রক্তক্ষয়ী ট্রয়ের যুদ্ধ শেষ হলো। ঘরে ফিরল সব বীর। শুধু ফেরেনি ইথাকার বীর ওডিসিয়াস। আশা আর হতাশার মাঝে দীর্ঘ ২০ বছর অপেক্ষা করলেন পেনিলোপ। অপেক্ষার সেই দিনগুলোকে নিপুণভাবে চিত্রিত করেছেন মহাকবি হোমার তার ওডিসিতে। তবে আর্জেন্টিনার অপেক্ষা ছিল পেনিলোপের চেয়েও দীর্ঘ। দিনটির জন্য বসে থাকতে হয়েছে সুদীর্ঘ ৩৬ বছর। ফলে কাতার বিশ্বকাপের শিরোপা জয়ের খবর পাওয়ামাত্রই উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়েছে বুয়েন্স আয়ার্সের রাজপথ। ট্রয়ফেরত ওডিসিয়াসের মতো গোপনে না। কাতার ফেরত মেসিরা আর্জেন্টিনায় প্রবেশ করেছেন সরব গৌরবের সঙ্গে।

সেই ১৯৮৬ সালে ম্যারাডোনার হাত ধরে শিরোপা জিতেছিল আর্জেন্টিনা। তারপর যেন নিয়তি আর তাকায়নি। প্রতিটি আসরে নানা প্রস্তুতি নিয়ে এসেও ফিরেছে শূন্য হাতে। যেন পৌরাণিক দেবতাদের ক্রোধ। যেন কোনো মেসায়াহর অপেক্ষায় নির্বাসিত হিব্রু জাতি। লুসাইল আইকনিক স্টেডিয়ামে সত্যিকার অর্থেই মেসি হয়ে উঠলেন আর্জেন্টাইন ফুটবলের মেসায়াহ। লুসাইল আইকনিক স্টেডিয়ামে ফ্রান্সের বিপক্ষে নাটকীয়


বিজয় ফিফা ইতিহাসে নিঃসন্দেহে অন্যতম সেরা ঘটনা। টাইব্রেকারে ৪-২ ব্যবধানে ফ্রান্সকে পরাস্ত করে নিয়তি বদলাল আর্জেন্টিনা। যেন মেসি ফিরিয়ে আনলেন ম্যারাডোনাকে। দুই যুগের অভিশাপ কাটিয়ে শিরোপা স্পর্শ করল লাতিন আমেরিকার মাটি। দেশের জন্য চ্যাম্পিয়ন খেতাব আর নিজের হাতে গোল্ডেন বল। আর কোনো অপূর্ণতা রইল না ফুটবলের বরপুত্রের।


বিজয়ের পর পরই আর্জেন্টাইন শিবিরে শুরু হয় দেশে ফেরার প্রস্তুতি। বিজয়ী বীরদের বরণ করতে সাড়া পড়ে যায় সারা দেশে। প্রেসিডেন্ট আলবার্তো ফার্নান্দেজ মঙ্গলবারকে জাতীয় ছুটির দিন ঘোষণা করেন। বিজয় উদযাপনের সব পথ যেন আরো এক অনাবিল ছন্দে মুখর সরকারের শীর্ষস্থান থেকে দেশের দুর্গম গ্রাম। খেলোয়াড়দের নিয়ে বিমান যখন আর্জেন্টিনার পথে রওনা হলো, সেই সময়ে প্রায় দুই লাখ মানুষ আকাশপথ পর্যবেক্ষণ করেছে অনলাইনে। অবতরণের দৃশ্য সরাসরি সম্প্রচার করেছে সংবাদমাধ্যমগুলো। নিকট ইতিহাসে এমন আয়োজন দেখেনি বুয়েন্স আয়ার্স। বুয়েন্স আয়ার্সের এজেইজা আন্তর্জাতিক


বিমানবন্দরে অবতরণ করে মেসিদের বিমান। অ্যারোলাইনাস আর্জেন্টিনাসের এআর ১৯১৫ বিমানটি কাতারের হামাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে যাত্রা করেছিল। সব প্রস্তুতি আগে থেকেই সম্পন্ন। গতকাল ভোর ৩টার আগেই লালগালিচা সংবর্ধনা দেয়া হয় এজেইজা বিমানবন্দরে। বিশ্বকাপ হাতে নিয়ে সবার আগে অবতরণ করেন মেসি। তার কাঁধে হাত রেখে এগিয়ে আসেন কোচ লিওনেল স্ক্যালোনি। তাদের ঠিক পেছনেই উদীয়মান তারকা হুলিয়ান আলভারেজ। পাশেই লেখা ‘থ্যাংক ইউ, চ্যাম্পিয়ন্স’। আর প্লেনের পেছনে লেখা ছিল ‘একটি দল, একটি দেশ, একটি স্বপ্ন’। এদিকে ‘ভামোস আর্জেন্টিনা’ স্লোগানে মুখর সারা দেশ। মুখে মুখে ফুটবলের বরপুত্র মেসির নাম। মুচাচোর মূর্ছনায় উত্তাল চারদিক। পপ ব্যান্ড লা মস্কার গান অবলম্বনে তৈরি হয়েছিল মুচাচোর লিরিক। লিখেছিলেন ফারনান্দো রোমারো নামের এক ভক্ত। ক্রমে লাভ করেছে জনপ্রিয়তা। পরিণত হয়েছে আর্জেন্টাইন ফুটবলের থিম সঙে।


কোনো কোনো খেলোয়াড় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি আপলোড করেছিলেন আগেই। খেলার শেষে ও বিমানে ওঠার সময়। বিমানে থাকার সময় মেসির হাতেই ছিল শিরোপা। ডিফেন্ডার নিকোলাস তাগলিয়াফিকো ছবি পোস্ট করেন, যেখানে দেখা যায় বিশ্বকাপটি একটা সিট বেল্ট দিয়ে বাঁধা। যেন বীরদের সঙ্গে নতুন এক যাত্রী উঠেছে বিমানে। যেন নতুন ইতিহাস অবতরণ করছে বুয়েন্স আয়ার্সমুখী বিমানে। বুয়েন্স আয়ার্সের স্মৃতিস্তম্ভের পাশে তখন লাখো মানুষের সমাবেশ। অবশ্য সোমবার বিকাল থেকেই বিমানবন্দরে আসতে শুরু করে ফুটবলপ্রেমীরা। জমায়েত হতে শুরু করে স্মারকস্তম্ভের পাশেই। যেন সেখানেই রাত কাটাবে অপেক্ষা নিয়ে। যেন মঙ্গলবারের উদযাপনের সময় সুবিধাজনক জায়গায় দাঁড়িয়ে অভ্যর্থনা জানাতে পারে দেশের বীরদের। যেন তাদের চিত্কার শোনাতে পারে। যেন খুব কাছে থেকে দেখতে পারে প্রিয় মুখগুলো। ভালোবাসার ভাষা বড় অদ্ভুত। ছাদখোলা বাসে করে আর্জেন্টাইন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান কার্যালয়ের দিকে যায় বিজয়ী বীরেরা। ১১ কিলোমিটার পথ যেতে ১ ঘণ্টারও বেশি সময় লেগেছে বাসটির। ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন কার্যালয় তাদের বরণ করে আতশবাজি ফাটিয়ে। কয়েক ঘণ্টার জন্য ঘুমের সুযোগ পায় চ্যাম্পিয়নরা। ততক্ষণে স্মারকস্তম্ভের পাশে জনসমুদ্র হয়ে গেছে। স্মারকস্তম্ভটি বুয়েন্স আয়ার্স শহরের ৪০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ১৯৩৬ সালে তৈরি করা হয়। অজস্র ইতিহাসের সাক্ষী। এবারো দেখল স্তম্ভটি। চারদিকে ভক্তদের ভিড়। অনেকের হাতেই আর্জেন্টিনার জাতীয় পতাকা। সম্মিলিত কণ্ঠে ধন্যবাদ জানাচ্ছে বিজয়ীদের। স্বভাব শান্ত মেসিও যেন চঞ্চল হয়ে ওঠে। ভক্তদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে গাইতে থাকেন ‘মুচাচো, আওরা ন উলভিমো এইলুসোনার’।


আর্জেন্টিনা ১৯৮৬ সালে ম্যারাডোনাকেও বরণ করেছিল। তবে এ সমাবেশ যেন আরো বেশি আবেগঘন। আরো বেশি আনন্দের। কারণ হয়তো ম্যারাডোনার শিরোপা পাওয়ার আগে এতটা অপেক্ষা করতে হয়নি আর্জেন্টিনাকে, যতটা মেসি ফেরার আগে করতে হলো। এ সফলতায় দেশের বাইরে থেকেও আসছে অভিনন্দন বার্তা। সেলিব্রিটিরা তাদের যোগাযোগমাধ্যমে অভিনন্দন জানাচ্ছেন। বিশ্বনেতারাও অভিনন্দন জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ফার্নান্দেজকে। ফার্নান্দেজ টুইটের মাধ্যমে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে ধন্যবাদ জানান। সেখানে তিনি বলেন, আপনার অভিনন্দনের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রেসিডেন্ট পুতিন। যে আনন্দ আর্জেন্টিনাকে বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ করেছেন। তা একটা উদাহরণ হয়ে থাকুক। এ মুহূর্তে ঐক্য ও শান্তি প্রয়োজন সমাজের জন্য।