বাংলাদেশে তৈরি পোশাক রফতানির সবচেয়ে বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ। মেড ইন বাংলাদেশ পোশাকের অন্যতম বৃহৎ ক্রেতাপ্রতিষ্ঠান এইচঅ্যান্ডএম ও ওয়ালমার্ট। এর মধ্যে সুইডেনের এইচঅ্যান্ডএম হলো ইউরোপের বাজারে বড় পোশাক সরবরাহকারী, আর যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের জন্য ওয়ালমার্ট। সম্প্রতি বাংলাদেশ থেকে এ দুটি প্রতিষ্ঠানেরই ক্রয়াদেশ কমেছে ১০ শতাংশ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোয় চাহিদা কমে যাওয়ার কারণেই মূলত ক্রয়াদেশ কমেছে। এ অবস্থায় সামনের দিনগুলো পোশাক খাতের জন্য চ্যালেঞ্জিং হতে পারে।
কভিড-১৯ মহামারীর অভিঘাত কাটিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে ক্রমেই বাড়ছিল বাংলাদেশের পোশাক রফতানি। কিন্তু রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বের সব দেশকেই এখন মূল্যস্ফীতি পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হচ্ছে। যার কারণে খাদ্য ও জ্বালানির মতো অতি জরুরি পণ্যের চাহিদা মেটাতে ভোক্তাদের বেশি মনোযোগ দিতে হচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই কেনাকাটায় অগ্রাধিকারের জায়গা থেকে সরে গেছে পোশাক। ভোক্তাদের এ প্রবণতার কারণে ক্রয় কৌশলে পরিবর্তন এনেছে ব্র্যান্ড রিটেইলার প্রতিষ্ঠানগুলোও। ক্রয় কৌশল পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় ওয়ালমার্ট ও এইচঅ্যান্ডএম বাংলাদেশ থেকে পোশাক কেনার পরিমাণ কমিয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ভোক্তা চাহিদা কমে যাওয়ার কারণে এইচঅ্যান্ডএমের বিক্রিতে যদি ৫ শতাংশ প্রভাবও পড়ে, তাহলেও তার বড় প্রভাব পড়বে বাংলাদেশে। সেটির প্রমাণই মিলেছে গত দুই মাসের ক্রয়াদেশের ক্ষেত্রে।
খাতসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, পোশাক খাতে নতুন নতুন রফতানি বাজার সৃষ্টি হচ্ছে। তুলনামূলক উচ্চমূল্যের পোশাকের ক্রয়াদেশও আসছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র-জার্মানির মতো পুরনো বড় বাজারগুলোয় সরবরাহ কমছে। সাধারণত প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে এইচঅ্যান্ডএম প্রায় ৪ বিলিয়ন (৪০০ কোটি) ডলারের
পোশাক কেনে। এছাড়া ওয়ালমার্ট কেনে ২ বিলিয়ন (২০০ কোটি) ডলারের পোশাক। চলতি বছরের প্রথম দুই মাসে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এইচঅ্যান্ডএমের ক্রয়াদেশ কমেছে ১০ শতাংশ। একই হারে কমেছে ওয়ালমার্টের ক্রয়াদেশও। বাংলাদেশের কারখানাগুলোয় দেয়া ক্রয়াদেশের পরিমাণ বিবেচনায় এ হিসাব করেছে শিল্পসংশ্লিষ্ট সূত্র।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইউরোপভিত্তিক অন্যতম বৃহৎ একটি ক্রেতাপ্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গত দুই মাসে এইচঅ্যান্ডএম ও ওয়ালমার্টের ক্রয়াদেশ ১০ শতাংশেরও বেশি কমেছে। পোশাকের জন্য এইচঅ্যান্ডএমের প্রধান সোর্সিং কান্ট্রি হলো বাংলাদেশ। আবার যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের জন্য বাংলাদেশের অন্যতম বড় ক্রেতা ওয়ালমার্ট। এ দুই বাজারে অন্য বড় ক্রেতারা হলো প্রাইমার্ক, সিঅ্যান্ডএ, গ্যাপ ও ভিএফ। এদের বিক্রি কমলে বাংলাদেশে তার প্রভাব পড়বে অবধারিতভাবেই।’
ভারতের বাজারের জন্য বাংলাদেশ থেকে পোশাক কেনে মার্কস অ্যান্ড স্পেনসার। এ প্রতিষ্ঠানের ক্রয়াদেশ জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে বেড়েছে ২০ শতাংশের মতো। যার প্রভাবে ভারতের মতো নতুন বাজারে পোশাক রফতানি বেড়েছে। অর্থাৎ, অন্যতম বড় দুটি বাজারে ক্রয়াদেশ কমলেও নতুন নতুন বাজার সৃষ্টি হচ্ছে, রফতানিও বাড়ছে।
ক্রয়াদেশ কমায় জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশের বড় দুই বাজার যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানিতে পোশাক রফতানি কমেছে জানিয়ে বিজিএমইএ সভাপতি ফারুক হাসান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গত বছরের দ্বিতীয়ার্ধে মোট রফতানির ভ্যালুতে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল। আর তা হয়েছিল ইউনিট প্রাইস এবং হাই-ভ্যালু পণ্যের জন্য। তবে চলতি মার্চ ও এপ্রিলের ভ্যালুতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হতে পারে। বর্তমানে গ্যাস-বিদ্যুতের মূল্য অনেক বেড়েছে। এ পরিস্থিতিতে প্রতিযোগিতামূলকভাবে টিকে থাকতে আমাদের অনেক নীতিসহায়তা প্রয়োজন হবে। দেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এমনিই কমে এসেছে। এর ওপর আরো চাপ পড়বে, যদি পলিসি সাপোর্ট নিশ্চিত করা না হয়। পাশাপাশি এনবিআর ও কাস্টমসের প্রক্রিয়াগুলোও সহজীকরণের প্রয়োজন রয়েছে।’
বিজিএমইএর দেয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম দুই মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি দেশে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি বেড়েছে ৮ দশমিক ৪২ শতাংশ। তবে সবচেয়ে বড় বাজার জার্মানিতে রফতানি কমেছে ১২ দশমিক ৩৭ শতাংশ। এ সময়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রফতানি কমেছে ১৩ দশমিক ৭৯ শতাংশ, কানাডায় কমেছে ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ।
ইউরোপ-যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও বাংলাদেশের পোশাকের অপ্রচলিত কিছু বাজার রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জাপান, অস্ট্রেলিয়া, রাশিয়া, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মেক্সিকো, মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, তুরস্ক, দক্ষিণ আফ্রিকা, নিউজিল্যান্ড, চিলি ও ব্রাজিলের মতো দেশ। এসব দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পোশাক রফতানি হয়েছে ভারত ও তুরস্কে। জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে দেশ দুটিতে পোশাক রফতানি বেড়েছে যথাক্রমে ১০৩ ও ১০৪ শতাংশ।
বৈশ্বিক অর্থনীতি একটি উত্তাল সময় পার করছে। বিশ্বব্যাপী খুচরা বিক্রি খাতে এর প্রভাব পড়েছে সবচেয়ে বেশি। যার ফল হিসেবে কিছু প্রধান বাজারে পোশাক রফতানিতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। পোশাক খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, পোশাকের চাহিদা ও ব্যবহারে এ মন্দা পরিস্থিতি কিছু সময়ের জন্য অব্যাহত থাকতে পারে। সামগ্রিকভাবে আগামী মাসগুলো বেশ চ্যালেঞ্জিং হতে পারে বাংলাদেশের জন্য। তবে এর মধ্যেই নতুন সুযোগ অন্বেষণের পাশাপাশি সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার ও দক্ষতার দিকে নজর দিতে হবে।










