ফরিদপুরে সংসদীয় আসন পুনর্বিন্যাসের প্রতিবাদ ও পুরনো সীমানা বহালের দাবিতে মহাসড়ক ও রেলপথ অবরোধ কর্মসূচি শুরুতে শান্তিপূর্ণ হলেও পরে তা সহিংস হয়ে ওঠে। গতকাল বেলা পৌনে ১টার দিকে ভাঙ্গা উপজেলা পরিষদ ও থানায় হামলা চালানো হয়। অফিসার্স ক্লাবসংলগ্ন গ্যারেজেও অগ্নিসংযোগ করা হয়। বেলা ৩টার পর থেকে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করে। বিকাল নাগাদ গোলচত্বর এলাকা ফাঁকা হয়ে যায়।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বেলা ১টার দিকে কিছু মানুষ ভাঙ্গা উপজেলা বাসস্ট্যান্ড এলাকা থেকে থানার দিকে অগ্রসর হয়। পরে তারা থানার মধ্যে থাকা কয়েকটি যানবাহন ভাংচুর করে। কয়েকটি মোটরসাইকেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। এ সময় তারা থানা ভবনেও ভাংচুর চালায়। প্রায় একই সময়ে উপজেলা পরিষদের দুটি ভবনে ভাংচুর করা হয়। এ সময় উপজেলা নির্বাচন অফিসেও হামলা চালানো হয়। ভবনের প্রায় প্রতিটি গ্লাসই ভাংচুর করা হয়। পুরনো ভবনের সামনে কয়েকটি মোটরসাইকেলে আগুন ধরিয়ে দেয় আন্দোলনকারীরা। বেলা দেড়টা পর্যন্ত ভাংচুর চালানো হয়। এর কিছু সময় পর কম বয়সী কিছু মানুষ লাঠিসোটাসহ হাইওয়ে থানায় ঢুকে পড়ে। তারা হাইওয়ে পুলিশের অন্তত ১০টি গাড়ি ভাংচুর করে। ভবনের বিভিন্ন অংশ ও গ্লাস ভাংচুর করা হয়। বেলা ২টার দিকে তারা ফের বাসস্ট্যান্ড এলাকায় জড়ো হয়।

ভাঙ্গা হাইওয়ে থানার ওসি মো. রকিবুজ্জামান জানান, দুপুরের পরে ৪০০-৫০০ অবরোধকারী থানায় হামলা করে। এ সময় থানার প্রতিটি কক্ষসহ বাইরের সবকিছু ভাংচুর করা হয়। তছনছ করা হয় গুরুত্বপূর্ণ জিনিসসহ ভেতরে থাকা সবকিছু। থানায় থাকা বেশ কয়েকটি গাড়ি ভাংচুর করা হয়েছে। একটি গাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হয়।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) শামসুল আজম জানান, বিকালের দিকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসে। এখন যান চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। বিভিন্ন দপ্তরে হামলা-ভাংচুরের ঘটনায় ক্ষতির পরিমাণ এখনো নিরূপণ করা হয়নি।

জেলা প্রশাসক মো. কামরুল হাসান মোল্যা বলেন, ‘আমরা বিক্ষুব্ধদের শান্ত করার চেষ্টা করেছি এবং নির্বাচন কমিশনে বিষয়টি জানানো হয়েছে। নির্বাচন কমিশন থেকে আমাদের বলা হয়েছে দ্রুত প্রতিবেদন দিতে। আমরা দ্রুত প্রতিবেদন দিলে আশা করি দুই-একদিনের মধ্যে সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে।’

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের প্রহরী মো. সামসু জানান, হামলার সময় তিনি দোতলায় ইউএনও কার্যালয়ের সামনে অবস্থান করছিলেন। ওই সময় শত শত লোক উপজেলা পরিষদ কমপ্লেক্সে প্রবেশ করে। তার আগে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। যেসব অফিস খোলা ছিল প্রতিটিতে ভাংচুর চালায়। তবে যেসব কক্ষ বন্ধ ছিল সেগুলো ভাঙার চেষ্টা করেনি। কাউকে মারধরও করেনি।

গত ৪ সেপ্টেম্বর গেজেটের মাধ্যমে ৩০০ আসনের সীমানা নির্ধারণের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করে নির্বাচন কমিশন। এর মধ্যে ফরিদপুর-৪ আসনের (ভাঙ্গা-সদরপুর-চরভদ্রাসন) ভাঙ্গা থেকে আলগী ও হামিরদী ইউনিয়ন বাদ দিয়ে ফরিদপুর-২ আসনের (নগরকান্দা ও সালথা) সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। এর প্রতিবাদে সর্বদলীয় ঐক্য পরিষদের ব্যানারে বেশ কিছুদিন ধরে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আসছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। ৫ সেপ্টেম্বর মহাসড়ক অবরোধ করে রাখে তারা। তবে ওই দিনই স্থানীয় প্রশাসনের আশ্বাসে অবরোধ তুলে নিলেও পরবর্তী দুদিনে এ বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা না নেয়ায় আবারো অবরোধ কর্মসূচি দেন আন্দোলনকারীরা। এর অংশ হিসেবে রোববার থেকে তিনদিনের সকাল-সন্ধ্যা সড়ক ও রেলপথ অবরোধ কর্মসূচি শুরু করেন তারা।

দ্বিতীয় দিনের মতো গতকাল বেলা ১১টায় মহাসড়ক ও রেলপথ অবরোধ কর্মসূচি শুরু হয়। সকাল থেকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতায় আন্দোলনকারীরা সড়কের পাশে অবস্থান নেয়। তবে বেলা ১১টার দিকে তারা ঢাকা-বরিশাল ও ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের দুটি স্থানে অবরোধ শুরু করে। এতে মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।

এছাড়া ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের আলগী ইউনিয়নের সোয়াদী এলাকা থেকে শুরু হওয়া ‘লং মার্চ টু ভাঙ্গা’ দুপুর ১২টার মধ্যে গোলচত্বর এলাকায় এসে পৌঁছায়। তখন ভাঙ্গা গোলচত্বরসহ আশপাশের এলাকা হাজারো মানুষ নিয়ন্ত্রণ নেয়। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা বিক্ষোভকারীদের সড়ক থেকে সরানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। অল্পসংখ্যক পুলিশ পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা করলে তাদের ধাওয়া করে বিক্ষোভকারীরা। পরে পুলিশ সদস্যরা ভাঙ্গা মডেল মসজিদে আশ্রয় নেন। কিছুক্ষণ পর থানা ও উপজেলা পরিষদে হামলা হয়।

এর আগে রোববার রাতে ভাঙ্গা থানার উপপরিদর্শক মো. হাবিবুর রহমান বাদী হয়ে ৯০ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাত আরো ১০০-১৫০ জনকে আসামি করে একটি মামলা দায়ের করেন। এতে আলগী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের প্রধান সমন্বয়ক ম ম সিদ্দিক মিয়াকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। নগরকান্দা এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়।

মামলায় বলা হয়, সিদ্দিক মিয়ার নেতৃত্বে একদল বিক্ষোভকারী ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের সুয়াদী এলাকায় সিসিবিএল পেট্রলপাম্পের সামনে সমবেত হন। তারা রাস্তায় গাছ ফেলে ও টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করেন এবং যান চলাচলে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেন। পুলিশের বাধা অমান্য করে তারা আরো উত্তেজিত অবস্থান নেন। পরে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মৌখিক সতর্কতা দিয়ে ধাওয়া করলে বিক্ষোভকারীরা পালিয়ে যান এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।

এদিকে রোববার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী আন্দোলনকারীদের সতর্ক করে বলেন, ‘দুপুরের মধ্যে অবরোধ তুলে না নিলে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে। সড়ক ও রেলপথে অবরোধ সহ্য করা হবে না।’