উৎপাদন সক্ষমতা রেকর্ড সর্বোচ্চে পৌঁছলেও সঞ্চালন ব্যবস্থায় দুর্বলতায় দেশে এখনো নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। যদিও সঞ্চালন লাইনের দুর্বলতা কাটাতে গত এক দশকে ৫৪টি প্রকল্প গ্রহণ করেছে পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি)। এর মধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে ২৫টি। চলমান রয়েছে ২১টি প্রকল্পের কাজ। আরো আটটি প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করছে সংস্থাটি, যেগুলোর মেয়াদ শেষ হবে ২০২৮ সাল নাগাদ। চলমান ও পরিকল্পনাধীন প্রকল্পগুলো শেষ হলে দেশে বিদ্যুৎ সঞ্চালনের দুর্বলতা কাটবে বলে সম্প্রতি জাতীয় সংসদের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিকে জানিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ।

সঞ্চালন লাইনের দুর্বলতা কাটাতে নেয়া প্রকল্প বাস্তবায়নে বেশকিছু প্রতিবন্ধকতা উল্লেখ করে কমিটির কাছে প্রতিবেদন দিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। এতে বলা হয়, প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণ ও সঞ্চালন লাইন নির্মাণের রাইট অব ওয়ে প্রাপ্তিসহ সামগ্রিক প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতির কারণে সঞ্চালন প্রক্রিয়ায় কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। পিজিসিবি এসব সীমাবদ্ধতা দূর করতে অন্তর্বর্তীকালীন কার্যক্রম এবং স্থায়ীভাবে দূর করতে দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প গ্রহণ করেছে।

প্রতিবেদনে ময়মনসিংহ, রংপুর ও বরিশাল জোনের বিদ্যুৎ সরবরাহে সীমাবদ্ধতার কথাও তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ময়মনসিংহ, ভালুকা ও নেত্রকোনা ১৩২/৩৩ কেভি গ্রিড উপকেন্দ্রের লো-ভোল্টেজজনিত সমস্যা রয়েছে। চলতি বছর গ্রীষ্মকালীন পিক আওয়ারে কখনো কখনো সম্মিলিতভাবে সর্বোচ্চ ৩০-৪০ মেগাওয়াট লোডশেড করতে হয়েছে।

সরবরাহ সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে পিজিসিবির নেয়া বেশকিছু উদ্যোগ তুলে ধরে বিদ্যুৎ বিভাগ জানিয়েছে, জিটুজি প্রকল্পের আওতায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কিশোরগঞ্জ-ময়মনসিংহ ১৩২ কেভি ডাবল সার্কিট লাইনের ক্ষমতা বাড়ানোর কার্যক্রম নেয়া হয়েছে। এ অবকাঠামো নির্মিত হলে ভবিষ্যতে লোডশেডের প্রয়োজন হবে না। এছাড়া লো-ভোল্টেজ সমস্যা নিরসনে পিজিসিবির নিজস্ব অর্থায়নে ময়মনসিংহ, ভালুকা, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ ১৩২/৩৩ কেভি উপকেন্দ্রে ক্যাপাসিটর ব্যাংক স্থাপনের কাজ চলমান রয়েছে। এ কাজ শেষ হবে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে। এছাড়া ১০০ কিলোমিটার দীর্ঘ কালিয়াকৈর-শম্ভুগঞ্জ ৪০০ কেভি লাইন এবং শম্ভুগঞ্জ ৪০০/১৩২/৩৩ কেভি গ্রিড উপকেন্দ্র নির্মাণে মাঠ পর্যায়ের কাজ চলমান রয়েছে। ২০২৩ সালের মধ্যে প্রকল্পটির কাজ শেষ হবে। আর শ্রীপুর ২৩০/৩৩ কেভি উপকেন্দ্র ও শ্রীপুর-ভালুকা ১৩২ কেভি সঞ্চালন লাইন নির্মাণের কাজ শেষ হবে ২০২২ সালের মার্চে।

এদিকে রংপুর জোনের রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, জলঢাকা ১৩২/৩৩ কেভি গ্রিড উপকেন্দ্রগুলোর লো-ভোল্টেজজনিত সমস্যা রয়েছে। এজন্য এসব গ্রিড উপকেন্দ্রে পিক আওয়ারে সম্মিলিতভাবে ৪০-৬০ মেগাওয়াট লোডশেডের প্রয়োজন হয়। কয়লার ঘাটতির কারণে ৫২৫ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন বড়পুকুরিয়ায় ২২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। আবার ২০২১ সালের মধ্যে ঠাকুরগাঁওয়ে ১১৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হওয়ার সময় নির্ধারিত থাকলেও সেটি এখনো চালু হয়নি। এ জোনের সমস্যা কাটাতে পিজিসিবি বেশকিছু উদ্যোগও নিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। লো-ভোল্টেজজনিত সমস্যা সমাধানে পঞ্চগড়ে ১২ দশমিক ৫ মেগা-ভার ও ২২ দশমিক ৫ মেগা-ভার, কুড়িগ্রামে ২২ দশমিক ৫ মেগা-ভার এবং পূর্ব সাদীপুরে ২২ দশমিক ৫ মেগা-ভার ক্ষমতার ক্যাপাসিটর ব্যাংক স্থাপন করা হয়েছে। পূর্ব সাদীপুর ২৩০/১৩২ কেভি গ্রিড উপকেন্দ্র এবং বড়পুকুরিয়া-পূর্ব সাদীপুর ২৩০ কেভি সঞ্চালন লাইনের কাজ শেষ হবে ২০২৩ সাল নাগাদ। এছাড়া পার্বতীপুর ২৩০ কেভি সুইচিং স্টেশন, রংপুর ২৩০/১৩২ কেভি গ্রিড উপকেন্দ্র এবং বড়পুকুরিয়া-রংপুর ২৩০ কেভি ডাবল সার্কিট সঞ্চালন লাইন নির্মাণের কাজ ২০২৩ সালের শুরুতে শেষ হবে। আর বগুড়া-পার্বতীপুর ৪০০ কেভি ডাবল সার্কিট সঞ্চালন লাইনটি ২০২৪ সালের জুনে শেষ হবে। এসব প্রকল্প শেষ হলে রংপুর বিভাগে বিদ্যুৎ সরবরাহে নিরবচ্ছিন্নতা বাড়বে।

বরিশাল জোনে বিদ্যুৎকেন্দ্রের ২৩০/৩৩ কেভি ট্রান্সফরমারের ক্ষমতা চাহিদার তুলনায় অপর্যাপ্ত। এজন্য ভোলায় ১২০/১৪০ এমভিএ ট্রান্সফরমার স্থাপনের কাজ চলতি বছরের মধ্যে শেষ হবে। ভোলা ও চরফ্যাশনে দুটি গ্রিড উপকেন্দ্র নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। ২০২৪ সালে এ কাজ শেষ হবে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব মো. হাবিবুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে আশা করা যায়, ২০২৪ সাল নাগাদ সঞ্চালন লাইনের সমস্যা অনেকটাই কেটে যাবে। ফলে বিতরণ ব্যবস্থার অনেকখানিই উন্নতি হবে। তবে ভালোর তো শেষ নেই। এজন্য বিতরণ লাইন মেরামতসহ আরো ভালো সেবা দিতে নতুন নতুন প্রকল্প নেয়া হচ্ছে।

সঞ্চালন ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে বিদ্যুৎ বিভাগের এ প্রতিবেদনের ওপর আলোচনা হয়েছে সংসদীয় কমিটির বৈঠকে। এতে পিজিসিবির পক্ষ থেকে জানানো হয়, সারা দেশে সব মিলিয়ে ১৯৮টি গ্রিড উপকেন্দ্র রয়েছে, যার কনভারশন ক্ষমতা ৫২ হাজার ৬৭৯ এমভিএ। পিজিসিবি সবচেয়ে বেশি বিদ্যুৎ দিয়ে থাকে ৩৩ কেভি উপকেন্দ্র পর্যন্ত, যার সক্ষমতা ২৭ হাজার ৫১৬ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে পিজিসিবির সঞ্চালন লাইনের পরিমাণ ১২ হাজার ৯৭৬ কিলোমিটার। বিতরণ সংস্থা পর্যন্ত বিদ্যুৎ পৌঁছাতে যেসব প্রতিবন্ধকতা রয়েছে, তা নিরসনে পিজিসিবি বর্তমানে ২১টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। চলমান প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন কার্যক্রম ২০২৩ সালের মধ্যে শেষ হবে। বাস্তবায়ন শেষে বর্তমান সক্ষমতার সঙ্গে আরো নতুন ১১৭টি গ্রিড উপকেন্দ্র সংযুক্ত হবে। আট হাজার সার্কিট কিলোমিটার সঞ্চালন লাইন নির্মিত হবে। এছাড়া ২০২৮ সালকে টার্গেট করে আরো আটটি প্রকল্প গ্রহণের উদ্যোগের কথা জানান পিজিসিবির ব্যবস্থাপনা পরিচালক গোলাম কিবরিয়া।

পল্লী বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মঈন উদ্দিন (অব.) বলেন, বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য পিজিসিবির প্রায় ৫ লাখ ২০ হাজার কিলোমিটার লাইন এবং প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ পুল রয়েছে পল্লী বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের। তাদের বিদ্যুৎ বিতরণে যে সমস্যা হয়, সেটা নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত থাকে না। কিন্তু এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সমস্যা দেখা দেয়। কারণ হিসেবে তিনি সেচ মৌসুম, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, উপকূলীয় এলাকার সমস্যা, গ্রামগঞ্জে ছড়ানো-ছিটানো লাইন, সিস্টেম দুর্বলতা, পুরনো প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন বিষয়কে দায়ী করেন। সমস্যাগুলো সমাধানে একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়নের তথ্য তিনি তুলে ধরেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে বিদ্যুতের জাতীয় গ্রিড ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়নের বিষয়টি পিজিসিবির একক নিয়ন্ত্রণে। বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পগুলোয় বেশকিছু বিদেশী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করলেও সঞ্চালন ব্যবস্থার সার্বিক কর্তৃত্ব পিজিসিবির কাছেই। চলমান কভিড পরিস্থিতিতে এসব প্রকল্পের অধিকাংশই স্থবির হয়ে পড়েছে। কভিডকালে বিদেশী কর্মীদের প্রকল্প এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়া, স্বাস্থ্য সুরক্ষায় পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকাসহ নানা কারণে এ সংকট প্রলম্বিত হয়েছে। তবে নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, শুধু কভিডের কারণে নয়, এসব প্রকল্পে শুরু থেকেই ধীরগতিতে কাজ চলছে। প্রকল্পের সমীক্ষা যাচাই, পরামর্শক নিয়োগ, দরপত্র আহ্বান ও ঠিকাদার নির্বাচনেই চলে গিয়েছে নির্ধারিত সময়ের সিংহভাগ।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারতের ঝাড়খণ্ড থেকে বিদ্যুৎ আমদানির জন্য চাঁপাইনবাবগঞ্জের মনাকসা সীমান্ত থেকে রহমনপুর ৪০০ কেভি সঞ্চালন লাইন নির্মাণের কাজ ২০২২ সালে শেষ হবে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য বিভিন্ন সঞ্চালন লাইন নির্মাণের কাজ শেষ হবে ২০২৩ সালের আগস্টে। কক্সবাজারে নির্মাণাধীন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য নির্মাণ করা সঞ্চালন লাইনটি আগামী বছরের মার্চে শেষ হবে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। পটুয়াখালী থেকে বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার জন্য পটুয়াখালী-পায়রা সঞ্চালন লাইন চালু করার কথা বলা হয়েছে আগামী বছরের ডিসেম্বর নাগাদ। রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য নির্মাণাধীন সঞ্চালনের কাজ শেষ হবে আগামী বছরের ডিসেম্বর নাগাদ।

বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত এক যুগে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বেড়েছে ২০ হাজার মেগাওয়াট। এ সময়ে নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মিত হয়েছে ১২২টি। কিন্তু সক্ষমতা ও চাহিদার বিপরীতে সঞ্চালন লাইন নির্মাণ করা যায়নি। বিদ্যমান সঞ্চালন ব্যবস্থার দুর্বলতার প্রভাব পড়ছে বিদ্যুতের সরবরাহেও। এখনো বিদ্যুৎ খাতে অনুন্নত সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার কারণে সিস্টেম লস হচ্ছে প্রায় ৯ শতাংশ।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক জ্বালানিবিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ম. তামিম বণিক বার্তাকে বলেন, বিদ্যুতের উৎপাদনক্ষমতা বাড়াতে পারলেও সঞ্চালন ব্যবস্থা সেভাবে উন্নত করা যায়নি। এটির বড় প্রতিবন্ধকতা বিদ্যুতের জেনারেশনে যেমন অর্থায়ন পাওয়া যায়, ট্রান্সমিশনে অর্থায়নটা সেভাবে পাওয়া যায় না। এছাড়া ট্রান্সমিশনে বড় জটিলতা হলো জমি অধিগ্রহণ। এটা করতে বহু সময় লেগে যায়, তাছাড়া সঞ্চালন খাতের কোম্পানির সংখ্যাও সীমিত। সঞ্চালন ব্যবস্থা এগিয়ে নিতে হলে এখানে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে, বরাদ্দ বাড়াতে হবে।