ময়মনসিংহের ইতিহাস-ঐতিহ্যে যে কয়টি নদ-নদীর নাম রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম কংস। এক সময়ের খরস্রোতা এ নদের পানি দিয়ে কৃষক জমিতে সেচ দিতেন। চলাচল করত নৌযান। নৌপথে পরিচালিত হতো ব্যবসা-বাণিজ্য। জেলেরা মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতেন। তবে বছরের পর বছর পলি জমে ভরাট হয়েছে নদের তলদেশ। ধীরে ধীরে পানিপ্রবাহ কমে মরা নদে পরিণত হয়েছে কংস। ২০২২ সালে ১৩৪ কোটি টাকা ব্যয় করে খনন করা হয় নদটি। তাতেও ফেরেনি পানিপ্রবাহ। বরং গ্রীষ্মে একেবারেই পানিশূন্য হয়ে পড়েছে।
নদী গবেষকরা বলছেন, ভারতের তুরা পাহাড়ে বিভিন্ন ঝরনার সম্মিলনে কংস নদের উৎপত্তি। শেরপুরের হাতিবাগার এলাকা দিয়ে কংস বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। উৎপত্তিস্থল থেকে শেরপুরের নালিতাবাড়ী পর্যন্ত নদটির নাম ভূগাই। নালিতাবাড়ীর পাঁচ মাইল ভাটিতে এসে দিংঘানা, চেল্লাখালী, দেওদিয়া মারিসি, মলিজি নামে উপনদীগুলো ভূগাইয়ে মিলিত হয়েছে। ভূগাই সে স্থানে বেশ খরস্রোতা হলে পূর্বদিকে প্রবাহিত হয়ে ফুলপুরের কাছাকাছি এসে খড়িয়া নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে। খড়িয়া ব্রহ্মপুত্রের শাখা নদী। ফুলপুর উপজেলার পর থেকে ভূগাই নদটি কংস নামে খ্যাত। নালিতাবাড়ী উপজেলা সীমান্ত দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট, ফুলপুর, ধোবাউড়া ও নেত্রকোনার পূর্বধলা, সদর, বারহাট্টা, মোহনগঞ্জ, ধর্মপাশা, দুর্গাপুর উপজেলায় সোমেশ্বরীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে কংস নদ, যার দৈর্ঘ্য ২২৫ কিলোমিটার। নেত্রকোনার ভেতর আবার অনেক শাখা নদী কংস থেকে বেরিয়ে দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত হয়েছে। পূর্বধলার সীমানায় কংস থেকে একটি শাখা ধলাই নদের সঙ্গে মিলিত হয়েছে, যা কালিহর নদ নামে পরিচিত। কালিহরের শাখা নদী খানিগাঙ।
প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) ২০১৯ সালের ২৩ মে নদটির খননকাজ শুরু করে। ২০২২ সালের ২৩ জুলাই খননকাজ শেষ হয়। এতে ব্যয় হয় ১৩৪ কোটি ৬৪ লাখ ৭৯ হাজার ১২০ টাকা। পাঁচটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান খননকাজ করে।
বিআইডব্লিউটিএর তথ্য বলছে, নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ থেকে শেরপুরের নালিতাবাড়ী পর্যন্ত ১৫৫ কিলোমিটার নৌপথে ১ কোটি ঘনমিটার মাটি খনন করা হয়। শুধু তাই নয়, উল্লিখিত স্থানে প্রস্থে ৮০-১০০ ফুট ও ৮ ফুট গভীরতায় খননকাজ করা হয় বলে কাগজে উল্লেখ রয়েছে।
তবে কাগজপত্রের সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল নেই বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তারা বলছেন, নদ খনন তাদের দুর্ভোগ আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।
নদপাড়ের কৃষক মনির হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘খননের আগে নদে পানি থাকত। কৃষক বোরো ধান আবাদ করতেন। এখন কেউ দেখলে এটিকে নদ বলবে না। খননের নামে এ এলাকায় শুধু বালির ব্যবসা হয়েছে। কংসে বড় বড় বোয়াল, রুই, কাতল, শোল মাছ পাওয়া যেত। এছাড়া নদে ইলিশ মাছও পাওয়া যেত। নদের বিখ্যাত মহাশোল মাছের নাম তো সবারই জানা। তবে এখন ইতিহাসের সঙ্গে বাস্তবতার মিল খুঁজে পাওয়া যাবে না।’
স্থানীয় বাসিন্দা মেহের আলী বলেন, ‘খননের পর নদ থেকে উত্তোলিত বালি রাখা হয়েছিল পাড়েই। স্থানীয়রা কিছুদিন সেটি নিয়ে ব্যবসা করেছে। কিন্তু বৃষ্টিতে অধিকাংশ বালি আবারো নদে গিয়ে মিশেছে। এতে ভরাট হয়ে নদটিতে এখন আর পানি থাকে না। বর্ষা মৌসুমে পাড় ভেঙে ব্যাপক ক্ষতি হয়। এক সময় নদে মানুষ মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করত। এখন কিছু স্থানে অল্প পরিমাণে পানি থাকলেও মাছ নেই।’
সরজমিন দেখা গেছে, হালুয়াঘাট ও ফুলপুর উপজেলার সংযোগস্থল সরচাপুর-গাজীপুর গ্রামে নদটি শুকিয়ে গেছে। গ্রামের শিশু-কিশোররা নদে ফুটবল খেলছে, যা এর আগে দেখা তো দূরের কথা কেউ কল্পনাও করেনি। নদটির এমন বেহাল দশা নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে স্থানীয়দের মাঝেও।
এ ব্যাপারে হালুয়াঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আলী নূর খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কংস এ অঞ্চলের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ নদ। পুনঃখননের বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে জানাব। এটি ভালোভাবে খনন হলে এ এলাকার আর্থ সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’
সার্বিক বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএর অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (ড্রেজিং বিভাগ) সাজেদুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘যেসব এলাকায় ড্রেজিং করা হয়েছে, সেখানে পানিপ্রবাহ না থাকার কথা নয়। তবে ফ্ল্যাশ ব্লার্ড হওয়ার কারণে ভরাট হতে পারে। যেসব এলাকায় সমস্যা আছে সেখানে আমরা পুনরায় সংস্কার করে দেব। দেশের শীর্ষ পাঁচটি প্রতিষ্ঠান ড্রেজিং কাজ করেছে। তাদের মধ্যে বসুন্ধরা, অ্যাকুয়া মোড়ল, নবারুন অন্যতম। তাদের কাজের কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। তবে কোথাও সমস্যা থাকলে আমরা সংস্কার করে দেব।’










