দেশের একমাত্র প্রাকৃতিক মত্স্য প্রজনন কেন্দ্র হালদা নদীর ভাঙন রোধে ১৫৬ কোটি টাকা ব্যয়ের একটি প্রকল্পের আওতায় নদীটির দুই তীরে কিলোমিটারজুড়ে স্থাপন করা হচ্ছে সিসি ব্লক। এখন পর্যন্ত প্রকল্পের কাজ অর্ধেক বাকি রয়েছে, যদিও এরই মধ্যে বিভিন্ন জায়গায় দেখা গেছে ফাটল। দেবে ও সরে গেছে বেশ কয়েকটি পয়েন্টে বসানো ব্লক। প্রকল্প শেষ হওয়ার আগে এভাবে সিসি ব্লক দেবে যাওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে কাজের মান নিয়ে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, সিসি ব্লক নির্মাণ, মাটি ফেলা, বালি ও কঙ্করের মিশ্রণের মতো কাজগুলো ভালোভাবে না করায় বিভিন্ন স্থানে ব্লক দেবে বা সরে যাচ্ছে। প্রকল্পের কাজ শুরুর আগে সম্ভাব্যতা যাচাই না করা এবং কাজে অনিয়মের কারণে এ প্রকল্প শেষ পর্যন্ত কতটুকু সুফল বয়ে আনবে তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশ্লেষকরাও।

২০১৮ সালের ২ অক্টোবর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি ও হাটহাজারী উপজেলায় হালদা নদী ও ধুরং খালের তীর রক্ষা ও বন্যা নিয়ন্ত্রণে সিসি ব্লক স্থাপনে ১৫৬ কোটি ৭৬ লাখ টাকা ব্যয়ের প্রকল্পটি অনুমোদন পায়। এ প্রকল্পের আওতায় সাত কিলোমিটার নদীতীরের দুই পাশে সিসি ব্লক স্থাপন করা হচ্ছে। প্রকল্পের সার্বিক দেখভাল করার দায়িত্বে রয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)।

গতকাল হাটহাজারীর ফরহাদাবাদ, কাটিরহাট, নাজিরহাট নতুন ব্রিজ, ফটিকছড়ির রোসাঙ্গীরি হাঁড়িপাড়া ও সমিতির হাট এলাকায় সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, হালদা নদীর দু্ই তীরে অনেক স্থানে ব্লক বসানোর কাজ সম্পন্ন হয়েছে। প্রাথমিকভাবে নদীর ঝুঁকিপূর্ণ ভাঙন অংশ চিহ্নিত করে সেসব পয়েন্টে সিসি ব্লক বসানো হয়েছে। কিন্তু সিসি ব্লক বসানোর পর এসব পয়েন্টে কোথাও নিচের মাটি সরে ব্লক দেবে গেছে, আবার কোথায় নিম্নমানের কাজের কারণে ব্লকগুলো নিচের দিকে ধসে পড়েছে।

স্থানীয়রা অভিযোগ করে বলেন, এখানে ব্লকের নিচে দায়সারাভাবেই ইটের কঙ্কর বসিয়ে কম বালি ব্যবহার করে সিসি ব্লক স্থাপন করা হয়েছে। বর্ষা মৌসুমে সামান্য বৃষ্টিতে সিসি ব্লকের নিচের বালি সরে যাওয়ায় মাটি ধসে তা নিচের দিকে চলে গেছে।

হা্টহাজারী ও ফটিকছড়ি উপজেলায় হালদার তীর পরিদর্শনে দেখা যায়, বেশির ভাগ জায়গায় নদীর পাড় ঢালু করার সময় নিচের মাটি কেটে উপরে দেয়া হয়। নতুন করে প্রকল্পের জন্য বাইরে থেকে মাটি এনে সেখানে দেয়া হয়নি। এছাড়া সিসি ব্লকগুলো বসানোর সময় ব্লকের নিচে বালি ও ইটের কঙ্কর ভালোভাবে না মিশিয়ে তার ওপরে ব্লক বসানো হয়েছে। যার কারণে কয়েকদিন পর নিচের মাটি সরে গিয়ে কোথাও ব্লক দেবে গেছে, আবার কোথায় নিচের দিকে ধসে পড়ে গেছে। এলাকাবাসীর বিক্ষোভের কারণে কয়েক জায়গার ব্লক নদীর পাড়ে স্তূপ করে রেখে দেয়া হয়েছে। সিসি ব্লকের ভাঙন ধরা এলাকায় মেরামত করা হচ্ছে এমন সাইনবোর্ড লাগানো হলেও গত কয়েক মাসে কোনো সংস্কার করা হয়নি বলে জানান স্থানীয়রা।

হাটহাজারী উপজেলার নাজিরহাট নতুন ব্রিজ এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা মো. ইউনুস বণিক বার্তাকে বলেন, এ সেতুর প্রায় ৫০০ মিটার এলাকায় নদীভাঙন রোধে ব্লক বসানো হলেও নিম্নমানের কাজের কারণে সেগুলো দেবে গেছে। ব্লকগুলো দেবে যাওয়ার কারণে সেগুলো আবার তুলে উপরে রাখা হয়েছে। সিসি ব্লকগুলো তুলে ফেরার পর এখন মাটি এমনভাবে ভেঙে গেছে যে কীভাবে পরে সংস্কার করবে সেটাই আমাদের বোধগম্য নয়।

পাউবো কর্মকর্তারা বলেন, লকডাউনের সময় দ্রুতগতিতে কাজ করেছেন ঠিকাদাররা। সেজন্য এ সময়ে আমরা মনিটরিং করতে পারিনি। তবে প্রকল্পের কাজ এখনো যেহেতু চলমান, সেজন্য সব দায়িত্ব ঠিকাদারদের। যে কয়টি স্থানে অনিয়মের প্রসঙ্গ উঠেছে সেগুলো নিয়ে আমরা ঠিকাদারদের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা সমস্যাগুলো প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার আগেই সমাধান করবে বলে জানিয়েছে। ঠিকাদারদের কাজে কোনো অনিয়ম হলে পাউবো ব্যবস্থা নেবে।

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী তয়ন কুমার ত্রিপুরা বলেন, প্রকল্পটির কাজ প্রায় অর্ধেক সম্পন্ন হয়েছে। হালদা পাড়ের সিসি ব্লক স্থাপন নিয়ে নানা ধরনের অভিযোগ আমাদের কাছে এসেছে। মূলত বর্ষা মৌসুমে দ্রুততার সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে ব্লক ধস, ভাঙনসহ কিছু সমস্যা তৈরি হয়েছে। যে কয়টি স্থানে সিসি ব্লক স্থাপন নিয়ে সমস্যা তৈরি হয়েছে সেগুলোর বিষয়ে আমরা ঠিকাদারকে অবহিত করে কাজ বন্ধ করার নির্দেশনা দিয়েছি। তারা এ সংস্কার কাজগুলো নিজ খরচে করবে।

এদিকে নদী বিশ্লেষকরা বলছেন, হালদা নদীর তীর সংরক্ষণে এ প্রকল্প নেয়া হলেও সিসি ব্লক নির্মাণ এবং স্থাপন নিয়ে শুরু থেকেই নানা প্রশ্ন ছিল। নিয়ম হচ্ছে নদীর তীরে মাটি দিয়ে সমান করে যথাযথভাবে বালি ও কঙ্করের মিশ্রণের পর সিসি ব্লক স্থাপন করা হয়। কিন্তু এ প্রকল্পের বেশির ভাগ স্থানেই বালি ও কঙ্করের মিশ্রণ ভালো হয়নি। যার কারণে প্রকল্প চলমান থাকা অবস্থায় বিভিন্ন স্থানে ব্লক দেবে যাওয়া কিংবা স্থানচ্যুত হওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে। এতে কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন চলে আসছে। সম্ভাব্যতা যাচাই করে সঠিক মানদণ্ড মেনে কাজ করলে সিসি ব্লক দীর্ঘমেয়াদি হবে। এটা নিশ্চিত করতে পাউবোর মনিটরিং জোরদার করতে হবে।