পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটিতে অনুমোদন ছাড়াই গড়ে ওঠা তিনটি ইটভাটা বন্ধ করে দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। বুধবার ও বৃহস্পতিবার জেলার বাঘাইছড়ি ও কাপ্তাই উপজেলায় তিনটি অবৈধ ইটভাটা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। তবে গত বছরও ওই তিনটি ভাটা বন্ধ করে দিয়েছিল প্রশাসন। এক বছরের মাথায় একই ইটভাটা ফের বন্ধ করল প্রশাসন। অভিযোগ রয়েছে, বর্ষা মৌসুমে ইটভাটায় ইট প্রস্তুত মূলত বন্ধ থাকে। দুই দিনে বন্ধ করে দেয়া এসব ভাটা এর আগেও বন্ধ করে প্রশাসন। কিন্তু বন্ধের কয়েকদিন পর  আবারো ইটভাটা চালু করেন মালিকরা। ফলে প্রশাসনে অভিযান ও মালিকদের ভাটা চালু যেন ‘ইঁদুর-বিড়াল’ খেলায় পরিণত হয়েছে।

ভ্রাম্যমাণ আদালত সূত্রে জানা গেছে, ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন ২০১৩-এর ৪ ধারা লঙ্ঘনের দায়ে বুধবার (২১ জুন) বিকালে রাঙ্গামাটির কাপ্তাই উপজেলার রাইখালী ইউনিয়নের ভালুকিয়ার একটি ইটভাটা কর্তৃপক্ষকে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। একই সঙ্গে ইটভাটাটি উচ্চ আদালতের নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে বন্ধ ঘোষণা করে নোটিস জারি করা হয়েছে।

কাপ্তাই উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মারজাইন হোসাইন জানান, মহামান্য হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করায় সংশ্লিষ্ট ইটভাটা কর্তৃপক্ষকে জরিমানা করা হয়েছে। এছাড়া ইটভাটাটি বন্ধে নোটিস জারি করা হয়েছে। গত বছরের ১৩ ফেব্রুয়ারি ভাটাটিকে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা ও বন্ধ করেছিলেন জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট লাইলাতুল হোসেন।

এদিকে বৃহস্পতিবার (২২ জুন) সকালে বাঘাইছড়ি উপজেলা সদরে অবস্থিত কেবিএম ও এমএমসি নামের দুটি ইটভাটা বন্ধ করে দিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। ইটভাটা দুটিতে আগে থেকেই ইট প্রস্তুত বন্ধ থাকায় জরিমানা করেননি ভ্রাম্যমাণ আদালত।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রুমানা আক্তার বলেন, ‘বাঘাইছড়িতে নাহিদ-উল আলমের মালিকানাধীন কেবিএম ও আবুল কাসেমের মালিকানা এমএমসি নামে দুটি ইটভাটা হাইকোর্টের রিটের পরিপ্রেক্ষিতে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। বাঘাইছড়ি উপজেলায় দুটি ইটভাটা ছিল। ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে দুটি ইটভাটাই বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। ’

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বাঘাইছড়িতে বৃহস্পতিবার (২২ জুন) কেবিএম ও এমএমসি নামে বন্ধ করে দেয়া দুটি ইটভাটা মালিককে ২০২২ সালের ১২ ফেব্রুয়ারিতে ২০ হাজার টাকা করে ৪০ হাজার টাকা জরিমানা করেন তৎকালীন ইউএনও শরিফুল ইসলাম। একই সঙ্গে পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত ইটভাটা দুটির সব কার্যক্রম বন্ধ রাখার নির্দেশনা দেয়া হয়। কিন্তু বন্ধের কিছুদিন পরই ভাটা দুটি ফের চালু করে ইট পোড়ানো হয়।

অভিযোগ রয়েছে, এর আগেও বিভিন্ন সময় রাঙ্গামাটির বিভিন্ন ইটভাটা ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান চালিয়ে প্রশাসন বন্ধ করে দিলেও পরবর্তী সময়ে আবার চালু করা হয়। কার্যত ইট প্রস্তুত বন্ধ মৌসুমে ভাটা বন্ধ করে দিলেও কয়েকদিন পর আবারো ভাটা চালু করেন মালিকরা।

স্থানীয়রা জানান, মূলত বর্ষা মৌসুম এলে ইট ভাটাগুলোয় কার্যক্রম বন্ধ রাখেন মালিকরা। এ সময় বাতাস ও বৃষ্টিপাতের কারণে ইট পোড়ানোর কাজ ব্যাহত হয়। যে কারণে বর্ষা এলেই কার্যত ইট প্রস্তুত বন্ধ রাখা হয়। বর্ষার আগে প্রশাসন ইট ভাটা বন্ধ করলেও শুকনো মৌসুমে আবার শুরু হয় ইট প্রস্তুত। আবার এসব ইটভাটায় ইট পোড়াতে ব্যবহার করা হয় বনের কাঠ। যে কারণে একদিকে বনের গাছ উজাড় ও অন্যদিকে ভাটার কালো ধোঁয়া দূষিত করে আসছে পরিবেশ ও প্রতিবেশ।

জানতে চাইলে রাঙ্গামাটির অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ বলেন, ‘হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী রাঙ্গামাটি জেলায় যতগুলো অবৈধ ইটভাটা রয়েছে আমরা সব বন্ধের নির্দেশনা দিয়েছি। আগে থেকেই ইউএনওদের বলা ছিল, গত ২০ জুন আবার বলা হয়েছে যেসব ইটভাটা চালু রয়েছে সেগুলো চেক করে বন্ধে করে দেয়ার জন্য। ইটভাটা বন্ধের কার্যক্রম চলছে। যেসব উপজেলায় ইটভাটা রয়েছে সেখানে ধাপে ধাপে সব বন্ধ করে দেয়া হবে।’ তবে জেলায় মোট কতটি ইটভাটা রয়েছে এমন কোনো তথ্য দিতে পারেননি তিনি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০২২ সালের ২৫ জানুয়ারি খাগড়াছড়ি, বান্দরবান ও রাঙ্গামাটির সব অবৈধ ইটভাটা সাতদিনের মধ্যে বন্ধের নির্দেশ দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে দুই সপ্তাহের মধ্যে আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়ন করে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলেছিলেন আদালত। তারই ধারাবাহিকতায় ২৩ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্টের নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে খাগড়াছড়ি, বান্দরবান ও রাঙ্গামাটির ২০ উপজেলায় ৬৪টি অবৈধ ইটভাটা বন্ধের প্রতিবেদন দাখিল করেন সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকরা।

স্থানীয়ভাবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলায় বন্ধ করে দেয়া সেই দুটি ইটভাটা আবারো চালু করা হয়। লংগদু উপজেলায় তিনটি ইট ভাটা বন্ধ করলেও সেই তিনটি ভাটাসহ বর্তমান ভাটার সংখ্যা পাঁচটি। কাপ্তাই উপজেলার ভালুকিয়ার ভাটাটিও আগে বন্ধ করে দেয়ার পর ফের চালু করা হয়েছে। একই চিত্র রাজস্থলী ও কাউখালী উপজেলায়। পরিবেশকর্মীরা বলছেন, বন্ধ মৌসুমে ভাটা বন্ধ করে দিলে ভাটা মালিকদের তেমন ক্ষতি নেই। আবার ইট প্রস্তুত মৌসুমে তারা ভাটাগুলো চালু করে ফেলে। এক্ষেত্রে প্রশাসন নজরদারিতে গাফিলতি থাকায় ফের একই ভাটা চালু করছে মালিকরা।

আগে থেকে বন্ধ করে দেয়া ইটভাটা নতুন করে বন্ধের নির্দেশনার বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাঘাইছড়িতে ইটভাটা দুটি আগে বন্ধের কথা আপনার থেকে শুনেছি। এ বিষয়ে অবশ্যই আরো এলার্ট (সতর্ক) থাকতে বলব। আপনাদেরও সহযোগিতা প্রয়োজন।’