বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার কলসকাঠি ইউনিয়নের বেবাজ গ্রামে গান্ধী সেবাশ্রম ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। প্রায় সাড়ে ১২ একর জায়গা নিয়ে ১৯৪৬ সালে গড়ে ওঠা এ গান্ধী আশ্রমে বর্তমানে নেই কোনো কার্যক্রম। সরকারি-বেসরকারি ও স্থানীয় পর্যায়ে দেখভালের অভাব এবং কমিটি নিয়ে দ্বন্দ্বে গান্ধী আশ্রমটি অনেকটা পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে।
এলাকাবাসী সূত্রে জানা যায়, ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশবিরোধী অহিংস আন্দোলনের প্রবক্তা মহাত্মা গান্ধীর নামে ৭৬ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত হয় আশ্রমটি। স্থানীয় গান্ধীবাদী নেতা সতীন্দ্রনাথ সেন, বিনোদ কাঞ্জিলালসহ কয়েকজনের উদ্যোগে আশ্রমটি প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৪৬ সালে আশ্রমটি প্রতিষ্ঠার পর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মহাত্মা গান্ধীর ভাইয়ের ছেলে কানু গান্ধী ও তার স্ত্রী আভা গান্ধী।
আরো জানা যায়, বাকেরগঞ্জ উপজেলার বেবাজ গ্রামে প্রথমে ছয় একর জায়গায় আশ্রমটি প্রতিষ্ঠিত হয়। কয়েক বছর পর তত্কালীন সম্পাদক রাম চট্টোপাধ্যায় আশ্রমের জন্য আরো সাড়ে ছয় একর জমি দান করেন। বর্তমানে আশ্রমের জমিতে চারটি পুকুর ও একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকলেও কোনো দৈনন্দিন কার্যক্রম নেই।
স্থানীয়রা জানায়, আগে আশ্রমটির নাম ছিল ‘গান্ধী সেবাশ্রম’। এখানে একটি গ্রন্থাগার, বিনামূল্যে চিকিৎসা কেন্দ্র, মৌমাছি পালন, চরকায় সুতা কাটা, বনায়নসহ বহু জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম ছিল। আশ্রমের উদ্যোগে রাস্তাঘাট উন্নয়ন, বালিকা বিদ্যালয় পুনর্গঠনসহ স্থানীয় দরিদ্রদের সহায়তা দেয়া হতো। মূলত স্বদেশী ভাবনায় পল্লী সমাজ পুনর্গঠনে এ আশ্রম গড়ে উঠেছিল। বর্তমানে বহু পুরনো একটি টিনের ঘর ও একটি একচালা টিনশেডে অর্ধপাকা ঘর অসম্পূর্ণ
অবস্থায় রয়েছে। এখানে গান্ধীজির একটি ভাস্কর্য নির্মাণ করা হলেও এটি স্থাপন করা হয়নি।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ১৯৫৫ সালে আশ্রমের অন্যতম উদ্যোক্তা সতীন্দ্রনাথ সেন মারা গেলে তার অনুসারীদের উদ্যোগে গান্ধী সেবাশ্রম নাম বদলে সতীন্দ্র স্মৃতি গান্ধী আশ্রম নামকরণ করা হয়। আশ্রমের মধ্যেই প্রতিষ্ঠাতা বিনোদ কাঞ্জিলাল, উদ্যোক্তা সতীন্দ্রনাথ সেন ও রাম চট্টোপাধ্যায়ের সমাধি এবং সমাধিস্মারক রয়েছে।
১৯৭১ সালে আশ্রমের একটি কাঠের ঘর কাগজপত্রসহ পুড়িয়ে দেয় পাকিস্তানি সেনারা। এছাড়া আশ্রমসংলগ্ন বিভিন্ন স্থান থেকে ধরে এনে আশ্রমের বেশ কয়েকজন সদস্যকে হত্যা করা হয়। আশ্রমের সম্পাদক শ্যামলাল হালদারের ছেলে অমৃত হালদারও পাকিস্তানি আর্মির গণহত্যার শিকার হন। পরে ১৯৭২ সালে আশ্রমের উদ্যোগে অমৃত স্মৃতি প্রাথমিক বিদ্যালয় গড়ে তোলা হয়েছে। বর্তমানে এটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়েছে।
বর্তমান গান্ধী আশ্রমের সাধারণ সম্পাদক দাবিদার স্থানীয় বাসিন্দা চন্দ্র নাথ চক্রবর্তী বলেন, ‘আমরা
২০২১ সালে একটি রেজল্যুশন করে বরিশাল সমাজসেবা কার্যালয় থেকে কমিটির অনুমোদন পেয়েছি। সেই কমিটির সভাপতি মনিরুজ্জামান। আমরা ২০২১ সাল থেকে আশ্রমের কার্যক্রম পরিচালনা করতে গেলে আমাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন স্বঘোষিত কমিটিতে থাকা সাধারণ সম্পাদক
প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরের বরিশাল শহরের কাউনিয়ার বাসিন্দা তপঙ্কর চক্রবর্তী আদালতে দুটি মামলা করেন, যা এখনো চলমান। গান্ধী আশ্রমে ২০০৫ সালে তত্কালীন সংসদ সদস্য পারভীন তালুকদার হাসপাতালের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। এখানে একটি হাসপাতাল গড়ে তোলার লক্ষ্যে নানা উদ্যোগ নেয়া হলেও সরকারি সহায়তার অভাবে তা বাস্তবে রূপ নেয়নি।’
তিনি আরো জানান, ১৯৯৬ সাল থেকে নামে মাত্র থাকা স্বঘোষিত কমিটির লোকজন আশ্রমটিকে লুটপাটের ক্ষেত্রে পরিণত করেছেন। উন্নয়নকাজের নামে আশ্রমে থাকা গাছ বিক্রি করে ১০-১২ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছেন।
এ বিষয়ে তপঙ্কর চক্রবর্তী জানান, ‘১৯৯৬
সাল থেকে রেজল্যুশনের মাধ্যমে গান্ধী আশ্রমের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে আছি। আলাউদ্দিন হাওলাদার নামের এক ব্যক্তি দীর্ঘদিন গান্ধী আশ্রমের সদস্য ছিলেন। মূলত আশ্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কেউ মারা গেলে তার পরিবার থেকে একজন আশ্রমে নেয়া হয়, কিন্তু আলাউদ্দিন হাওলাদার মৃত্যুর আগেই তার ছেলে মনিরুজ্জামান সভাপতি দাবি করে আসছেন। মনিরুজ্জামান বরিশাল সমাজসেবা কার্যালয় থেকে টাকার বিনিময়ে কমিটির অনুমোদন করিয়েছেন।’
আশ্রম থেকে গাছ বিক্রির বিষয়ে তপঙ্কর চক্রবর্তী বলেন, ‘আমার
জানা মতে একবার ৮০ হাজার টাকার গাছ বিক্রি করা হয়েছে। তবে সেই টাকা আশ্রমের নতুন ভবন নির্মাণকাজে লাগানো হয়েছে। এখন পর্যন্ত ভবন নির্মাণকাজ শেষ হয়নি।’
এ বিষয়ে বাকেরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সজল চন্দ্র শীল জানান, দুই গ্রুপের কমিটি নিয়ে দ্বন্দ্বে গান্ধী আশ্রমের উন্নয়ন দীর্ঘদিন বন্ধ রয়েছে। আশ্রমের জমির ধান ও পুকুরের মাছ বিক্রি করে উপজেলা কোষাগারে জমা দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। জমাকৃত টাকা দিয়ে আশ্রমের সংস্কারকাজ হবে। এছাড়া আশ্রমটি সরকারি তত্ত্বাবধানে নিয়ে আসার জন্য চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।










