বাংলাদেশ ব্যাংকের তালিকাভুক্ত বহিঃনিরীক্ষক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়-ব্যয়ের নিরীক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে আইনের এ বাধ্যবাধকতা উপেক্ষা করে নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান মনোনয়ন দেয়া হচ্ছে। সম্প্রতি বেশ কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান মনোনয়নের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তালিকা বিবেচনায় নেয়নি শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

জানা যায়, প্রত্যেক অর্থবছর নিজেদের আয়-ব্যয়ের হিসাব নিরীক্ষার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে তিনটি নিরীক্ষক প্রতিষ্ঠানের নাম প্রস্তাব করে আবেদন পাঠায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। এর মধ্য থেকে একটি নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানকে মনোনয়ন দেয় মন্ত্রণালয়। আবার কোনো ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রস্তাবের বাইরে থেকেও মনোনয়ন দেয়া হয়। তবে সেক্ষেত্রেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তালিকাভুক্ত নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্য থেকেই বেছে নিতে হয় মন্ত্রণালয়কে।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন অনুযায়ী, নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান মনোনয়নের ক্ষেত্রে কোনোভাবেই বাংলাদেশ ব্যাংকের তালিকার বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। যদিও সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তৈরি যোগ্য নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের তালিকার বাইরে থেকে কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান মনোনয়ন দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। গত ১৭ জানুয়ারি স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির ২০১৫-১৬ থেকে ২০১৯-২০—এ পাঁচ অর্থবছরের হিসাব নিরীক্ষায় হুদা হোসাইন অ্যান্ড কোং চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস নামের প্রতিষ্ঠানকে অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এর আগে গত ৭ জানুয়ারি কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটির ২০১৯-২০ অর্থবছরের হিসাব নিরীক্ষার জন্য মাহফেল হক অ্যান্ড কোং নামের প্রতিষ্ঠানকে মনোনয়ন দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংকের গত ডিসেম্বরে হালনাগাদকৃত তালিকায় এ দুটি প্রতিষ্ঠানের নামই নেই।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০১০-এর ধারা ৪৫ (২)-এ বলা হয়েছে, প্রত্যেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতি আর্থিক বছরের আয় ও ব্যয়ের হিসাব কমিশন কর্তৃক নির্ধারিত ফরমে প্রস্তুত ও সংরক্ষণ করবে। উল্লিখিত হিসাব প্রতি আর্থিক বছরের বাংলাদেশ ব্যাংকের তালিকাভুক্ত বহিঃনিরীক্ষক প্রতিষ্ঠানগুলোর (সিএ ফার্ম) মধ্য থেকে সরকার মনোনীত একটি ফার্ম দ্বারা নিরীক্ষা করাতে হবে ও নিরীক্ষা প্রতিবেদন পরবর্তী আর্থিক বছরের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও কমিশনে পাঠানো হবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তালিকা আমলে না নেয়াকে আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন বলছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) সদস্য অধ্যাপক ড. আবু তাহের এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, আইন অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংকের তালিকার বাইরে অডিট ফার্ম মনোনয়ন দেয়ার কোনো সুযোগ নেই। তালিকার মধ্য থেকেও যাদের অডিটের দায়িত্ব দেয়া হয়, সে বিষয়েও আমদের কিছু পর্যবেক্ষণ রয়েছে। প্রতি অর্থবছরই পছন্দের প্রতিষ্ঠান দিয়ে অডিট করাতে আগ্রহী বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। এমনকি টানা ১০ অর্থবছর একই প্রতিষ্ঠান দিয়ে নিরীক্ষা করানোরও উদাহরণ রয়েছে। এতে করে বিশ্ববিদ্যালয় ও নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এক ধরনের সমঝোতার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তবে পরপর দুই অর্থবছর একই প্রতিষ্ঠানকে মনোনয়ন না দেয়াই সমীচীন। আর লাভজনক ও অলাভজনক প্রতিষ্ঠানের নিরীক্ষা কিন্তু এক নয়। তাই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অডিটের অভিজ্ঞতা রয়েছে, এমন প্রতিষ্ঠানগুলোকে মনোনয়ন দেয়া উচিত। এ বিষয়ে সহায়তা বা মতামত চাইলে তা দিতে প্রস্তুত ইউজিসি।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০১৭ সালের হালনাগাদ করা তালিকায় ৭৫টি নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল। তবে গত বছরের ডিসেম্বরে প্রকাশিত তালিকায় এর মধ্য থেকে ৩৬টি প্রতিষ্ঠান বাদ পড়েছে। সম্প্রতি মনোনয়নের ক্ষেত্রে হালনাগাদ তালিকা অনুসরণ না করার কারণে এ সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (বিশ্ববিদ্যালয়) একেএম আফতাব হোসেন প্রামাণিক বণিক বার্তাকে বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ হালনাগাদকৃত তালিকা থেকেই নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান মনোনয়ন দেয়ার কথা। তালিকার বাইরে থাকা প্রতিষ্ঠানকে মনোনয়ন দেয়ার কোনো সুযোগ নেই। তার পরও এটি কীভাবে ঘটেছে, সেটি খতিয়ে দেখা হবে।

আয়-ব্যয়ের হিসাব নিরীক্ষাই করে না অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়: এদিকে আইনে বাধ্যবাধকতা থাকলেও অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় তাদের আয়-ব্যয়ের নিরীক্ষাই করছে না। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০১০ অনুযায়ী প্রতি আর্থিক বছরের সেপ্টেম্বরের মধ্যে পূর্ববর্তী বছরের আর্থিক হিসাব ইউজিসিতে জমা দিতে হবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে। এরপর ডিসেম্বরের মধ্যে ওই হিসাবের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন ইউজিসিতে পাঠাতে হবে। কিন্তু আইনের এ নির্দেশনা মানছে না বেশির ভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। ইউজিসির সর্বশেষ প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে মাত্র ১৭টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ই আইনে বর্ণিত নির্দেশনা মেনে আয়-ব্যয়ের নিরীক্ষিত হিসাব জমা দিয়েছে। যদিও ওই বছর ৯০টির মতো বিশ্ববিদ্যালয় কার্যক্রম পরিচালনা করে।

সার্বিক বিষয়ে ইউজিসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. কাজী শহীদুল্লাহ বলেন, গত কয়েক অর্থবছরের চিত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে আয়-ব্যয়ের নিরীক্ষা করার আগ্রহই নেই। যদিও প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা আনতে হিসাবের নিরীক্ষা খুবই জরুরি। আর্থিক অনিয়ম ঢাকতে অনেক প্রতিষ্ঠান নিরীক্ষা করাতে চায় না। আবার যেসব বিশ্ববিদ্যালয় নিরীক্ষা করাচ্ছে, তাদের নিরীক্ষক প্রতিষ্ঠান নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। অনেক সময় দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠানের চাহিদার ভিত্তিতে একটি নিরীক্ষা প্রতিবেদন তৈরি করা হয়, সেটি আমাদের কাছে পাঠানো হয়।