বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষে গড়ে ওঠা সুন্দরবনের প্রতি মানুষের আকর্ষণ দিন দিন বাড়ছে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপার লীলাভূমি পৃথিবীর বৃহত্তম এ ম্যানগ্রোভ বনে প্রতি বছরই বাড়ছে দেশী-বিদেশী পর্যটক। ২০২১-২২ অর্থবছরে সুন্দরবন ভ্রমণ করেন ১ লাখ ৪৯ হাজার ৪১৫ পর্যটক। তাদের কাছ থেকে আদায়কৃত মোট রাজস্বের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১২ কোটি ৩৭ লাখ ৯৯ হাজার টাকা। তবে এ পরিমাণ রাজস্বের বিনিময়ে সুন্দরবনকে যে মাশুল গুনতে হচ্ছে তার পরিমাণটাও কম নয়। বিশেষ করে প্লাস্টিক বর্জ্যের দূষণের কারণে বড় ক্ষতি হচ্ছে বনের। এ বিষয়ে এখনই নজর দেয়া না হলে ভবিষ্যতে বিপর্যয় দেখা দিতে পারে বলে মনে করেন পরিবেশবিদরা।

পর্যটকদের অনেকেই বিভিন্ন ধরনের প্লাস্টিকের প্যাকেট, প্লেট, পানির বোতল, চায়ের কাপ ব্যবহারের পর সেগুলো যেখানে সেখানে ফেলে যায়। অপচনশীল এসব প্লাস্টিক নদী-খালের পলিমাটিতে আটকে সুন্দরবনের উদ্ভিদ ও তৃণরাজির শ্বসনপ্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করছে।

পরিবেশকর্মীরা বলছেন, রাজস্ব আদায় বাড়াতে গিয়ে বনের প্রাকৃতিক সম্পদ উজাড় করা হচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে বন রক্ষায় নানা উদ্যোগের কথা বলা হলেও বাস্তবে তার কার্যকারিতা পরিলক্ষিত হচ্ছে না।

এ বিষয়ে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন উপমন্ত্রী বেগম হাবিবুন নাহার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বনের প্রতিটি পয়েন্টে তো আর লোক দিতে পারি না। সীমিত লোকবল ও জলযান নিয়ে সুন্দরবন সুরক্ষার চেষ্টা করা হচ্ছে। দূষণ রোধে বন বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছে। তবে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি না হলে এসব থেকে কাউকে নিবৃত করা সম্ভব নয়। সুন্দরবন জনগণের সম্পদ। জনগণকেই এটি রক্ষা করতে হবে।’

মানুষের আগ্রহ বাড়ায় এ অঞ্চলে বেসরকারি পর্যায়ে পর্যটন ব্যবসার পরিধিও বাড়ছে। সাধারণত তিন থেকে পাঁচদিনের প্যাকেজ ট্যুরে আসে পর্যটকরা। ছোট-বড়, সাধারণ ও অত্যাধুনিক লঞ্চযোগে বিভিন্ন স্পট ঘুরে দেখে তারা। রাতে অবস্থানের জন্য রেস্ট হাউজের সুবিধা একেবারেই কম থাকায় ঘুরতে আসা লোকজনকে লঞ্চেই থাকতে হয়। দিনের বেলায় নির্ধারিত স্থানগুলো তাদের ঘুরিয়ে দেখানো হয়।

ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব সুন্দরবনের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল আযম ডেভিড বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রতি বছর পর্যটক বাড়ছে। বনের মধ্যে পর্যটক কী করতে পারবে, কী করতে পারবে না, সে বিষয়ে ট্যুর গাইডরা নির্দেশনা দিয়ে থাকে।’ সব পর্যটক বা ট্যুর কোম্পানিগুলো দূষণের বিষয়ে এখনো সেভাবে সচেতন নয়—বিষয়টি স্বীকার করে বন বিভাগকে আরো সতর্কতা অবলম্বন এবং কঠোর হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

শিবসা নদীর একটি বড় অংশই গেছে সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে। দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে এ নদীতে মাছ ও কাঁকড়া ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন নওশের আলী গাজী। সারা বছরই বনসংলগ্ন নদীতে মাছ-কাঁকড়া ধরেন তিনি। ভৌগোলিক কারণেই বংশপরম্পরায় তারা বনের ওপর নির্ভরশীল। নওশের বলেন, ‘সুন্দরবনের প্রতি আমাদের মমতা থাকলেও পর্যটকরা বিভিন্ন ধরনের প্লাস্টিক বনে ফেলে যায়। প্রায়ই নদীতে ভেসে থাকতে দেখা যায় প্লাস্টিকের প্যাকেট, পানির বোতল। জেলেদের জালেও এখন এগুলো ভেসে আসে, যা কয়েক বছর আগেও এমন মাত্রায় দেখা যেত না।’

বন বিভাগের তথ্যানুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে সুন্দরবন ভ্রমণ করেছে ১ লাখ ৪৬ হাজার ১৯০ জন। এর মধ্যে বিদেশী ছিল ৩৯০ জন। ২০২১-২২ অর্থবছরে ভ্রমণ করেছে ১ লাখ ৪৯ হাজার ৪১৫ জন। এর মধ্যে বিদেশী ১ হাজার ১০৩ জন। ২০২২-২৩ অর্থবছরে সুন্দরবন ভ্রমণ করেছেন ২ লাখ ১৭ হাজার ১৬৯ জন। এর মধ্যে বিদেশী ছিলেন ২ হাজার ২৭৪ জন। পর্যটকের সংখ্যা বাড়ায় রাজস্ব আদায়ও বেড়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগ থেকে রাজস্ব আদায় হয়েছে ৪ কোটি ৩ লাখ ৪৯ হাজার টাকা। আর পূর্ব বন বিভাগ থেকে আদায়কৃত রাজস্বের পরিমাণ ৫ কোটি ৪৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরে সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগ রাজস্ব আদায় করেছে পাঁচ কোটি ৪৪ লাখ ৭৬ হাজার টাকা। আর পূর্ব বন বিভাগ আদায় করেছে ৬ কোটি ৯৩ লাখ ২৩ হাজার টাকা। অর্থাৎ ২০২১-২২ অর্থবছরে সুন্দরবনে পর্যটকের কাছ থেকে আদায়কৃত মোট রাজস্বের পরিমাণ ১২ কোটি ৩৭ লাখ ৯৯ হাজার টাকা। তবে রাজস্বের বিপরীতে বনে দূষণের মাত্রা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে পরিবেশবিদদের।

সুন্দরবন নিয়ে দীর্ঘ সময় গবেষণা করছেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরী। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘পর্যটকদের ব্যবহৃত অপচনশীল প্লাস্টিক বর্জ্যের ভারে হুমকিতে পড়েছে সুন্দরবনের প্রাণ-প্রকৃতি। যারা পর্যটক হিসেবে যান, তারা সেখানকার প্রতিবেশ রক্ষার সাধারণ নিয়মগুলো মানেন না। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই প্লাস্টিকের বোতল ও পলিথিনের প্যাকেট বনে ফেলে আসে। যা জীববৈচিত্র্যের জন্য ক্ষতিকর। এসব নিয়ন্ত্রণে বন বিভাগের কোনো উদ্যোগ দেখি না। এজন্য সরকারের উচিত বনের মধ্যে টহল বসানো এবং পর্যটকদের এসব থেকে নিবৃত রাখা।’

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মাহমুদ হোসেন জানান, সুন্দরবনের পানি ও মাটিতে প্লাস্টিক পার্টিক্যালের উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে। তবে করমজল ও সুতারখালী জনপদসংলগ্ন পানিতে ভারি ধাতুর উপস্থিতির তুলনায় দক্ষিণে সুন্দরবনের সৈকতের কাছের এলাকার পানিতে এর পরিমাণ বেশি। বনতীরবর্তী নদীতেও ভেসে থাকতে দেখা গেছে বিভিন্ন ধরনের প্লাস্টিক। এগুলো এখানকার উদ্ভিদ ও প্রাণীর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। এ বিষয়ে এখনই নজর দেয়া না হলে বনের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ  চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।

সুন্দরবন উপকূলীয় মোংলা উপজেলার বাসিন্দা বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) যুগ্ম সম্পাদক নূর আলম শেখ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সুন্দরবন ও উপকূলীয় এলাকায় এখন প্লাস্টিক পড়ে থাকছে। বনের বিভিন্ন প্রান্ত এবং আশপাশের এলাকা ঘুরে পর্যটকদের একবার ব্যবহৃত খাবারের প্যাকেট, পানির বোতল, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে থাকতে দেখা যায়। স্থানীয় দোকানদাররাও প্লাস্টিক পণ্য ব্যবহার করছেন। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বনের স্থলজ ও জলজ প্রাণীদের জীবনচক্রে।’

নূর আলম শেখ বলেন, ‘সম্প্রতি ব্রাজিলের তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশের দুটি বিশ্ববিদ্যালয় এবং বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের ফুড সেফটি অ্যান্ড কোয়ালিটি ডিভিশন একটি যৌথ গবেষণা “‍সায়েন্স অব দ্য টোটাল এনভায়রনমেন্ট” জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণায় সুন্দরবনসংলগ্ন প্রধান তিন নদী এবং মোংলার অন্তত ১৭ প্রজাতির মাছ, তিন প্রজাতির শেলফিশে মাইক্রো প্লাস্টিকের উপস্থিতি মিলেছে। বনের জীববৈচিত্র্যের জন্য এটি উদ্বেগজনক।’

সুন্দরবন খুলনা সার্কেলের বন সংরক্ষক মিহির কুমার দে বলেন, ‘বনে দূষণ রোধে বন বিভাগ কাজ করে যাচ্ছে। ট্যুর অপারেটরদের মাধ্যমে পর্যটকদের সচেতন করা হচ্ছে। পর্যটক বাড়ায় এবং বনের জীববৈচিত্র্য ও সার্বিক পরিবেশ সুরক্ষায় খুলনা রেঞ্জের শেখেরটেক ও কালাবগী, শরণখোলা রেঞ্জের আলীবান্ধা ও চাঁদপাই রেঞ্জের আন্ধারমানিকে নতুন চারটি পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে। এতে পর্যটকরা এক জায়গায় ভিড় না করে বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখার সুযোগ পাবে।’