এসব পণ্য ছড়িয়ে পড়ছে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন বাজারে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর সীমান্তে কড়াকড়ি বাড়ানো হলেও থামেনি এসব পণ্যের অনানুষ্ঠানিক প্রবাহ, বরং বৈধ পথে পণ্য আমদানি কমার বিপরীতে চোরাচালানের বিপুল পরিমাণ পণ্য জব্দের তথ্য সামনে আসছে। এতে সরকার যেমন বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে, তেমনি দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্যও ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে দেশের বিভিন্ন সীমান্তে ১ হাজার ৩৩০ কোটি ৫৮ লাখ টাকা মূল্যের চোরাচালান পণ্য জব্দ করা হয়েছে। জানুয়ারিতে জব্দ হয়েছে ১৬২ কোটি ৫২ লাখ, ফেব্রুয়ারিতে ১৩১ কোটি ১৯ লাখ, মার্চে ১৬৫ কোটি ৭৬ লাখ, এপ্রিলে ১৮৩ কোটি ৫ লাখ, মে মাসে ১৭৭ কোটি ৭৮ লাখ, জুনে ৩০৭ কোটি ৬৫ লাখ এবং জুলাইয়ে ২০২ কোটি ৬৩ লাখ টাকার পণ্য। অর্থাৎ বছরের প্রথম পাঁচ মাসে প্রতি মাসে জব্দ হওয়া চোরাচালান পণ্যের মূল্য ছিল ১৩১-১৮৩ কোটি টাকার মধ্যে। জুনে তা এক লাফে ৩০৭ কোটি ৬৫ লাখ টাকায় ওঠে। জুলাইয়ে কিছুটা কমলেও জব্দের পরিমাণ ছিল ২০২ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। সাত মাসের হিসাবে গড়ে প্রতি মাসে প্রায় ১৯০ কোটি টাকার চোরাচালান পণ্য জব্দ করেছে সীমান্তরক্ষী বাহিনী। সংশ্লিষ্টদের মতে, অবশ্য জব্দের এ পরিমাণকে সীমান্ত দিয়ে মোট চোরাচালানের আকার হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ধরা পড়া পণ্যের হিসাব।
অন্যদিকে দেশের সামগ্রিক পণ্য আমদানি-রফতানিতেও মন্দার চিত্র পাওয়া যাচ্ছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় রফতানি কমেছে, পাশাপাশি কমেছে আমদানিও। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে রফতানি হয়েছিল ৩ হাজার ৭১৯ কোটি ১৩ লাখ ২০ হাজার ডলারের পণ্য। একই সময়ে আমদানি হয়েছিল ৫ হাজার ৪০ কোটি ১৭ লাখ ডলারের পণ্য। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে রফতানি নেমে এসেছে ৩ হাজার ৫৩৮ কোটি ৬৫ লাখ ডলারে এবং আমদানি হয়েছে ৪ হাজার ৮২০ কোটি ৯৮ লাখ ডলারের পণ্য। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রফতানি কমেছে প্রায় ১৮০ কোটি ডলার এবং আমদানি কমেছে প্রায় ২১৯ কোটি ডলার। ফলে বাণিজ্য ঘাটতিও কিছুটা কমেছে। তবে এর পেছনে বাণিজ্য সক্ষমতা বৃদ্ধির চেয়ে আমদানি-রফতানি উভয় ক্ষেত্রেই প্রবাহ কমে যাওয়ার বিষয়টিই বেশি দৃশ্যমান।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এ সমস্যা নতুন নয়। স্থলবন্দর দিয়ে পণ্য পরিবহনে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, কাস্টমস ও অন্যান্য সংস্থার আনুষ্ঠানিকতা, পণ্য খালাসে সময় এবং পরিবহন ব্যয় নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসায়ীদের অভিযোগ রয়েছে। এসব প্রতিবন্ধকতায় বৈধ বাণিজ্যের ব্যয় বাড়লে সীমান্তের দুই পাশের বাজারে অনানুষ্ঠানিক সরবরাহ ব্যবস্থার সুযোগ তৈরি হতে পারে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুই দেশের বাণিজ্যনীতিতেও পরিবর্তন এসেছে। ভারত ২০২৫ সালের মে মাসে বাংলাদেশ থেকে নির্দিষ্ট কিছু পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে স্থলবন্দর ব্যবহারে বিধিনিষেধ আরোপ করে। তৈরি পোশাকসহ কয়েকটি পণ্যের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সমুদ্রবন্দর ব্যবহারের শর্ত দেয়া হয়। আবার কিছু পণ্যের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের স্থলবন্দর দিয়ে প্রবেশেও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। এতে বৈধ বাণিজ্যের রুট ও পণ্য চলাচলের কাঠামোতে পরিবর্তন এসেছে।
সীমান্তবর্তী জেলা সাতক্ষীরায় নগদ লেনদেনের অস্বাভাবিক বৃদ্ধিও অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্যের আর্থিক প্রভাবের একটি ইঙ্গিত দিচ্ছে। বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের অধিকাংশ সীমান্ত জেলায় নগদ লেনদেন কমলেও সাতক্ষীরায় তা বেড়েছে ৩১ দশমিক ৮ শতাংশ। এ সময়ে জেলায় নগদ লেনদেনের পরিমাণ ১৪ হাজার ১৪৭ কোটি থেকে বেড়ে ১৮ হাজার ৬৪৩ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা এক বছরে বেড়েছে প্রায় ৪ হাজার ৪৯৬ কোটি টাকা। বিএফআইইউর বিশ্লেষণে এ ধরনের স্থানীয় বিচ্যুতি সীমান্তবর্তী এলাকায় লেনদেনের নতুন কেন্দ্র বা অনানুষ্ঠানিক আর্থিক কর্মকাণ্ডের হটস্পটের ইঙ্গিত দিতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। একই প্রতিবেদনে সাতক্ষীরাকে অবৈধ আন্তঃসীমান্ত অর্থপ্রবাহ ঠেকাতে বিশেষ নজরদারির প্রয়োজনীয় সীমান্ত জেলার তালিকায় রাখা হয়েছে। ফলে সীমান্ত দিয়ে পণ্যের অনানুষ্ঠানিক প্রবাহের পাশাপাশি নগদ অর্থের বাড়তি চলাচলও আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে বাণিজ্য পরিচালনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। তবে শুধু নগদ লেনদেন বৃদ্ধিকেই চোরাচালানের সরাসরি প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি সীমান্তবর্তী অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের একটি সম্ভাব্য সূচক।
অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্য দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি করছে বলে মনে করেন নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহি আকবর। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘বৈধ পথে আমদানির বাইরে যেসব পণ্য দেশের বাজারে আসে, সেগুলোই অবৈধ। এসব পণ্যের কোনো তথ্য সরকারের কাছে থাকে না। ফলে চোরাচালানের আড়ালে অস্ত্র ও গোলাবারুদও সহজেই দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশের সুযোগ পায়। এটি দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের হুমকি। একই সঙ্গে চোরাচালানের কারণে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে, যা বর্তমান প্রেক্ষাপটে অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে খুবই প্রয়োজন। তাই এ ধরনের অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্যের সম্প্রসারণ রোধ করতে হবে। সীমান্তের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সংস্থাগুলোকে আরো কঠোর ভূমিকা পালন করতে হবে। কারণ এ ধরনের চোরাচালান কোনো দেশের জন্যই সুফল বয়ে আনে না।’
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় কড়াকড়ি বাড়ানোর অন্যতম উদ্দেশ্য হলো চোরাচালান নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব সুরক্ষা এবং বৈধ আমদানি-রফতানিকারকদের স্বার্থ রক্ষা। কিন্তু বৈধ বাণিজ্যে অতিরিক্ত সময়, খরচ, নথিপত্রের জটিলতা কিংবা পণ্য চলাচলে বিধিনিষেধ তৈরি হলে ব্যবসায়ীদের একটি অংশ বিকল্প পথ খোঁজে। সীমান্ত এলাকার স্থানীয় অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়ে। একপর্যায়ে বৈধ বাণিজ্যের পাশাপাশি অনানুষ্ঠানিক লেনদেনের একটি সমান্তরাল ব্যবস্থা গড়ে ওঠার ঝুঁকি তৈরি হয়। ফলে চোরাচালান নিয়ন্ত্রণে শুধু সীমান্তে নজরদারি ও অভিযান বাড়ানো যথেষ্ট নয়। বৈধ বাণিজ্যকে দ্রুত, সহজ ও কম ব্যয়বহুল করার পাশাপাশি সীমান্ত এলাকার মানুষের বৈধ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ বাড়াতে হবে। তা না হলে চাহিদা ও সরবরাহের যে ব্যবধান তৈরি হয়, সেটি পূরণ করতে অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্যের পথ সক্রিয় হওয়ার সুযোগ থেকে যায়।
সীমান্তে কড়াকড়ি বাড়ালেই চোরাচালান বন্ধ করা সম্ভব নয় বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেজাউল করিম সোহাগ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদারের পাশাপাশি বৈধ বাণিজ্যের পথও সহজ করতে হবে। বৈধভাবে পণ্য আমদানি-রফতানির ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সময়, উচ্চ ব্যয়, পরিবহন জটিলতা ও নথিপত্রের দীর্ঘ প্রক্রিয়া থাকলে ব্যবসায়ীদের একটি অংশ বিকল্প পথ খুঁজতে পারে। এতে সীমান্তে অনানুষ্ঠানিক সরবরাহ ব্যবস্থার সুযোগ তৈরি হয়। তার মতে, চোরাচালান নিয়ন্ত্রণে শুধু নজরদারি ও অভিযান বাড়ানোর পাশাপাশি স্থলবন্দরগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো, পণ্য খালাসের সময় কমানো এবং বৈধ বাণিজ্যের প্রক্রিয়া সহজ করা জরুরি। একই সঙ্গে সীমান্ত এলাকার মানুষের বৈধ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ বাড়ানো গেলে চোরাচালানের ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব।’
চোরাচালান প্রতিরোধে সীমান্তে গোয়েন্দা তৎপরতা, সার্বক্ষণিক টহল ও বিশেষ অভিযান জোরদারের পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিজিবি সদর দপ্তরের পরিচালক (অপারেশন) লে. কর্নেল মাহবুব মুর্শেদ রহমান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘স্মার্ট বর্ডার ম্যানেজমেন্টের আওতায় সিসিটিভি, থার্মাল ইমেজিং, নাইট ভিশন ও ড্রোন প্রযুক্তি ব্যবহার করে সীমান্তের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোয় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। মাদক, অস্ত্র, স্বর্ণ ও প্রত্নসম্পদসহ সব ধরনের পণ্যের চোরাচালান প্রতিরোধে স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে তথ্যভিত্তিক অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি সীমান্তবর্তী অপরাধপ্রবণ জনগোষ্ঠীর জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে চোরাচালানের সামাজিক ভিত্তি দুর্বল করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। দেশের সার্বভৌমত্ব ও সীমান্তের নিরাপত্তা রক্ষায় চোরাচালানের বিরুদ্ধে বিজিবির এ বহুমুখী কার্যক্রম ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।’










