রংপুর বিভাগ কৃষিপ্রধান অঞ্চল। বিভাগের আট জেলায় আমন ধান ও চাল সংগ্রহের অভিযান শুরু হয় গত ১৭ নভেম্বর। শেষ হয়েছে চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি। আঞ্চলিক খাদ্য বিভাগের তথ্য বলছে, বিভাগে আমন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭৫ হাজার ৯৪০ টন। তবে সংগ্রহ হয়েছে ৬ হাজার ৩২৩ দশমিক ৩৬০ টন, যা লক্ষ্যমাত্রার ৮ শতাংশ। অবশ্য চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়েছে ৯৬ শতাংশ।
কৃষিবিদরা বলছেন, এ অঞ্চলে উৎপাদিত পণ্য বিশেষ করে আলু, ধান ও ভুট্টা স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে উদ্বৃত্ত থাকে। অথচ প্রতি বছর চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা মোটামুটি সন্তোষজনক। সেখানে ধান সংগ্রহে করতে বার বারই ব্যর্থ হচ্ছে খাদ্য বিভাগ।
কারণ হিসেবে চাষীরা বলছেন, ধান-চাল সংগ্রহে বিদ্যমান পদ্ধতিতে কিছু অসংগতির কারণে কৃষক ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। গুদামে ধান বিক্রি করতে গেলে বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। তবে ব্যবসায়ীদের কাছে ধান বিক্রিতে তেমন কোনো অসুবিধা হয় না। কোনো কোনো সময় তারা বাড়ি এসে নিয়ে যান। এতে কৃষকের পরিবহন খরচ বেঁচে যায়। সরকারি গুদামে ধান দিতে গেলে অনেক সময় ফিরিয়ে দেয়া হয়। তাতে দুই দফা পরিবহন ব্যয় হয়।
কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার উমরমজিদ ইউনিয়নের বালাকান্দি গ্রামের কৃষক আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘আমি দেড় একর জমিতে আমন ধান আবাদ করেছিলাম। তবে সরকারি খাদ্য গুদামে ধান দিতে পারি না। সেখানে ধান নিয়ে গেলেও জটিলতা রয়েছে। এ কারণে ধান নিয়ে গিয়েও ফেরত আসতে হয়েছিল। পরে বাড়িতে গ্রামের পাইকারের কাছে বিক্রি করেছি।’
দীর্ঘদিন ধরে ধান আবাদ করছেন নীলফামারী সদর উপজেলার চরাইখোলা ইউনিয়নের আব্দুর রহিম বসুনিয়া। আমন মৌসুমে ৩০ বিঘা জমিতে ব্রি-৯৩ জাতের ধান আবাদ করেছেন। প্রতি বিঘায় ধান পেয়েছেন গড়ে ১৮ মণ। বিঘাপ্রতি জমিতে খরচ হয়েছে ১৫ হাজার টাকা করে। প্রতি মণ ধান বিক্রি করেছেন ১ হাজার ৪৪০ টাকা। সে হিসাবে প্রতি কেজি ধানের দাম পড়ে ৩৬ টাকা। অথচ সরকার প্রতি কেজি ধানের দাম বেঁধে দিয়েছে ৩৩ টাকা। গুদামে ধান নিয়ে গেলে বলা হয় আর্দ্রতা ঠিক নেই। আবার গুদামের শ্রমিকরা টাকা ছাড়া বস্তায় হাত দেন না। এছাড়া কৃষকদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট না থাকলে গুদাম থেকে খাদ্য অফিসে যেতে হয়। পরে কাগজপত্র ঠিক করে ব্যাংকে যেতে হয়। যদি কোনো কারণে আর্দ্রতা শতকরা ১৪ ভাগের একটু বেশি থাকে, তাহলে ওই ধান নিজের খরচে বাড়ি নিয়ে যেতে হয়।’
এ ব্যাপারে রংপুরের আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. জহিরুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চেষ্টা করেও ধান সংগ্রহ হচ্ছে না। এতে চালের স্টকে ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। ঘাটতি পূরণে বিদেশ থেকে চাল আমদানি করতে হচ্ছে। সরকার ধানের দাম বেঁধে দেয়ায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কৃষকই লাভবান হচ্ছেন। কারণ ক্রেতারা বাধ্য হন সরকারের বেঁধে দেয়া দামের চেয়ে বেশি দামে ধান ক্রয় করতে। এতে কৃষকদের উৎপাদিত ধানের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত হচ্ছে।’
কৃষকদের ভোগান্তির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘কৃষক ধানের ১৪ ভাগ আর্দ্রতা সম্পর্কে সহজে অবগত হতে পারছেন না। আবার অনেক সময় কৃষক গুদামে ধান নিয়ে গেলে কোথাও কোথাও হয়রানির শিকার হচ্ছেন।’
বিদ্যমান পদ্ধতিতে কৃষক ধান দিতে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘ধান সংগ্রহের আগে কৃষকদের সঙ্গে আলোচনা করা ও মিটারের মাধ্যমে নির্দিষ্ট আর্দ্রতা সম্পর্কে তাদের অবগত করা, প্রয়োজনে কৃষি বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করবেন আগামীতে। এছাড়া প্রয়োজনে প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। যাতে কৃষকদের সব প্রতিবন্ধকতা দূর হয়।’
মিল মালিকরা বলছেন, সারা দেশে যে ধান-চাল সংগ্রহ হয়েছে, তার অধিকাংশ এসেছে রংপুর ও রাজশাহী বিভাগ থেকে। তাই খাদ্য অফিসকে অবশ্যই মজুদ বাড়ানোর জন্য আগেই পরিকল্পনা করে অগ্রসর হতে হবে।
রংপুর মহানগর মিল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় মিল মালিক সমিতির যুগ্ম সম্পাদক মো. সামসুল আলম বাবু বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রংপুর বিভাগ যেহেতু কৃষিপ্রধান এলাকা, তাই এখানে ধান ও চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা বাড়াতে হবে। অধিকাংশ কৃষক অনলাইনের বিষয়টি ভালোভাবে জানেন না। কৃষকদের কাছ থেকে ধান নিতে হলে অবশ্যই তাদের ভালোমন্দ লক্ষ্য রাখতে হবে এবং আগে আলোচনা করা যেতে পারে। কৃষক যাতে হয়রানির শিকার না হন, সেজন্য খাদ্য অফিস থেকে মিটারের মাধ্যমে আগে ধানের আর্দ্রতা পরিমাপ করতে হবে। তাহলে অযথা ধান নিয়ে খাদ্য গুদামে যাওয়া আসার ভোগান্তি ও আর্থিক ক্ষতি থেকে কৃষক রক্ষা পাবেন।’
তিনি বলেন, ‘অনেক সময় দেখা যায়, কোনো জায়গায় ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা উল্লেখ করা আছে। কিন্তু কৃষকের সংখ্যা যদি বেশি হয়, তখন তারা তা নিতে পারেন না। সেক্ষেত্রে লটারি করা হয়। এ অবস্থান থেকে সরকারকে সরে আসতে হবে। সামনে বোরো মৌসুম আসছে। এখন থেকে এ বিষয়গুলো গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করলে কৃষক যেমন আর্থিকভাবে লাভবান হবে, তেমনি সরকারের সাশ্রয় হবে বৈদেশিক মুদ্রা।’










