অসুস্থ গবাদিপশুর মাংস ও রক্ত থেকে মানুষের শরীরে ছড়িয়ে পড়ছে অ্যানথ্রাক্স নামক সংক্রামক রোগ। সম্প্রতি রংপুর ও গাইবান্ধার বিভিন্ন উপজেলায় এ রোগে অর্ধশতাধিক আক্রান্ত ও দুজনের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। এবার সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে সীমান্তবর্তী জেলা মেহেরপুরে। জেলার স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য বলছে, চলতি বছর ৪৬৪ জন অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হয়েছে। আক্রান্ত রোগীর ৯৭ শতাংশই গাংনী উপজেলার বাসিন্দা।

নতুন এলাকায় অ্যানথ্রাক্স শনাক্ত হওয়ায় কিছুটা চিন্তায় পড়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ। রংপুর বা গাইবান্ধায় অ্যানথ্রাক্স কেন ছড়াল তা অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)। গত ১৩ ও ১৪ সেপ্টেম্বর আইইডিসিআরের একটি প্রতিনিধি দল পীরগাছা সদর ও পারুল ইউনিয়নের অ্যানথ্রাক্স উপসর্গ থাকা ১২ জনের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করে। এর মধ্যে আটজনের অ্যানথ্রাক্স শনাক্ত হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে উপদ্রুত এলাকা ও এর আশপাশের মানুষকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার অনুরোধ জানানো হয়েছে।

মেহেরপুর স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য বলছে, গাংনী উপজেলায় অ্যানথ্রাক্স সংক্রমণ সবচেয়ে বেশি। উপজেলার কাজিপুর, মটমুড়া ও ধানখোলা ইউনিয়নের বেশির ভাগ গ্রামে প্রতিদিনই নতুন করে কেউ কেউ রোগটিতে আক্রান্ত হচ্ছে।

গাংনী উপজেলার বেতবাড়িয়া গ্রামের কামরুল ইসলাম ও শেফালী খাতুন দম্পতি জানান, তাদের ছাগলের অ্যানথ্রাক্স হয়েছিল। চিকিৎসা দিয়েছেন, সেবা করেছেন। পরে ছাগলটি জবাই করে নিজেরা মাংস খেয়েছেন। কয়েক দিন পরই দেখেন তাদের হাতে ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে। সাধারণ ক্ষত মনে করে স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা নিয়েও ভালো হয়নি। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য গাংনী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যান।

গবাদিপশুর মাংস বা চামড়ার সংস্পর্শে এসে ব্যাকটেরিয়াজনিত এ রোগ মানুষের দেহে ছড়িয়ে পড়ছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা। সামাজিক সচেতনতার অভাব, প্রাণিসম্পদ বিভাগের পর্যাপ্ত ভ্যাকসিনের অভাব এবং প্রশাসনের সমন্বয়হীনতার কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

কাজিপুর গ্রামের সেলিম হোসেন বলেন, ‘গত সপ্তাহে আমার গরুটা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ে। ভেবেছিলাম জ্বর বা গ্যাসের সমস্যা। সকালে দেখি গরুটা মারা গেছে। এরপর তার মাংস পুড়িয়ে ফেলা হয়। পরে আমার হাত ফুলে ক্ষত তৈরি হয়। ডাক্তার বললেন, এটা অ্যানথ্রাক্স। এখন ভয়ে আছি। কারণ সন্তানরাও অসুস্থ।’

গাংনী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডা. ফারুক হোসেন বলেন, ‘অ্যানথ্রাক্স এখন খুব দ্রুত ছড়াচ্ছে। অনেকেই সংক্রমিত পশু জবাই করে, আবার কেউ তা বিক্রিও করে দেয়। এতে পরিবারের সদস্যরাও আক্রান্ত হচ্ছেন। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো গ্রাম্য চিকিৎসক। তারা ব্যাকটেরিয়াকে পুরোপুরি ধ্বংস করতে পারেন না, ফলে এটি ছড়িয়ে পড়ে। প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসা নিলে অ্যানথ্রাক্স নিরাময়যোগ্য। আক্রান্তদের হাসপাতালে আসতে হবে, কোনোভাবেই লুকিয়ে চিকিৎসা নেয়া উচিত নয়।’

প্রাণিসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, সংক্রমণ বাড়লেও পর্যাপ্ত ভ্যাকসিন ও ভ্যাকসিনাইজেশন করার জন্য জনবল নেই।

এ ব্যাপারে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোত্তালেব আলী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা প্রতিনিয়ত মাঠপর্যায়ে কাজ করছি। কিন্তু উপজেলার আকার বড় হওয়ায় প্রতিটি গ্রামে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না। সীমান্তবর্তী এলাকায় অ্যানথ্রাক্স বেশি দেখা দিচ্ছে। ভ্যাকসিন সংকট আছে। বিশেষ বরাদ্দ ছাড়া এটি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। সচেতনতা বাড়াতে ইউনিয়নভিত্তিক সভা, প্রচারণা ও ফিল্ড ভিজিট বাড়ানোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে।’

মেহেরপুর সিভিল সার্জন ডা. একেএম আবু সাঈদ বলেন, ‘চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মেহেরপুরে অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হয়েছে ৪৬৪ জন। এর মধ্যে ৯৮ শতাংশই গাংনী উপজেলার বাসিন্দা। তবে প্রকৃত সংখ্যা আরো বেশি হতে পারে। কারণ অনেকেই স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা নিচ্ছে। ত্বকে অ্যানথ্রাক্স দেখা দিলেও এটি যদি ফুসফুস বা খাদ্যনালিতে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে তা প্রাণঘাতী হতে পারে। আমরা জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সচেতনতা কর্মসূচি জোরদার করেছি।’

২০১০ সালে প্রথম বাংলাদেশে এ রোগের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। ওই সময় সিরাজগঞ্জ ও পাবনা অঞ্চলে অনেক পশুর মৃত্যু হয়। সংক্রমণে আক্রান্ত হয় দুই হাজারের অধিক লোক এবং মারা যায় দুজন। সম্প্রতি আবারো ছড়িয়ে পড়ছে রোগটি। রংপুর সিটি করপোরেশন, পীরগাছা, কাউনিয়া, মিঠাপুকুরে ১১ জনের শরীরে রোগটি শনাক্ত হয়েছে। এছাড়া গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় নতুন করে ছয়জনের শরীরে অ্যানথ্রাক্স শনাক্ত হয়েছে। এ নিয়ে চলতি মাসে উপজেলায় মোট ২২ জনের শরীরে রোগটির উপস্থিতি পাওয়া গেছে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অ্যানথ্রাক্সের জীবাণু ১০০ বছর পর্যন্ত মাটিতে টিকে থাকতে পারে। যখন গরু, ছাগল বা মহিষ চারণের সময় কচি ঘাসের সঙ্গে মাটি গ্রহণ করে, তখন তারা সংক্রমিত হয়। এরপর আক্রান্ত প্রাণীর মাংস, রক্ত বা পশমের সংস্পর্শে এলেই মানুষের মধ্যে অ্যানথ্রাক্সের সংক্রমণ ঘটে। এতে আক্রান্ত রোগীর শরীরে চর্মরোগের মতো ঘা বা ক্ষত সৃষ্টি হয়। অ্যানথ্রাক্স থেকে বাঁচতে অসুস্থ গবাদিপশু জবাই থেকে বিরত থাকা এবং দ্রুত ভ্যাকিসন নেয়ার পরামর্শও দিয়েছেন তারা।