আসন্ন ২০২০-২১ অর্থবছরের জন্য সরকারের উন্নয়ন বাজেট বা বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) খসড়া পরিকল্পনা কমিশনের অনুমোদন পেয়েছে গতকাল। এবারের এডিপিতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২ লাখ ৫ হাজার ১৪৪ কোটি ৭৯ লাখ টাকা, যা চলতি অর্থবছরের (২০১৯-২০) সংশোধিত এডিপির তুলনায় সাড়ে ৬ শতাংশ বেশি। এ বরাদ্দের প্রায় ৮৬ শতাংশই রাখা হয়েছে মাত্র ১০টি খাতে। এর মধ্যে ২৫ শতাংশের বেশি বরাদ্দ নিয়ে খাতভিত্তিক সর্বোচ্চ বরাদ্দ পাচ্ছে পরিবহন খাত।

রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে গতকাল এডিপির খসড়া অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনের বর্ধিত সভা আয়োজন করা হয়। পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নানের সভাপতিত্বে আয়োজিত এ সভায় আরো উপস্থিত ছিলেন অর্থ সচিব আবদুর রউফ তালুকদার, পরিকল্পনা সচিব মো. নুরুল আমিন, ইআরডি সচিব ফাতিমা ইয়াসমিন, শিল্প ও শক্তি বিভাগের সদস্য (সিনিয়র সচিব) বেগম সাহিন আহমেদ চৌধুরী, কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের সদস্য মো. জাকির হোসেন আকন্দ, আর্থসামাজিক অবকাঠামো বিভাগের সদস্য আবুল কালাম আজাদসহ অন্যান্য সদস্য এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সচিব ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, খসড়া পরিকল্পনায় আগামী অর্থবছরের মোট এডিপি বরাদ্দের মধ্যে বৈদেশিক অর্থায়ন থাকছে প্রায় ৩৪ শতাংশ। টাকার অংকে যার পরিমাণ দাঁড়ায় ৭০ হাজার ৫০১ কোটি ৭২ লাখ। অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ সম্পদ থেকে জোগানের পরিমাণ ১ লাখ ৩৪ হাজার ৬৪৪ কোটি টাকা বা প্রায় ৬৬ শতাংশ। অন্যদিকে অর্থবছরের মূল এডিপিতে অভ্যন্তরীণ সম্পদ থেকে জোগানের পরিমাণ ধরা হয়েছিল ১ লাখ ৩০ হাজার ৯২১ কোটি টাকা। এছাড়া বরাদ্দ বাবদ বৈদেশিক সহায়তার পরিমাণ ধরা হয়েছিল ৭১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা।

প্রসঙ্গত, চলতি অর্থবছরের মূল এডিপির আকার ছিল ২ লাখ ২ হাজার ৭২১ কোটি টাকা (স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের বরাদ্দ বাদ দিয়ে)। পরে সংশোধনের পর এর আকার দাঁড়ায় ১ লাখ ৯২ হাজার ৯২১ কোটি টাকা। সে হিসেবে সংশোধিত এডিপির তুলনায় আগামী অর্থবছরের এডিপি বাড়ছে প্রায় ৬ দশমিক ৩৪ শতাংশ। 

এ বিষয়ে পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান বণিক বার্তাকে বলেন, আজকের আলোচনার মাধ্যমে আগামী অর্থবছরের একটি খসড়া বরাদ্দ আমরা চূড়ান্ত করেছি। সবার মতামতের ভিত্তিতে মন্ত্রণালয় ও বিভাগ এবং খাতভিত্তিক এসব বরাদ্দ নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে এটি মোটেও চূড়ান্ত নয়। প্রধানমন্ত্রীর কাছে এ খসড়া আমরা এনইসি মিটিংয়ে উপস্থাপন করব। আগামী অর্থবছরের জন্য সরকারের উন্নয়ন বাজেটে কোথায় কী ধরনের বরাদ্দ রাখা হচ্ছে, তা তখনই চূড়ান্ত হবে। তবে এটুকু বলতে পারি, আগামী অর্থবছরের জন্য যে সর্বোচ্চ সিলিং নির্ধারণ করা হয়েছে, সেখানে এডিপি বাড়ছে প্রায় সাড়ে ৬ শতাংশ।

গতকালের বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, চলমান উন্নয়ন কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে এবার সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে স্থানীয় সরকার বিভাগে। এর পরই রয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ এবং সেতু বিভাগ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, রেলপথ মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্যসেবা এবং শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বিভাগ, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় ইত্যাদি। সব মিলিয়ে ১০ মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে দেড় লাখ কোটি টাকার বেশি।

খাতভিত্তিক বরাদ্দ: খাতভিত্তিক বরাদ্দের দিক থেকে শীর্ষে রয়েছে পরিবহন খাত। এর পরই রয়েছে ভৌত অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, শিক্ষা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, পল্লী উন্নয়ন, স্বাস্থ্য, কৃষি, পানি ও জনপ্রশাসন খাত। এই ১০ খাতে মোট বরাদ্দ প্রায় ১ লাখ ৭৭ হাজার কোটি টাকা, যা মোট এডিপির প্রায় ৮৬ শতাংশ।

জানা গেছে, খসড়ায় যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, পদ্মা সেতু ও পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগ প্রকল্পের গুরুত্ব বিবেচনায় পরিবহন খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। এ খাতে বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে ৫২ হাজার ১৮৩ কোটি টাকা, যা মোট এডিপির ২৫ দশমিক ২৫ শতাংশ। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে ভৌত অবকাঠামো খাতে, যার পরিমাণ প্রায় ২৫ হাজার ৭৯৫ কোটি টাকা। তৃতীয় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে বিদ্যুৎ খাতে, প্রায় ২৪ হাজার ৮০৪ কোটি টাকা। শিক্ষা খাতে চতুর্থ সর্বোচ্চ বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে, যার পরিমাণ প্রায় ২৩ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণসহ তথ্য ও প্রযুক্তি প্রসারের লক্ষ্যে বিজ্ঞান, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাতে পঞ্চম সর্বোচ্চ বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যার পরিমাণ ১৮ হাজার ৪৪৮ কোটি।

বরাদ্দের পরিমাণ বিবেচনায় এর পরই রয়েছে পল্লী উন্নয়ন খাত। গ্রামীণ অর্থনীতিতে গতিশীলতা বাড়ানোর পাশাপাশি অধিক কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য খাতটিতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১৫ হাজার ৫৫৬ কোটি টাকা। করোনার কারণে খসড়া এডিপিতে বরাদ্দ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে সার্বিক স্বাস্থ্য খাতে ১৩ হাজার ৩৩ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রাখা হয়েছে খসড়ায়। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন ও খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতের উদ্দেশ্যে কৃষি খাতে ৮ হাজার ৩৮২ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া নদীভাঙন রোধ ও নদী ব্যবস্থাপনার জন্য পানি সম্পদ খাতে ৫ হাজার ৫২৭ কোটি এবং মানবসম্পদ উন্নয়নসহ দক্ষতা বৃদ্ধিতে গতিশীলতা আনয়নের জন্য জনপ্রশাসন খাতে ৪ হাজার ৪৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।