ইলিশের ভরা মৌসুমের প্রায় দেড় মাস পেরিয়েছে। তার পরও বরিশাল অঞ্চলে কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ ইলিশ মিলছে না। পরপর তিন মৌসুম বরিশাল তথা গোটা দক্ষিণাঞ্চলের আড়তে সরবরাহ কমেছে ইলিশের। ইলিশ সংকট ও চড়া দাম নিয়ে হতাশা বিরাজ করছে ক্রেতা-বিক্রেতার মাঝে।

বরিশাল নগরীর পোর্ট রোড মোকামের রিয়া মৎস্য আড়তঘরের মালিক নাসির উদ্দিন ৩৩ বছর ইলিশের ব্যবসা করছেন। এবারের দাম প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘গত তিন বছর ভরা মৌসুমে ৭০০-৯০০ গ্রাম (এলসি সাইজ) ইলিশের কেজি হাজার টাকার নিচে নামেনি। প্রতি মৌসুমে আগের মৌসুমের চেয়ে ৫০০ টাকা দাম বাড়ছে। গত সোমবার এলসি সাইজের ইলিশের পাইকারি দর ছিল ১ হাজার ৮০০ টাকা। কেজির ওপর হলেই দাম ২ হাজার টাকা ছাড়িয়ে যায়।’

ইলিশের চড়া দামের কারণে পাড়া-মহল্লায় ফেরিওয়ালাদের হাঁকডাক এখন নেই বললেই চলে। সাগর-নদীর এলাকা দক্ষিণের উপকূলে ইলিশের এমন সংকট সব শ্রেণীর মানুষকে হতাশ করছে। গত বছরের জুলাইয়ের চেয়ে এ বছরের জুলাইয়ে ১ হাজার ৭০১ দশমিক ৩৫৫ টন কম ইলিশ আহরিত হয়েছে দক্ষিণাঞ্চলে।

যদিও মৎস্য অধিদপ্তরের দায়িত্বশীলরা ইলিশের এতটা সংকট মানতে নারাজ। তাদের হিসাবে, প্রতি বছরই ইলিশ উৎপাদন বাড়ছে। গত ১০ বছরে ইলিশ উৎপাদন বেড়েছে ১১২ ভাগ। তার পরও বাজারে কেন ইলিশ সংকট এর পক্ষে নানা যুক্তি দেখাচ্ছেন তারা।

তাদের বক্তব্য, গভীর সাগরে পর্যাপ্ত ইলিশ রয়েছে। বৃষ্টির পরিমাণ কম, অস্বাভাবিক তাপমাত্রা, সাগর মোহনায় নাব্য সংকট এবং মোহনাগুলোয় নিরবচ্ছিন্নভাবে জাল পেতে রাখায় নদীতে এবার ইলিশ পাওয়া যায়নি।

বরিশালের মৎস্য সম্প্রসারণ কর্মকর্তা (ইলিশ) ড. বিমল চন্দ্র দাস বণিক বার্তাকে বলেন, ‘উল্লিখিত কারণে গত কয়েক মৌসুমের শুরুতে কম ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে। নদীতে এখনো ইলিশ আসতে শুরু করেনি। সাগরের মাছই এখন আমাদের ভরসা। গত সপ্তাহে মাছের জো গেলেও দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় জেলেরা সাগরে যেতে পারেননি। এখন যাওয়া শুরু করেছেন। পরবর্তী জো শেষে সাগরমুখী জেলেরা ফিরে এলে বাজারে ইলিশের সরবরাহ কিছুটা বাড়বে।’

ড. বিমল বলেন, ‘তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হলে ইলিশ সহনক্ষমতা হারায়। মাছ সাগরের শতাধিক ফুট পানির নিচে চলে যায়। অন্যদিকে বাংলাদেশের জেলেরা ৪০ ফুট গভীর পর্যন্ত জাল ফেলতে পারেন।’

তিনি জানান, গত সপ্তাহে ভারি বৃষ্টির আগ পর্যন্ত পুরো ইলিশ মৌসুমে তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে ছিল। এখন তাপমাত্রা ২২-২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করছে। এ অবস্থা স্থিতিশীল থাকলে ইলিশ ওপরের দিকে উঠে আসবে এবং জেলেদের জালে ধরা পড়বে।

মৎস্য অধিদপ্তর বরিশাল বিভাগীয় অফিস সূত্রে জানা গেছে, মৌসুমের প্রথম মাস জুলাইয়ে আহরিত ইলিশের পরিমাণ ১৩ হাজার ৩১০ দশমিক ৫০৫ টন। গত বছর একই সময়ে আহরিত হয়েছিল ১৫ হাজার ১১ দশমিক ৮৬০ টন। বিভাগের ছয় জেলার মধ্যে বরিশাল, পটুয়াখালী, বরগুনা ও ভোলায় মূলত ইলিশ পাওয়া যায় বেশি। পটুয়াখালী, বরগুনা ও ভোলার মোকামে স্থানীয় নদ-নদী ছাড়াও সংলগ্ন সাগর থেকে আহরিত ইলিশ আমদানি হয়। বরিশালের মোকাম মূলত মেঘনা ও তার শাখা নদীতে আহরিত ইলিশের ওপর নির্ভরশীল।

মৎস্য অধিদপ্তর থেকে পাওয়া তথ্যমতে, ইলিশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চার জেলার মধ্যে সবচেয়ে কম ইলিশ মিলছে বরিশালের মোকামে। এ বছর জুলাইয়ে ইলিশ ক্রয়-বিক্রয় হয়েছে বরিশাল মোকামে ৮৭৪ টন। একই সময়ে গত বছর ছিল ২ হাজার ৯৩৭ টন। গত জুলাইয়ে ইলিশ ক্রয়-বিক্রয় হয়েছে ভোলায় ছয় হাজার ৭১৩ টন, পটুয়াখালীতে ৩ হাজার ৭৭৬ টন ও বরগুনায় ১ হাজার ৭১২ টন।

বরিশাল গরির পোর্ট রোডের আড়তদার নাসির উদ্দিন জানান, স্থানীয় নদ-নদীতে ইলিশ না পাওয়ায় পোর্ট রোড মোকামে আমদানি কম। যে কারণে দামও চড়া। গতকাল এলসি সাইজের (৭০০-৯০০ গ্রাম) ইলিশ প্রতি কেজি পাইকারি দর ছিল ১ হাজার ৮০০ টাকা, ১ হাজার ২০০ গ্রাম সাইজ ২ হাজার ২০০ এবং ৫০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ ১ হাজার ৫০০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। খুচরা বিক্রেতারা বিক্রি করেছেন প্রতি কেজিতে আরো ১৫০-২০০ টাকা বেশি দামে।

মৎস্য অধিদপ্তরের বরিশাল বিভাগীয় উপপরিচালক আনিসুর রহমান বলেন, ‘আবহাওয়া পরিবর্তনজনিত কারণে অপরিপক্ব ইলিশও মা হিসেবে ডিম ধারণে অভ্যস্ত হচ্ছে। ওই ডিমের উৎপাদন ক্ষমতা কম। নাব্য সংকট, স্রোত কমে যাওয়া, চর-ডুবোচরে বাধা, নদী ও সাগরের পানির অতিরিক্ত দূষণের কারণে ইলিশের জীবনচক্র বদলে যাচ্ছে।’