বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম সীমান্তের অন্য প্রান্তে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে বিরামহীনভাবে প্রকট শব্দে চলছে গোলাগুলি। গতকাল সকাল ৯টার পর পরই শুরু হয় গোলাগুলি। এ সীমান্তে প্রায় এক মাস ধরে চলছে গুলিবর্ষণ। এর মধ্যে মিয়ানমার থেকে ছোড়া মর্টার শেল একাধিকবার বাংলাদেশের অভ্যন্তরে এসে পড়ে।

সর্বশেষ শুক্রবার মিয়ানমারের নিক্ষেপ করা মর্টারের একাধিক গোলা সীমান্ত পাহাড়ের পাদদেশের শূন্যরেখার আশ্রয়শিবিরে এসে পড়ে। এতে মো. ইকবাল নামের এক যুবকের মৃত্যু হয়। আহত হয় ওই আশ্রয়শিবিরের আরো পাঁচ রোহিঙ্গা।

এ ঘটনায় গতকাল রাত সাড়ে ৮টার দিকে বিজিবির পক্ষ থেকে মৌখিকভাবে প্রতিবাদ জানানো হয়। এর আগে এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশে নিযুক্ত মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে একাধিকবার তলব করে ঢাকা।

ক্রমাগত গোলাবর্ষণের কারণে সীমান্তবাসীর মাঝে আতঙ্ক ক্রমেই বাড়ছে। ভয়ে লোকজন ঘর থেকে বের হচ্ছে না। এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। এদিকে ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ঝুঁকি এড়াতে ঘুমধুম উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রের এসএসসি পরীক্ষার্থীদের নিকটবর্তী কেন্দ্র কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে স্থানান্তর করেছে বান্দরবান জেলা প্রশাসন।

জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয়রা জানান, তিনদিন বন্ধ থাকার পর গতকাল থেকে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে পুনরায় গুলি ও মর্টারের গোলার প্রকট শব্দ শোনা যাচ্ছে। এতে নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম সীমান্তের সর্বত্র চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। গতকাল সকালে পুলিশের সহযোগিতায় ঘুমধুম উচ্চ বিদ্যালয়ের পরীক্ষার্থীরা কুতুপালং উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে বাংলা দ্বিতীয় পত্রের পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে।

ঘুমধুম পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের আইসি (ইনচার্জ) পরিদর্শক সোহাগ রানা বণিক বার্তাকে বলেন, সকালে ঘুমধুম উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রের এসএসসি পরীক্ষার্থীদের উখিয়ার কুতুপালং কেন্দ্রে পৌঁছানো হয়েছে। ঘুমধুম উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে ৪৯৯ জন পরীক্ষার্থী রয়েছে। সীমান্তে কাউকে যেতে না দেয়ায় সেখানকার তথ্য পুলিশের কাছে নেই। সীমান্তে বিজিবি তত্পর রয়েছে বলে জানান তিনি।

তুমব্রু সীমান্তের শূন্যরেখার আশ্রয়শিবিরের প্রধান দিল মোহাম্মদ বণিক বার্তাকে বলেন, গতকাল (শুক্রবার) সন্ধ্যার দিকে মিয়ানমারের অভ্যন্তর থেকে গুলিবর্ষণ ও থেমে থেমে মর্টারের গোলা ছোড়ার প্রকট শব্দ পাওয়া যাচ্ছিল। রাত সোয়া ৮টার দিকে একটি মর্টারের গোলা আশ্রয়শিবিরের পাশের খালের কাছে এসে পড়ে বিস্ফোরিত হয়। এ ঘটনায় এক কন্যাশিশুসহ তিন পরিবারের ছয় রোহিঙ্গা আহত হয়। চিকিৎসার জন্য নেয়ার পথে ইকবাল নামের এক রোহিঙ্গা যুবকের মৃত্যু হয়েছে।

জনপ্রতিনিধিরা জানান, অল্প কয়েক ঘণ্টা বিরতি দিয়ে গতকাল সকাল ৯টার দিকে পুনরায় শুরু হয়েছে গুলিবর্ষণ। থেমে থেমে ছোড়া হচ্ছে মর্টারের গোলা। মনে হচ্ছে শূন্যরেখার আশ্রয়শিবিরে মর্টারের গোলা নিক্ষেপের ঘটনাটি পরিকল্পিত। পাঁচ বছর ধরে তুমব্রু সীমান্তের শূন্যরেখায় মিয়ানমারের বাস্তুচ্যুত ৪ হাজার ২০০ জনের বেশি রোহিঙ্গার বসবাস। এ আশ্রয়শিবির ঘেঁষে মিয়ানমারের কাঁটাতারের বেড়া। বেড়াঘেঁষে একাধিক পাহাড়ের ওপর দেশটির বিজিপির (বর্ডার গার্ড অব পুলিশ) একাধিক তল্লাশিচৌকি রয়েছে। আশ্রয়শিবিরের রোহিঙ্গাদের ১৫ দিন পরপর ত্রাণসহায়তা দিচ্ছে আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটি (আইসিআরসি)। 

গতকাল মিয়ানমারের গোলায় আহত পাঁচ রোহিঙ্গা বর্তমানে উখিয়ার কুতুপালং আশ্রয়শিবিরের এমএসএফ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তবে উন্নত চিকিৎসার জন্য সাদিয়া নামের এক শিশুকে রাতে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে  পাঠানো হয়েছে। এর আগে তুমব্রু সীমান্তের বিপরীতে শূন্যরেখার ৩৫ নম্বর পিলারের কাছাকাছি জায়গায় নিজেদের গরু আনতে গিয়ে স্থলমাইন বিস্ফোরণে অথোয়াইং তঞ্চঙ্গ্যা নামের হেডম্যানপাড়ার এক যুবকের বাঁ পায়ের গোড়ালি উড়ে যায়। বাংলাদেশী ওই যুবকেরও চিকিৎসা চলছে চমেক হাসপাতালে। এসব ঘটনার পর সীমান্তবাসীর মাঝে আতঙ্ক ক্রমেই বাড়ছে। ভয়ে লোকজন ঘর থেকে বের হচ্ছে না। এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে বলে জানান জনপ্রতিনিধিরা।

গোলা বিস্ফোরণে হতাহতের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ঘুমধুম ইউপি চেয়ারম্যান একেএম জাহাঙ্গীর আজিজ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, এর আগেও বাংলাদেশের অভ্যন্তরে মিয়ানমারের হেলিকপ্টার থেকে ছোড়া দুটি গোলা এসে পড়ে, যা সেনাবাহিনী বিকল করে দেয়। এক মাসের বেশি সময় ধরে মিয়ানমারের অভ্যন্তর থেকে গোলাগুলিসহ মর্টার শেল নিক্ষেপের শব্দ শোনা যাচ্ছে। শুনেছি, রাখাইন রাজ্যে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী ও আরাকান আর্মির (এএ) মধ্যে গোলাগুলি চলছে। ঘুমধুমের আতঙ্কিত জনপদে দোকানপাট, ব্যবসা-বাণিজ্য স্বাভাবিকভাবে চলছে না। সীমান্তের দিকে কাউকে না যেতে আহ্বান জানানো হয়েছে।

এ ঘটনায় শুক্রবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে বিজিবির পক্ষ থেকে মৌখিকভাবে প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। বিজিবি সদর দপ্তরের পরিচালক (অপারেশন্স) লে. কর্নেল ফয়জুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, তুমব্রু সীমান্তে মিয়ানমারের মর্টার শেল ছোড়ার ঘটনায় তাত্ক্ষণিক মৌখিকভাবে প্রতিবাদ জানিয়েছে বিজিবি। একইভাবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। সীমান্তে সতর্ক অবস্থায় রয়েছে বিজিবি।

বান্দরবান জেলা প্রশাসক ইয়াসমিন পারভীন তিবরীজী জানান, চেয়ারম্যান-মেম্বারসহ তুমব্রু ইউনিয়নবাসীকে আতঙ্কিত না হয়ে সাবধানে থাকার জন্য বলা হয়েছে।