রাজশাহীতে সকাল-সন্ধ্যা শীতের কিছুটা প্রভাব এখনো রয়ে গেছে। দুপুরে গরম আর রাতে হালকা শীত। ঠাণ্ডা-গরমে সর্দি-জ্বরে আক্রান্ত হচ্ছে সব বয়সের মানুষ। তাদের বেশির ভাগই শিশু। শীত বা গ্রীষ্মে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে রোগীর চাপ বেশি থাকে। এ বছরও একই চিত্র। হাসপাতালের নির্ধারিত তিনটি শিশু ওয়ার্ডে ১৫০টি শয্যা থাকলেও ভর্তি রোগী প্রায় ৫০০। হঠাৎ করে রোগী বেড়ে যাওয়া হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসকও।
গতকাল রামেক হাসপাতালে গিয়ে দেখা গেছে, ১০ নম্বর শিশু ওয়ার্ডে ৩৪টি শয্যার বিপরীতে ভর্তি আছে প্রায় ২৫০টি শিশু। ওয়ার্ডের বারান্দায়ও শিশুদের ভর্তি করিয়ে চিকিৎসা দিতে দেখা গেছে। এছাড়া হাসপাতালের ৬০টি ওয়ার্ডের ১ হাজার ২০০ শয্যার বিপরীতে রোগী ভর্তি ছিল ২ হাজার ৭৮১ জন। চিকিৎসকরা জানান, প্রতিদিন গড়ে যে সংখ্যক রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরছে, তার চেয়ে দুই থেকে তিন গুণ হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে।
এদিকে ১৩ ও ১৭ ফেব্রুয়ারি রামেক হাসপাতালে দুই শিশুর মৃত্যুর পর থেকে আতঙ্কে রয়েছেন অভিভাবক। অজ্ঞাত রোগে মারা গিয়েছিল তারা। যদিও মৃত্যুর কারণ এখন পর্যন্ত নির্ণয় করতে পারেনি স্বাস্থ্য বিভাগ। বাবা-মাসহ মৃত শিশুদের রোগের নমুনা সংগ্রহ করা হলেও রোগ নির্ণয়ে আরো ১০-১৫ দিন লাগতে পারে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।
রামেক হাসপাতালের চিকিৎসকরা বলছেন, ঋতু পরিবর্তনের কারণে বিভিন্ন বয়সের মানুষ সর্দি জ্বরে আক্রান্ত হচ্ছে। যাদের ইমিউনিটি কম, বিশেষ করে শিশুরা এ সময় বেশি জ্বর-সর্দিজনিত রোগে আক্রান্ত হয়। সম্প্রতি এমন রোগে বিভিন্ন ধরনের অ্যান্টিবায়োটিকও রোগীর শরীরে কাজ করছে না। তাছাড়া আরেকটি বড় সমস্যা, সামান্য জ্বর-সর্দিতেই আক্রান্ত শিশুর নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) প্রয়োজন পড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে অভিভাবকের পাশাপাশি চিকিৎসরাও বেশ দুশ্চিন্তায়।
জানতে চাইলে রামেক হাসপাতালের শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. শাহিদা ইয়াসমিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নতুন নতুন ভাইরাস তো আসতেই পারে। কভিড তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। এছাড়া পুরনো ভাইরাস তার রূপ পরিবর্তন করছে। নিউমোনিয়াসহ শ্বাসতন্ত্রের প্রদাহ ও হেপাটাইটিসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। কভিডের আগে এমন রোগীর সংখ্যা একদিকে যেমন কম ছিল, তেমনি এসব রোগীর সিভিআর বা গুরুতর হওয়ার হারও কম ছিল। তবে এখন সামান্য জ্বরে আক্রান্ত শিশুদেরও আইসিইউ লাগছে।’
অ্যান্টিবায়োটিক তার কার্যকারিতা হারাচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘অ্যান্টিবায়োটিক একটা বড় কারণ। এসব ওষুধের ড্রাগ রেজিট্যান্স হয়ে যাচ্ছে। কিছু কিছু অ্যান্টিবায়োটিক একেবারেই কাজ করছে না। একটা অ্যান্টিবায়োটিক যখন ড্রাগ রেজিট্যান্স হয়ে পড়ছে, তখন হায়ার অ্যান্টিবায়োটিকে যেতে হচ্ছে। আমাদের হাতে আর কতটিইবা অ্যান্টিবায়োটিক আছে। দেশে এর সংখ্যাও সীমিত। এসব আমাদের মতো চিকিৎসকদের ভাবিয়ে তুলছে।’
রামেকের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. খন্দকার মো. ফয়সল আলম বলেন, ‘বর্তমানে শিশুদের মধ্যে নিউমোনিয়া, টাইফয়েড, ডায়রিয়া ও জন্ডিসের মতো রোগের প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। আক্রান্তের হার বৃদ্ধি পেলেও মৃত্যুহার কম। শিশু মারা যাওয়ার পর তাদের মৃত্যুর কারণ এখনো শনাক্ত করা যায়নি। তাদের মৃত্যুর কারণ যদি ভাইরাস হয়ে থাকে, তবে তা চিহ্নিত করাটা জরুরি। পুরনো ভাইরাসে তাদের মারা যাওয়ার কারণ হতে পারে না। তাছাড়া এটা যদি ছোঁয়াচে হয়, তবে তা হবে আরো দুশ্চিন্তার কারণ। একেকটি ভাইরাসের জন্য একেক ধরনের স্যাম্পল পরীক্ষা করতে হয়। পরীক্ষায় বেশির ভাগ টাইফয়েড ধরা পড়ছে। কভিডের নতুন ধরন শনাক্তে দেশে তেমন কোনো ব্যবস্থা নেই। এসব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সিডিসি কাজ করে।’
রোগের প্রধান কারণ পানি ও বাতাস বলেও জানান এ চিকিৎসক। তিনি বলেন, ‘নিউমোনিয়া বাতাস থেকে বিস্তার লাভ করে। জন্ডিস ও টাইফয়েড পানিবাহিত রোগ। ওয়াসার সুয়ারেজের পানি লিক করছে কিনা, তাছাড়া বোতলজাত পানি নিয়েও সন্দেহ রয়েছে। আমরা ওয়াসাকে বিষয়গুলো দেখতে অনুরোধ করেছি।’
এ প্রসঙ্গে রামেকের প্রিন্সিপাল অধ্যাপক ডা. নওশাদ আলী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রোগের ধরন বদলাচ্ছে। আক্রান্তকারী জীবাণুও পরিবর্তন হচ্ছে। কভিড, ডেঙ্গু ও নিপা—এগুলো ভাইরাসজনিত রোগ। সম্প্রতি রামেকে দুই শিশু মারা গেছে। আমরা ভেবেছিলাম তারা নিপা ভাইরাসে মারা গেছে। পরে দেখা গেল নিপা নয়। তাদের মৃত্যু আমাদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি করেছে। একটা রোগের ধরন জানা থাকলে আমাদের চিকিৎসা দিতে সুবিধা হয়। এখন যেকোনো জ্বর হলেই সতর্ক হতে হবে। এখন তো সামান্য জ্বর-সর্দি বা খিঁচুনি নিয়ে শিশুরা ভর্তি হলেও আমরা ভয় পেয়ে যাচ্ছি। সতর্কতার সঙ্গে রোগীকে চিকিৎসা দিচ্ছি। এমন কেস হতে থাকলে আমাদের পৃথক প্রস্তুতি নিতেই হবে। এজন্য অবশ্যই পৃথক গবেষণা করতে হবে।’










