বিশ্বের দূষিত বায়ুর শহরের তালিকায় বেশ কয়েক বছর ধরেই অবস্থান করছে ঢাকা। এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্সে বলা হয়েছে, ঢাকার বাতাস খুবই অস্বাস্থ্যকর। গতকালও ঢাকার বাতাসের মান ছিল ২৯৫ একিউআই। যেখানে স্বাভাবিক দূষণের মাত্রা ধরা হয় ৫০ একিউআই। সম্প্রতি শিকাগো ইউনিভার্সিটির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কেবল বায়ুদূষণের কারণেই গড় বয়স থেকে সাত বছর সাত মাস আয়ু কমছে ঢাকাবাসীর। আবার শুধু যে ঢাকার বায়ুই দূষিত, তা নয়। প্রতিবেদনটি বলছে, বাংলাদেশের বেশির ভাগ স্থানের বায়ুর মান সন্তোষজনক নয়। দূষিত বায়ুর কারণে দেশের অন্যান্য এলাকার মানুষের আয়ু কমছে পাঁচ বছর সাত মাস করে।

এমন যখন দেশের বাতাসের অবস্থা, তখন প্রথমবারের মতো বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা প্রণয়ন করতে যাচ্ছে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়। দূষণ রোধে শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও প্রকল্পের অধীনে সার্বক্ষণিক বায়ুমান পরিবীক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনসহ বিধি ভঙ্গ করলে কী শাস্তি হবে সেটির বিস্তারিতও উল্লেখ রয়েছে এ বিধিতে। তবে পরিবেশবাদী সংগঠন-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিধিমালা করলেই হবে না। সেটির যথাযথ প্রয়োগ যেন হয়, সেদিকেও জোর দিতে হবে।

মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, ১৫ ডিসেম্বর ঢাকাসহ সারা দেশের বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে করণীয় সম্পর্কে এক আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে পরিবেশ অধিদপ্তর জানায়, মূলত ইটের ভাটা, অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণকাজ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, যানবাহন ও বিবিধ বেশকিছু বিষয় বায়ুদূষণের প্রধান কারণ। বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে খসড়া বিধিমালায় বলা হয়েছে, এসব কারণে বায়ুদূষণ রোধে পরিবেশ অধিদপ্তর দেশব্যাপী উপযুক্ত স্থানে পর্যাপ্তসংখ্যক সার্বক্ষণিক বায়ুমান পরিবীক্ষণ কেন্দ্রসহ আন্তঃদেশীয় বায়ুমান পরিবীক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করবে। পাশাপাশি বায়ুমানের দীর্ঘমেয়াদি অবস্থা মূল্যায়নের জন্য প্রতিটি কেন্দ্রের তথ্য সংরক্ষণ করে রাখা হবে।

এছাড়া পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক চাইলে সম্ভাব্য বায়ুদূষণকারী শিল্পপ্রতিষ্ঠান বা প্রকল্পগুলোকে সার্বক্ষণিক বায়ুমান পরিবীক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনের নির্দেশ দিতে পারেন। এ নির্দেশের আলোকে শিল্পপ্রতিষ্ঠান বা প্রকল্পগুলো নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় সার্বক্ষণিক বায়ুমান পরিবীক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করে পরিবেশ অধিদপ্তরের কেন্দ্রীয় বা উপকেন্দ্রীয় মনিটরিং ব্যবস্থার সঙ্গে সংযুক্ত করবে।

বায়ুদূষণকারীদের তালিকা প্রকাশের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেয়া হবে উল্লেখ করে খসড়া বিধিমালায় বলা হয়েছে, সরকারের অনুমোদনক্রমে মহাপরিচালক পরিপত্র জারির মাধ্যমে অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে বায়ুদূষণকারীর তালিকা, পদ্ধতি, প্রক্রিয়া ও বায়ুদূষণ রোধে সুনির্দিষ্ট নির্দেশিকা তৈরি করে দিতে পারবেন। এছাড়াও পরিবেশ অধিদপ্তর সরকারের অনুমোদন সাপেক্ষে জাতীয় বায়ুমান ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা প্রণয়নের ক্ষমতা রাখে বলেও বিধিমালায় উল্লেখ করা হয়েছে। আর এসব করা হবে বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫-এর ধারা ২০-এর উপধারা (২)-এর (ক)-এর উদ্দেশ্য পূরণের লক্ষ্যে।

কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় নির্দিষ্ট সময় ধরে বায়ুর মানমাত্রা অতিক্রম করলে সেক্ষেত্রে পরিবেশ অধিদপ্তর প্রয়োজন মনে করলে ওই এলাকার বায়ুমান উন্নয়নে ব্যবস্থা নিতে পারবে। এক্ষেত্রে খসড়া বিধিমালায় আরো বলা হয়েছে, পরিবেশ অধিদপ্তর বায়ুদূষণকারী কর্মকাণ্ডের তালিকা প্রণয়ন করবে। শুধু তা-ই নয়, যতক্ষণ পর্যন্ত ওই বায়ুর মানমাত্রা স্বাভাবিক না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত অধিদপ্তর ওইসব কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণের জন্য যথাযথ ব্যবস্থা নিতে পারবে। পাশাপাশি কোনো দ্রব্য বা বস্তু প্রধান বায়ুদূষক হিসেবে চিহ্নিত হলে অধিদপ্তর প্রজ্ঞাপন জারি করে সংশ্লিষ্টদের দূষণ প্রতিরোধ পরিকল্পনা অনুমোদনের জন্য নির্দেশ দিতে পারবে।

খসড়া এ বিধিমালায় যানবাহনসৃষ্ট বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ, নির্মাণ, সংস্কার ও মেরামত কার্যক্রম, বর্জ্য থেকে সৃষ্ট বায়ুদূষণ ইত্যাদির বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, যানবাহন মেরামত ও নির্মাণকাজ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি, সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরকারের জারি করা প্রজ্ঞাপন অথবা বিধিমালায় নির্ধারিত মানমাত্রা, নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ও জাতীয় বায়ুমান ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা সুপারিশগুলো মেনে চলতে হবে। বিধিমালায় উল্লিখিত কোনো নির্দেশনা বাস্তবায়নে ব্যর্থ কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে নির্দেশ অমান্য করলে সংশ্লিষ্টদের বাংলাদেশ দণ্ডবিধি অনুসারে সাজা দেয়া যাবে। দণ্ডবিধি অনুযায়ী এ অপরাধের সাজা হয়, প্রথমবার অনধিক দুই বছর কারাদণ্ড অথবা অনধিক ২ লাখ টাকা অর্থদণ্ড।

বায়ুদূষণ রোধে আলাদা বিধিমালাকে স্বাগত জানালেও আইনের সঠিক প্রয়োগের বিষয়ে জোর দিতে বলেছেন মানবাধিকার ও পরিবেশবাদী সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের সভাপতি সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, আমাদের দেশে আইন আছে কিন্তু তার বাস্তবায়ন হচ্ছে খুবই কম। তাই আমি আইন বাস্তবায়নের প্রতি জোর দেয়ার কথা বলব। পাশাপাশি পরিবেশ অধিদপ্তরের সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়ে সরকারের নজর দেয়া উচিত বলেও মনে করেন তিনি।

এ প্রসঙ্গে পরিবেশ অধিপ্তরের পরিচালক (আইন) খোন্দকার মো. ফজলুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, দেশে প্রথমবারের মতো আমরা বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা প্রণয়ন করতে যাচ্ছি। এর খসড়াও চূড়ান্ত করে ফেলেছি। আশা করছি, বিধিমালাটি পাস হলে বায়ুদূষণ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে।