নৈতিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানবকেন্দ্রিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) সম্পন্ন ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে দেশে প্রথম আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স রেডিনেস অ্যাসেসমেন্ট বা জাতীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রস্তুতি মূল্যায়ন (র‍্যাম) প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে ।

গতকাল বৃহস্পতিবার (২০ নভেম্বর) ঢাকার আইসিটি টাওয়ারে বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের অডিটোরিয়ামে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগ, এটুআই, ইউনেস্কো ও ইউএনডিপি বাংলাদেশের যৌথ আয়োজনে এ অনুষ্ঠানে র‍্যাম প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। এতে বিভিন্ন সরকারি মন্ত্রণালয়, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা, জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা সংস্থা, বেসরকারি খাত ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

প্রতিবেদনে এআই নিয়ে দেশের প্রাতিষ্ঠানিক, আইনগত, সামাজিক ও কারিগরি প্রস্তুতির সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ডিজিটাল সরকার ব্যবস্থায় বাংলাদেশ এরই মধ্যে সুদৃঢ় ভিত্তি গড়ে তুলেছে এবং সরকারি ডিজিটাল সেবার প্রতি নাগরিকদের আস্থার মাত্রাও উচ্চমানের। একই সঙ্গে ঢাকার বাইরে অনিয়মিত ইন্টারনেট সংযোগ ও বিদ্যুৎ সরবরাহ, লিঙ্গভিত্তিক ও শহর–গ্রামের দীর্ঘস্থায়ী ডিজিটাল বৈষম্য, উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটার অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা এবং তথ্য সুরক্ষা, সাইবার নিরাপত্তা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা–সংক্রান্ত দক্ষতা বৃদ্ধির ঘাটতির দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধান উপদেষ্টার আইসিটি, ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিষয়ক বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব বলেন, বাংলাদেশ এমন এক এআইনির্ভর যুগে প্রবেশ করছে যেখানে বর্তমানের সিদ্ধান্ত আগামী কয়েক দশক সমাজকে প্রভাবিত করবে। এ প্রতিবেদন স্পষ্টভাবে দেখায়, আমরা কোথায় আছি এবং কোন বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে, যা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের বিচারের বিকল্প না হয়ে সরকারি প্রতিষ্ঠানকে আরো শক্তিশালী করে এবং নাগরিকদের অধিকার সুরক্ষিত করে।

আইসিটি বিভাগের সচিব শীষ হায়দার চৌধুরী চলমান জাতীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নীতি প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় র‍্যাম প্রতিবেদনের গুরুত্ব উল্লেখ করে বলেন, নীতি নির্ধারণ হতে হবে প্রমাণনির্ভর। এ প্রতিবেদন স্পষ্ট বিধান প্রণয়ন, প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় জোরদার ও এমন সুরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে সহায়তা করবে, যাতে জনসেবায় ব্যবহৃত এআই ব্যবস্থা ব্যাখ্যাযোগ্য, জবাবদিহিমূলক এবং জাতীয় মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে।

বাংলাদেশে ইউনেস্কোর কান্ট্রি প্রতিনিধি ড. সুসান ভাইজ তার বক্তব্যে র‍্যাম প্রতিবেদনের ভূমিকাকে ‘‌একটি দর্পণ ও একটি রূপরেখা’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এটি একদিকে শাসনব্যবস্থা, অবকাঠামো, ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি ও তথ্যভিত্তিক ব্যবস্থার অগ্রগতি ও চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে; অন্যদিকে অগ্রাধিকারমূলক পদক্ষেপ নির্ধারণে দিকনির্দেশনা দেয়। তিনি তথ্য সুরক্ষা ও সাইবার নিরাপত্তা জোরদার করা, বাংলা ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষায় উচ্চমানের তথ্যভান্ডার তৈরি এবং কন্যাশিশু ও নারীদের এআই–সংক্রান্ত শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে পূর্ণ অংশগ্রহণ নিশ্চিতের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

ইউএনডিপি বাংলাদেশের আবাসিক প্রতিনিধি স্টেফান লিলার বলেন, এআই ব্যবধান কমাবে নাকি বাড়াবে তা নির্ভর করবে দেশগুলো এখন কী সিদ্ধান্ত নেয় তার ওপর। সংযোগ, দক্ষতা, ডেটা এবং কম্পিউটিং অবকাঠামো শক্তিশালী করা, নির্ভরযোগ্য নিয়ন্ত্রক ও শাসন কাঠামো তৈরি করা এবং জাতীয় সক্ষমতার সাথে এআই কৌশলগুলোকে খাপ খাইয়ে নেয়া এ সবকিছুই নির্ধারক ভূমিকা পালন করবে।

এটুআই প্রকল্পের পরিচালক মোহা. আবদুর রফিক বলেন, র‍্যাম প্রতিবেদনে উত্থাপিত সুপারিশগুলোকে নাগরিকমুখী সেবায় দৃশ্যমান উন্নতিতে রূপান্তর করতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক সুরক্ষা ও বিচার–ব্যবস্থার মতো খাতে বাস্তব সমস্যার কার্যকর সমাধান দিতে পারে। তবে এটি যেন কোনোভাবেই বিদ্যমান ডিজিটাল বৈষম্য বাড়িয়ে না তোলে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।

ইইউর বাংলাদেশ প্রতিনিধি দপ্তরের উন্নয়ন সহযোগিতা বিভাগের প্রধান মিখাল ক্রেজা বলেন, আমরা আশা করি এ প্রতিবেদন একটি আস্থাভিত্তিক এআই ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে সহায়ক হবে, যাতে উদ্ভাবনের সুফল তরুণ, নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীসহ সব নাগরিকের কাছে পৌঁছে যায়।