বর্তমানে দেশে সাক্ষরতার হার ৭৪ দশমিক ৭০ শতাংশ। এক পরিবারের দায়িত্বশীল কোনো সদস্যের কাছ থেকে ওই পরিবারের ছয় বছর ও এর বেশি বয়সী সবার তথ্য সংগ্রহ করে এ হার নির্ধারণ করা হয়। এ পদ্ধতিতে সাক্ষরতার মান যাচাইয়ের কোনো ব্যবস্থা থাকে না। তাই বর্তমান প্রেক্ষাপটে এটি আন্তর্জাতিক মানের নয়। এজন্য ইউনেস্কো কর্তৃক প্রণীত ও স্বীকৃত সাক্ষরতার হার নিরূপণে নতুন একটি প্রকল্প গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)।

‘টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট পরিবীক্ষণে প্রায়োগিক সাক্ষরতা নিরূপণ জরিপ’ শীর্ষক নতুন এ প্রকল্পের বিভাগীয় প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (ডিপিইসি) সভার কার্যপত্র থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। সম্প্রতি পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব মুহাম্মদ ইয়ামিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভার কার্যপত্রেও তিনি স্বাক্ষর করেন।

প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ কোটি ৯২ লাখ টাকা। ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২২ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সময়ে এ কার্যক্রম সম্পন্ন করার কথা রয়েছে। তবে এ প্রকল্পে কিছুটা পরিবর্তন আসতে পারে বলেও জানা গেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানে উন্নত ও অধিকাংশ মধ্যম আয়ের দেশ আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে সাক্ষরতার হার নির্ধারণ করে। বাংলাদেশও উন্নত দেশের কাতারে যেতে চায়। তাই দেরিতে হলেও সরকারের এ ধরনের উদ্যোগকে স্বাগত জানান তারা।

এ প্রসঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, প্রতিটি দেশই নিজস্ব পদ্ধতিতে সাক্ষরতার হার নির্ধারণ করে। সেখানে অনেকেই আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্যবহার করে। অধিকাংশ উন্নত ও মধ্যম আয়ের দেশ আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্যবহার করে। বাংলাদেশ জাতীয় মানদণ্ড ব্যবহার করে। সেজন্যই সাক্ষরতা নির্ধারণ নিয়ে বিতর্ক ওঠে।

পৃথিবীতে প্রায়োগিক পদ্ধতি অনেক আগে থেকেই আছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বেশ কয়েক বছর আগে বেসরকারিভাবে আমরা দেশে সাক্ষরতা নিয়ে আন্তর্জাতিক মানের একটা গবেষণা করেছিলাম। তখনকার সরকার বলছিল, দেশে সাক্ষরতার হার ৫৮ শতাংশ। কিন্তু আমরা জরিপ করে পেয়েছিলাম ৪৮ শতাংশ। তখন সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, তারা সেলফ রেটিং ভিত্তিতে জরিপ করেছিল। আমরা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে জরিপ করেছিলাম। এজন্যই ১০ শতাংশের ফারাকটা হয়েছিল। 

তবে সরকার দেরিতে হলেও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে জরিপ করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এটাকে সাধুবাদ জানান রাশেদা কে চৌধুরী। তিনি বলেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে পৃথিবীতে সাক্ষরতা এবং দক্ষতা এ দুটোর কোনো বিকল্প নেই। বিশেষ করে আমরা যেখানে মধ্যম আয় ও উন্নত দেশের কাতারে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছি, এক্ষেত্রে সাক্ষরতার হার কত এটা সবার আগে উঠে আসে। সেজন্য আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে এটা করাটা খুবই প্রয়োজন।

জানতে চাইলে বিবিএসের মহাপরিচালক মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, আন্তর্জাতিক সট্যান্ডার্ডে যে পরিমাপ হয়, সে অনুযায়ী একটি জরিপ করার চেষ্টা করা হচ্ছে। আগে সাক্ষর করতে পারলেই শিক্ষিত বোঝাত। এরপর শিক্ষিতের সংজ্ঞায় বলা হলো, শিক্ষিত হতে হলে সাক্ষর যেমন জানা লাগবে, তেমনি হাটবাজারের হিসাব করা লাগবে। কাজেই আগের যে ক্রাইটেরিয়া আর বর্তমান ক্রাইটেরিয়া কিন্তু এক নয়। ক্রাইটেরিয়া চেঞ্জ হলেই কিন্তু সংজ্ঞাতেও চেঞ্জ আসে।

নতুন প্রকল্পের বিষয়ে সভায় বলা হয়, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো মূলত বিভিন্ন জরিপ ও শুমারিতে সনাতনী স্বনির্ধারণী পদ্ধতিতে বা উত্তরদাতা কর্তৃক প্রদত্ত তথ্যের ভিত্তিতে ‘সাধারণ সাক্ষরতার হার’ নিরূপণ করে। এ পদ্ধতিতে সাক্ষরতার হার নিরূপণের অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এতে একদিকে যেমন সাক্ষরতার গুণগত দিক নিরূপিত হয় না, অন্যদিকে গুণগত তথ্যের অভাবে আর্থসামাজিক উন্নয়নে সাক্ষরতার প্রভাব নিরূপণেও পরিকল্পনা প্রণয়ন করা কঠিন হয়ে পড়ে। তাছাড়া সনাতন পদ্ধতিতে সাক্ষরতার হার আন্তর্জাতিকভাবে তুলনার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

বর্তমানে যে পদ্ধতিতে সাক্ষরতার হার নির্ধারণ করা হয়, এটা আন্তর্জাতিক মানের কিনা জানতে চাইলে প্রকল্পের ফোকাল পয়েন্ট কর্মকর্তা মো. আলমগীর হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, সময়ে সময়ে সংজ্ঞায় পরিবর্তন আসে। এখন এসডিজির যুগে এসে সাক্ষরতার সংজ্ঞায় পরিবর্তন এসেছে। এখন এটাকে বলা হচ্ছে ফাংশনাল (প্রায়োগিক) লিটারেসি, আগেরটা ছিল জেনারেল (সাধারণ) লিটারেসি। বর্তমানে আমাদের সাধারণ সাক্ষরতার হার ৭৪ দশমিক ৭০ শতাংশ। এখন আবার যদি নতুন করে প্রায়োগিক সাক্ষরতার হার নিরূপণ করা হয়, তাহলে সাক্ষরতার হার কমে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, কোয়ালিটি এডুকেশন যদি হয়ে থাকে তাহলে কমবে না। যতটুকু পার্থক্য ওইটুকু কোয়ালিটি। এ দুই জরিপে খুব বেশি পার্থক্য থাকে না।