মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার হলদিয়া সিংগারহাটি গ্রামের এক জেলের জালে গত বছরের ১৬ ডিসেম্বর ৮০ কেজি ওজনের একটি বাগাড় মাছ ধরা পড়ে। মাওয়া ঘাটের মত্স্য আড়তে ৮০ কেজি ওজনের এ মাছের দাম ওঠে ৫৫ হাজার টাকা।
রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়ায় পদ্মা-যমুনার মোহনায় ২০ জুন পাবনার ঢালার চর এলাকায় ধরা পড়ে সাড়ে ৪৭ কেজি ওজনের একটি বাগাড় মাছ। পরে মাছটি দৌলতদিয়া ঘাটের মত্স্য আড়তের একজন মাছ ব্যবসায়ীর কাছে ৫৯ হাজার ১২৫ টাকায় বিক্রি হয়।
২০১২ সালের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী বাগাড় মাছ সংরক্ষিত প্রজাতির তালিকায় রয়েছে। আইন অনুযায়ী এ মাছ ধরা ও বিপণন শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তবে আইনে থাকলেও তা প্রয়োগের অভাবে বাগাড় মাছ সংরক্ষণে সেরকম তত্পরতা দৃশ্যমান নয়। বন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, আইনে দেয়া বিধান পরিপালন করতে এ প্রজাতির মাছ রক্ষায় অধিদপ্তরের নেয়া উদ্যোগ যে খুব কাজে লেগেছে তেমন বলা যাবে না। ফলে সংরক্ষিত প্রজাতির তালিকায় থাকলেও অবাধে নিধন হচ্ছে এ মাছ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগের অভাবে ক্রমেই বিলুপ্তির পথে চলে যাচ্ছে মাছটি। এর পরও মাছটির সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ নেই মত্স্য অধিদপ্তর বা বন অধিদপ্তরের।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মত্স্যবিজ্ঞান বিভাগের ড. মো. মনিরুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, উপযুক্ত পরিবেশ না পাওয়ায় এবং আকারে বড় হওয়ার কারণে বাগাড় মাছ সংকটাপন্ন প্রজাতি। আইনের যথাযথ প্রয়োগের অভাবে সংরক্ষিত প্রজাতির তালিকায় থাকার পরও এ মাছ নিধন বা বিপণন বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। অনেকেই হয়তো জানেনই না এ মাছ সংরক্ষিত প্রজাতির তালিকায় রয়েছে বা এটি ধরা নিষিদ্ধ। শুধু আইন করে এ মাছ রক্ষা করা যাবে না। প্রয়োজন আইনের যথোপযুক্ত প্রয়োগ। এজন্য জনগণকে সচেতন করতে হবে। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে মাছটি রক্ষায় উদ্যোগ নিতে হবে।
দেশের ৭৬০টি নদীতে ২৬০ প্রজাতির মাছ পাওয়া যায়। দূষণ-দখলে বিপর্যস্ত নদ-নদীতে আবাসনস্থল হারিয়ে এবং নির্বিচারে নিধনের শিকার হয়ে অনেক মাছই সংকটাপন্ন। আইন ও বিধিবিধানে সেসব প্রজাতির মাছ রক্ষায় উদ্যোগ নেয়া হলেও তা সেভাবে কার্যকর হয়নি। ফলে বাগাড় মাছের মতো অনেক মাছই বিলুপ্তির পথে।
বাংলাদেশ মাত্স্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক (গবেষণা ও পরিকল্পনা) ড. খলিলুর রহমান বলেন, নদীর গভীরতা বেশি যেসব অঞ্চলে সেখানে এ মাছ পাওয়া যায়। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা ও সুরমা নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে কালেভদ্রে এ মাছ পাওয়া যায়। মাছটি সংরক্ষিত প্রজাতির। ধীরে ধীরে বিলুপ্তির পথে।
বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত প্রচলিত আইন রহিত করে দেশের জীববৈচিত্র্য, বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা বিধানে ২০১২ সালে বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন করা হয়। আইনে যাবতীয় বিধিবিধান প্রতিপালনের ক্ষমতা পায় বন অধিদপ্তর। তবে বনের বাইরের পরিবেশ প্রতিবেশ রক্ষায় নানা সময় উদ্যোগ নিলেও তা সেভাবে কার্যকর হয়ে ওঠেনি। ফলে মত্স্যসংশ্লিষ্ট সংকটাপন্ন প্রজাতি রক্ষার ক্ষেত্রে অবহিত করার বাইরে তেমন উদ্যোগ নিতে পারেনি বন অধিদপ্তর।
বিষয়টি নিয়ে বন অধিদপ্তরের বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ অঞ্চলের বন সংরক্ষক মিহির কুমার দে জানান, বাগাড় মাছ রক্ষার বিষয়টি নদীকেন্দ্রিক। সংরক্ষিত প্রজাতি উল্লেখ করে মাছটি রক্ষা করতে উদ্যোগ নেয়ার বিষয়টি আমরা বিভিন্ন সময় মত্স্যসংশ্লিষ্টদের অবহিত করেছি। তবে মাছটি রক্ষার উদ্যোগ আমরা সফলভাবে করতে পেরেছি—তেমন নয়। মাছটি রক্ষা করতে স্থানীয় মত্স্যজীবীদের সচেতন করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এছাড়া এ প্রজাতির মাছসহ আরো যে প্রজাতির মাছ বিলুপ্তির পথে রয়েছে সেগুলো রক্ষার জন্য বিভিন্ন উদ্যোগের কার্যক্রম চলমান রয়েছে।










