দেশে ভ্রমণপিপাসুদের পছন্দের শীর্ষ পর্যটনকেন্দ্র কক্সবাজার। প্রতি বছর দেশ-বিদেশের প্রচুর পর্যটক আসেন এখানে। বিশ্বের দীর্ঘতম এ সমুদ্রসৈকতের পর্যটন সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে ভালো ব্যবসা করছে বেসরকারি খাতের অনেক প্রতিষ্ঠান। গড়ে উঠেছে আধুনিকমানের হোটেল-মোটেল। অপ্রতুল জায়গা নিয়েও পর্যটকদের সেবায় ভালো সুনাম ধরে রেখেছে তাদের অনেকেই। লাভজনক অবস্থায় রয়েছে অনেকগুলোও। তবে এর বিপরীত চিত্র সরকারি হোটেল-মোটেলের। অপর্যাপ্ত আসনসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার অভাবে ব্যবসায়িক সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারছে না বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন। প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি জায়গা থাকলেও পর্যটক আকর্ষণে ব্যর্থ করপোরেশনের এসব অবকাঠামো।

সরকারি হোটেল-মোটেলের এমন দৈন্যদশার চিত্র উঠে এসেছে সরকারি প্রতিষ্ঠান-সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির বৈঠকেও। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত বৈঠকে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের অধীনে পরিচালিত হোটেল-মোটেলগুলোর সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে করপোরেশনের পক্ষ থেকে একটি প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়। সেখানে সারা দেশের বিভিন্ন স্থানে অবস্থিত হোটেল-মোটেলের সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়।

বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের প্রায় ১১ একর জমিতে মাত্র ৫৮ আসন নিয়ে হোটেল শৈবাল ও মোটেল প্রবাল পরিচালিত হচ্ছে। যদিও আধুনিক ভবন নির্মাণসহ সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর জন্য পর্যাপ্ত জায়গা রয়েছে। তবে সে সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারছে না করপোরেশন।

কক্সবাজারে পর্যটন হলিডে কমপ্লেক্সের ৮ দশমিক ২৭ একর জায়গার ওপর তিনতলাবিশিষ্ট পর্যটন মোটেল প্রবাল নির্মিত হয় ১৯৬২-৬৩ সালে। পরে ১৯৭২ সালে এটি বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করা হয়। তখন থেকেই এ মোটেলের বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু। মোটেলটিতে ৩৮টি কক্ষ রয়েছে। ২ দশমিক ৮২ একর জায়গার ওপর তিনতলাবিশিষ্ট হোটেল শৈবাল নির্মিত হয় ১৯৮৩ সালে। হোটেলটিতে ২৪টি কক্ষ রয়েছে। হলিডে কমপ্লেক্সেই ৫ দশমিক ১০ একর জায়গার ওপর নির্মিত হয় আরেকটি তিনতলাবিশিষ্ট ভবন। পর্যটন মোটেল উপলের এ ভবনটি নির্মিত হয় ১৯৬২-৬৩ সালে। ১৯৭২ সাল থেকে এটি বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এ মোটেলটিতে ৩৮টি কক্ষ রয়েছে। কক্সবাজারে অবস্থিত আরেকটি মোটেল লাবণী ২ দশমিক ৪৮ একর জায়গার ওপর অবস্থিত। ১৯৯৮ সালে নির্মিত এ মোটেলটিতে ৬০টি কক্ষ রয়েছে। কক্সবাজার-টেকনাফ সড়কের ডানপাশে দুই একর জায়গায় গড়ে উঠেছে হোটেল নেটং। কক্সবাজার থেকে ৮৩ কিলোমিটার দূরে টেকনাফ উপজেলার নিকটবর্তী নির্জন পরিবেশে নির্মিত হোটেলটির বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু হয় ২০০০ সালে।

এছাড়া করপোরেশনের অধীনে চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশন-সংলগ্ন একটি মোটেল রয়েছে। ১ দশমিক ৩৬৭ একর জায়গার ওপর অবস্থিত মোটেলটি ১৯৭৮ সালে বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করে। বান্দরবানে সাত একর জায়গার ওপর নির্মিত তিনতলাবিশিষ্ট পর্যটন মোটেলটির বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু হয় ২০০৩ সালে। রাঙ্গামাটিতে অবস্থিত পর্যটন হলিডে কমপ্লেক্সটি ২৮ দশমিক ৩২ একর জমিতে অবস্থিত। ১৯৭৮ সালে বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু হওয়া হোটেলটিতে ১৯টি কক্ষ রয়েছে। খাগড়াছড়ির পর্যটন মোটেলটি ৬ দশমিক ৫০ একর জায়গার ওপর নির্মিত। মোটেলটি ২০০৩ সালে বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করে।

এর বাইরে সিলেট ২৭ একর জমির ওপর অবস্থিত পর্যটন মোটেলটিতে ২৮টি কক্ষ রয়েছে। সিলেটের জাফলংয়ে অবস্থিত আরেকটি মোটেল ৪ দশমিক ৫০ একর জমি নিয়ে অবস্থিত। রংপুরে দুই একর জায়গার ওপর নির্মিত মোটেলটিতে ৩৪টি কক্ষ রয়েছে। এছাড়া পর্যটন করপোরেশনের অধীনে মোটেল রয়েছে বগুড়া, রাজশাহী, যশোরের বেনাপোল, খুলনার মোংলা, কুয়াকাটা ও মেহেরপুরের মুজিবনগরে। এসব মোটেলের বেশির ভাগই পর্যাপ্ত জায়গা নিয়ে গড়ে উঠেছে। কিন্তু সেই তুলনায় আধুনিক সুযোগ-সুবিধা অনেক কম। যে কারণে পর্যটকরা এসব মোটেল ব্যবহারে আগ্রহী হয়ে উঠছেন না বলে মনে করছেন সংসদীয় কমিটির সদস্যরা।

পটুয়াখালী-২ আসনের সংসদ সদস্য ও কমিটির সভাপতি আ স ম ফিরোজ এ বিষয়ে বলেন, কক্সবাজারে প্রচুর পরিমাণ পর্যটক আগমন করলেও সেখানে আবাসন সুবিধা সীমিত। যে কারণে ব্যক্তিগত পর্যায়ে অনেক কম জমি নিয়ে বেশিসংখ্যক আসন সুবিধার আধুনিকমানের হোটেল নির্মাণ করে বেসরকারি খাত। যারা লাভজনকভাবে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছে। অথচ বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের অধীন প্রায় ১১ একর জমিতে মাত্র ৫৮ আসন নিয়ে হোটেল শৈবাল ও মোটেল প্রবাল পরিচালিত হচ্ছে। এ বিপুল জমি অব্যহূত থাকার পরও কেন সেখানে আধুনিকমানের ভবন নির্মাণ করে আসন সংখ্যা বৃদ্ধির ব্যবস্থা করা হচ্ছে না? কক্সবাজারে বেসরকারি খাতে অনেক হোটেল-মোটেল নির্মিত হলেও অদৃশ্য কারণে পর্যটন করপোরেশনের হোটেল-মোটেলগুলো সেই পুরনো অবস্থাতেই আছে।

বৈঠকে সুনামগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য মুহিবুর রহমান মানিক বলেন, বাংলাদেশে ষাটের দশকের অবকাঠামো নিয়ে পর্যটন শিল্প পরিচালিত হয়ে আসছে। আধুনিক যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এ খাতের তেমন কোনো উন্নয়ন করা হয়নি বিধায় বাংলাদেশ পর্যটন খাত লাভের মুখ দেখছে না।

তবে পর্যটন করপোরেশনের অধীনস্থ এসব হোটেল-মোটেলকে আধুনিকায়ন করা হচ্ছে বলে সংসদীয় কমিটির বৈঠকে জানান বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোজাম্মেল হোসেন। কক্সবাজারের হোটেল শৈবাল, উপল ও প্রবাল একত্রিত করে একটি বড় আকারের প্রকল্প নেয়ার পরিকল্পনা হচ্ছে বলে জানান তিনি।