রাজশাহী পাটকল বন্ধের প্রায় দুই বছরেও পাওনা বুঝে পায়নি অবসরে যাওয়া প্রয়াত ৯৯ শ্রমিকদের পরিবার। একই দশা বদলি ও নামে ভুল থাকা শ্রমিকদের। শ্রমিক ও তাদের স্বজনের অভিযোগ, পাওনা চাইতে ভেতরে ঢুকতেই দিচ্ছে না পাটকল কর্তৃপক্ষ। মোবাইল ফোনে আগে বারবার আশ্বাস দিলেও এখন ফোনই তুলছেন না প্রকল্প পরিচালক।

সরেজমিনে শ্রমিকদের এমন অভিযোগের সত্যতাও মিলেছে। মিল বন্ধ থাকায় কাউকে প্রবেশ করতে দিচ্ছেন না নিরাপত্তারক্ষীরা। গণমাধ্যমকর্মী পরিচয়ে ভেতরে ঢুকলেও সাক্ষাতে রাজি হননি রাজশাহী পাটকলের উপমহাব্যবস্থাপক ও প্রকল্পপ্রধান শরিফুল কবির।

জানা গেছে, ১৯৬৯ সালে রাজশাহী নগরীর উপকণ্ঠ শ্যামপুরে ৪৯ দশমিক ২ একর জমিতে গড়ে ওঠে রাজশাহী পাটকল। স্বাধীনতার পর জাতীয়করণ হয়। বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশনের (বিজেএমসি) আওতায় পরিচালিত হচ্ছিল এ পাটকল। ২৬০ লুমের এ কলের উৎপাদনক্ষমতা ছিল ২১ দশমিক ৭৮ টন। এখানে মূলত চিকন ও মোটা বস্তা তৈরি হতো।

২০২০ সালের ২ জুলাই রাত ১০টার দিকে এ পাটকল বন্ধ হয়ে যায়। বেকার হয়ে পড়েন কর্মরত হাজারো শ্রমিক। গোল্ডেন হ্যান্ডশেকে নিয়মিত কর্মীদের অধিকাংশই তাদের পাওনা পান। কিন্তু বাকিদের ভাগ্য ঝুলে যায়।

ভাগ্যবিড়ম্বিত শ্রমিকদের একজন আবু সিদ্দিক। ২০১৭ সালের মে মাসে তিনি অবসরে যান। বারবার ধরনা দিয়েও পাননি নিজের গ্র্যাচুইটি-প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা। অসুস্থ হয়েও অর্থাভাবে নিজের চিকিৎসা করাতে পারেননি। রোগে ভোগে শেষে ২০২০ সালের জুলাইয়ে মারা যান তিনি। শ্রমে-ঘামে আয় করা টাকা পাওয়া তো দূরের কথা, মৃত্যুর আগে পাটকলে নিজের পাওনা টাকার পরিমাণটাও জেনে যেতে পারেননি এ হতভাগ্য।

প্রয়াত আবু সিদ্দিকের নমিনী স্ত্রী নার্গিস বেগমও জটিল রোগে শয্যাশয়ী। টাকা না পাওয়ায় আক্ষেপ রয়েছে তারও। তার শঙ্কা-হয়তো জীবদ্দশায় স্বামীর পাওনা টাকা তিনি পাবেন না। তার প্রশ্ন টাকার অভাবে তাকেও বিনা চিকিৎসায় মরতে হবে?

পাটকলসংলগ্ন রাজশাহীর কাঠাখালী পৌর এলাকার সমসাদিপুরে প্রয়াত আবু সিদ্দিকের বাড়ি। দুই সপ্তাহ রাজশাহী ডায়াবেটিক অ্যাসোসিয়েশন হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরেছেন নার্গিস বেগম। হাসপাতাল থেকে ফিরেছেন ঠিকই কিন্তু বাড়িতে পড়ে রয়েছেন ওষুধ-পথ্যবিহীন।

বিছানায় শুয়ে নার্গিস বেগম বলেন, বিনা চিকিৎসায় তিনি বিছানায় পড়ে গেছেন। দুই ছেলে দিনমজুর। কোনো রকমে দুই  বেলা ভাতের জোগাড় করছে ছেলেরা। অসুস্থ হয়ে ১২ দিন হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। এনজিও থেকে ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে খরচ করেছে ছেলেরা। এখন তাদের আর চিকিৎসা চালানোর সামর্থ্য নেই।

কাটাখালীর সমসাদিপুর এলাকার বাসিন্দা নাজমা বেগম। তার জীবনের আখ্যান মিলে যায় নার্গিস বেগমের সঙ্গে। নাজমা বেগমের স্বামী প্রয়াত শের মোহাম্মদ রাজশাহী পাটকলের শ্রমিক ছিলেন। শের মোহাম্মদ অবসরে যান ২০১৫ সালের ১৫ জানুয়ারি। তিনি মারা গেছেন ২০২০ সালের ২৯ মে। অর্থাভাবে তিনিও একরকম বিনা চিকিৎসায় মারা যান। চিকিৎসার অভাবে তার স্ত্রী নাজমা বেগম দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন এক চোখে।

নাজমা বেগমও শোনান নিজের সীমাহীন দুর্ভোগের কথা। তিনিও অপেক্ষায় আছেন স্বামীর পাওনা টাকার। তিনি বলেন, মিলের ভেতরে তারা ঢুকতেই পারেন না। ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ নেই। কত টাকা পাবেন সেটিও জানতে পারেননি। একমাত্র ছেলে খুব কষ্ট করে সংসারের হাল ধরেছে। করোনার ভেতরে ছেলের চাকরি ছিল না। খেয়ে-না খেয়ে দিন গেছে। কেউ খোঁজও নেয়নি।

প্রয়াত শের মোহাম্মদের মেয়ে শিল্পী আক্তার জানান, অবসরে গিয়ে তার বাবা অসুস্থ হয়ে পড়েন। অর্থাভাবে ভালোমতো চিকিৎসাও করানো যায়নি। এক রকম বিনা চিকিৎসায় তিনি মারা যান। অবসরকালীন টাকা পেলে তার চিকিৎসা করানো যেত। এখন মা অসুস্থ। মায়েরও চিকিৎসা করাতে পারছেন না। কিন্তু দেখার কেউ নেই।

রাজশাহী পাটকলের সাহায্যকারী ছিলেন সাইফুল ইসলাম। ২০২০ সালের ১ নভেম্বর রাতে টাকা না পেয়ে মিল থেকে বাড়ি ফেরেন। অসুস্থ হয়ে ওই রাতেই সাইফুল ইসলাম মারা যান। স্বামীর মৃত্যুর পর পাটকল থেকে কিছুই পাননি স্ত্রী আমিনা খাতুন।

প্রয়াত সাইফুলের বাবা আব্দুল মজিদ পাটকলের  মেকানিক্যাল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত শ্রমিক ছিলেন। তিনি জানান, নিজের অবসরের পর ছেলে পাটকলে যোগ দেয়। প্রায় আট বছর চাকরি হয়েছিল। সাহায্যকারী পদে কর্মরত অবস্থায় ছেলে মারা যায়। পাটকলে তার পাওনা ৬ লাখ ৬৮ হাজার টাকা। কবে সেই টাকা পাওয়া যাবে তা কেউ জানে না।

কেবল নার্গিস, নাজমা কিংবা আমিনা নন, এমন ৯৯ জন মৃত পাটকল শ্রমিকের পরিবারে নেমে এসেছে চরম দুর্যোগ। এর বাইরেও বদলিসহ নাম জটিলতায় আরো প্রায় ৫০০ শ্রমিকের জীবনের চাকা থমকে গেছে। অনেকেই দুর্বিষহ জীবন কাটাচ্ছেন।

বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন রাজশাহী পাটকল শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি জিল্লুর রহমান। তিনি বলেন, এ পাটকলে ১ হাজার ২০৭ শ্রমিক কাজ করতেন।  এর মধ্যে ৫০০ জন অবসরপ্রাপ্ত এবং মারা গেছেন। পাটকল বন্ধের সময় কর্মরত ছিলেন ৭১১ শ্রমিক। বদলি শ্রমিক ছিলেন আরো ১ হাজার ৫০ জন। স্থায়ী শ্রমিকদের প্রায় সবাই নিজেদের পাওয়া বুঝে পেয়েছেন।

কিন্তু মৃত ৯৯ শ্রমিকের পরিবারকে পাওয়া বুঝিয়ে দেয়নি কর্তৃপক্ষ। নামের ভুল থাকা ১১ জন এবং বদলি ৩৩৩ জন শ্রমিকও তাদের পাওনা টাকা পাননি। এই শ্রমিক নেতা বলেন, বিভিন্ন সময় তারা পাটকল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে বসেছেন। তারা বরাবরই জানিয়েছে, অল্প দিনের ভেতরে পাওনা পরিশোধ করা হবে। মিল বন্ধের আগে সরকার কথা দিয়েছিল তিন মাসের মধ্যে পাওনা পরিশোধের। এছাড়া পিপিপির আওতায় আবারো মিল চালু করে তাদের কাজে ফেরানো হবে। কিন্তু ২০ মাসেও প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন হয়নি।

রাজশাহী পাটকলের উপমহাব্যবস্থাপক ও প্রকল্প প্রধান শরিফুল কবির মোবাইল ফোনে বলেন, পাটকলের কোনো বিষয়ে সংবাদ মাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে মন্ত্রণালয় থেকে স্পষ্ট নিষেধ করা আছে। এ জন্য আমি কিছুই বলতে পারব না। তবে তিনি দাবি করেন, পাটকলের প্রায় ৯৫ শতাংশ শ্রমিকের পাওনা পরিশোধ করা হয়েছে। যাদের পাওনা পরিশোধ হয়নি, আশা করা যায় তারাও তাড়াতাড়ি পেয়ে যাবেন।