিনিধির নাম চেয়ে পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ বরাবর চিঠি পাঠিয়েছে শ্রম অধিদপ্তর। সংগঠনটিও প্রতিনিধি নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করেছে বলে জানা গেছে।
পোশাক শ্রমিকদের মজুরি পর্যালোচনায় সর্বশেষ বোর্ড গঠন হয় ২০১৮ সালে। নতুন মজুরি কাঠামো ঘোষণা দেয়া হয় ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে। তার আগে ২০১৩ সালে সর্বনিম্ন গ্রেডে ন্যূনতম মজুরি ছিল ৫ হাজার ৩০০ টাকা। সেটি পর্যালোচনা শেষে ২০১৮ সালে পুনর্নির্ধারণ করা ন্যূনতম মজুরি হার ছিল ৮ হাজার টাকা। শ্রম আইন অনুসরণ করেই ২০১৮ সালের পর এ বছর শ্রমিকদের নিম্নতম মজুরি হার পুনর্নির্ধারণের উদ্যোগ নিয়েছে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়।
শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ সংস্থা শ্রম অধিদপ্তর থেকে বিজিএমইএকে গত ২৬ জানুয়ারি চিঠি পাঠানো হয়। অধিদপ্তরের পরিচালক মুহাম্মদ নাসির উদ্দিন স্বাক্ষরিত চিঠিতে বিষয় উল্লেখ ছিল ‘গার্মেন্টস শিল্প সেক্টরের শ্রমিকদের জন্য নিম্নতম মজুরি হার পুনর্নির্ধারণের লক্ষ্যে মালিকপক্ষের প্রতিনিধি মনোয়ন প্রদান প্রসঙ্গে’। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের চিঠির বরাত দিয়ে তাতে বলা হয়, ‘গার্মেন্টস শিল্প সেক্টরের শ্রমিকদের জন্য নিম্নতম মজুরি হার পুনর্নির্ধারণের জন্য শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় থেকে মালিকপক্ষের প্রতিনিধির মনোনয়ন চাওয়া হয়েছে। এ অবস্থায় শ্রমিকদের মজুরির বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল বিবেচনায় বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ধারা ১৩৮(৬) ও বাংলাদেশ শ্রম বিধিমালা ২০১৫-এর ১২১ বিধি মোতাবেক উল্লেখিত শিল্প সেক্টরে কর্মরত শ্রমিকদের নিম্নতম মজুরি নির্ধারণের জন্য নিম্নতম মজুরি বোর্ডে প্রতিনিধিত্ব করার লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট সেক্টরের মালিকপক্ষের তিনজন প্রতিনিধির নামের প্রস্তাবসহ প্রত্যেকের জীবনবৃত্তান্ত, জাতীয় পরিচয়পত্র ও দুই কপি ছবিসহ প্রতিষ্ঠান/সংগঠন ও পদবি স্পষ্টভাবে উল্লেখপূর্বক অত্র দপ্তরে প্রেরণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।’
বিজিএমইএ সূত্রে জানা গেছে, শ্রম অধিদপ্তরের চিঠি পেয়ে এরই মধ্যে অনানুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হয়েছে সংগঠনে। চলতি মাসে সংগঠনটির বোর্ড মিটিংয়ে মজুরি বোর্ডের প্রতিনিধির বিষয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা হবে। সেখানে প্রতিনিধি চূড়ান্ত হলে নাম পাঠানো হবে। মজুরি বৃদ্ধির বিষয়েও মালিকপক্ষ ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছে।
মজুরি বোর্ডে নাম প্রস্তাব করার প্রস্তুতি সম্পর্কে জানতে চাইলে বিজিএমইএর সহসভাপতি শহিদউল্লাহ আজিম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রস্তুতি নিতেই হবে। বোর্ড মিটিংয়ে প্রতিনিধি মনোনয়ন দেয়া হবে। সরকারের নির্দেশনা অনুসরণ করে আমরা প্রতিনিধি দেব। মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি দিয়েছে প্রতিনিধি মনোনয়নের জন্য। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসবে বোর্ড মিটিংয়ের পরে। চলতি মাসেই বোর্ড মিটিং অনুষ্ঠিত হবে। যদিও মজুরি বৃদ্ধির জন্য পরিস্থিতি আমাদের অনুকূলে না। তার পরও আমরা চাই কম-বেশি রিজনেবল কিছু একটা হোক। এখানে জোরজবরদস্তির কোনো প্রেক্ষাপট নেই, কারখানা বাঁচলে শ্রমিকরা বাঁচবে।’
পোশাক খাতের শ্রমিক সংগঠনগুলোও এরই মধ্যে মজুরি বৃদ্ধির দাবি নিয়ে কর্মসূচি পালন করতে শুরু করেছে। তারা দাবি করছে, পোশাক খাতের শ্রমিকদের জন্য ২০১৮ সালে ন্যূনতম মজুরি ৮ হাজার টাকা ঘোষণা করা হয়েছিল। এরই মধ্যে চার বছরে মূল্যস্ফীতি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতিসহ বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির মূল্যবৃদ্ধিতে গার্মেন্টসহ অন্যান্য খাতের শ্রমিকের জীবন আজ সীমাহীন দুর্দশায় অতিবাহিত হচ্ছে। বাংলাদেশ গার্মেন্ট শ্রমিক ঐক্য পরিষদের পক্ষ থেকে সপ্তম গ্রেডের শ্রমিকদের জন্য ৬৫ ভাগ মূল মজুরিসহ ২২ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের দাবি উঠেছে।
২০১৮ সালে পর্যালোচনার পর সপ্তম গ্রেডে মূল মজুরি নির্ধারণ হয় ৪ হাজার ১০০ টাকা। মোট মজুরি হয় ৮ হাজার টাকা। গ্রেড ৬-এ মূল ও মোট মজুরি যথাক্রমে ৪ হাজার ৩৮০ ও ৮ হাজার ৪২০ টাকা পুনর্নির্ধারণ করা হয়। গ্রেড ৫-এ মূল ও মোট মজুরি যথাক্রমে ৪ হাজার ৬৮৩ ও ৮ হাজার ৮৭৫ টাকা পুনর্নির্ধারণ করা হয়। গ্রেড ৪-এ মূল ও মোট মজুরি হয়েছে যথাক্রমে ৪ হাজার ৯৯৮ ও ৯ হাজার ৩৪৭ টাকা। গ্রেড ৩-এ মূল ও মোট মজুরি যথাক্রমে ৫ হাজার ৩৩০ ও ৯ হাজার ৮৪৫ টাকা পুনর্নির্ধারণ করা হয়। গ্রেড ২-এ মূল ও মোট মজুরি যথাক্রমে ৯ হাজার ৪৪ ও ১৫ হাজার ৪১৬ টাকা পুনর্নির্ধারণ করা হয়। গ্রেড ১-এ মূল ও মোট মজুরি হয় যথাক্রমে ১০ হাজার ৯৩৮ ও ১৮ হাজার ২৫৭ টাকা।










