ঢাকার অভিজাত এলাকা গুলশান। স্বল্পবসতির এ এলাকায় ২০ জনের শরীরে নভেল করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। অথচ হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সংলগ্ন ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা আশকোনায় উঠে এসেছে বিপরীত চিত্র। প্রবাসী ও তাদের স্বজনদের যাতায়াত থাকা এ এলাকাটিতে মাত্র একজনের শরীরে এ ভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। শুধু আশকোনাতেই নয়, দেশে কভিড-১৯ শনাক্ত হওয়ার ৪৮তম দিন পর্যন্ত ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ ৪২টি এলাকায় একজন করে কভিড-১৯ আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছে। পরীক্ষার সুযোগ অপেক্ষাকৃত কম পাওয়ায় এসব এলাকায় আক্রান্তের প্রকৃত তথ্য উঠে আসছে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

দেশে সর্বপ্রথম গত ৮ মার্চ কভিড-১৯ আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়। এর পর থেকে বিদেশফেরতদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করিয়ে দেশে প্রবেশ করানোর প্রক্রিয়া শুরু করে সরকার। সেই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে যেসব প্রবাসীর শারীরিক অবস্থা সন্দেহজনক পরিস্থিতিতে ছিল, তাদের ১৪ দিনের কোয়ারেন্টিনে রাখার জন্য আশকোনার অস্থায়ী হজ ক্যাম্পটিকে কোয়ারেন্টিন সেন্টার করা হয়। সে সময় থেকেই প্রবাসী ও তাদের স্বজনদের যাতায়াত বেড়ে যায় এলাকাটিতে।

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সংলগ্ন আরেকটি এলাকা উত্তরা। পরিকল্পিত নগরায়ণের ছোঁয়ায় গড়ে ওঠা অভিজাত এ এলাকাটির চিত্রও গুলশানের মতো। এখন পর্যন্ত উত্তরায় ২৯ জনের শরীরে নভেল করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। কিন্তু এ এলাকাটির চারপাশ ঘিরে থাকা ঘনবসতিপূর্ণ তুরাগ, আব্দুল্লাহপুর, দক্ষিণখান ও আশকোনা এলাকায় একজন করে কভিড-১৯ আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছে।

এলাকাবাসী জানান, আশকোনা ও আব্দুল্লাহপুরে প্রবাসী ও তাদের আত্মীয়দের যাতায়াত থাকে সারা বছরই। আশকোনার হজ ক্যাম্পে অস্থায়ী কোয়ারেন্টিন সেন্টার স্থাপনের পর এ যাতায়াত আরো বেড়েছে। কিন্তু এ এলাকায় এখন পর্যন্ত বড় পরিসরে নভেল করোনাভাইরাস শনাক্তের পরীক্ষা করার কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। কেবল এলাকার উচ্চবিত্ত দু-চারজন পরীক্ষা করানোর সুযোগ পেয়েছেন।

আইইডিসিআরের গত শুক্রবারের (২৪ এপ্রিল) পরিসংখ্যান অনুযায়ী রাজধানীর মোহাম্মদপুরে ৪৯ জনের শরীরে কভিড-১৯ শনাক্ত হয়েছে। তবে মোহাম্মদপুরের পাশেই নিম্ন আয়ের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা বসিলায় মাত্র একজনের শরীরে নভেল করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। বেড়িবাঁধ এলাকায়ও একই রকম চিত্র। ঘনবসতিপূর্ণ এ এলাকাটিতেও এখন পর্যন্ত একজনের শরীরে নভেল করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে।

পুরান ঢাকার ব্যস্ততম এলাকা বংশাল। এ এলাকায় এরই মধ্যে ৪০ জনের শরীরে নভেল করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। চিকিৎসা শেষে আক্রান্তদের অনেকেই সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। কিন্তু বংশালের পাশেই আরমানিটোলা এলাকায় এখন পর্যন্ত মাত্র একজন কভিড-১৯ আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছে। আরমানিটোলা ছাড়াও পুরান ঢাকার ঢাকেশ্বরী এলাকাতেই এখন পর্যন্ত একজনের শরীরে নভেল করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে।

এ এলাকাগুলো ছাড়াও শ্যামপুর, আমলাপাড়া, বনশ্রী, বানীনগর, বেগুনবাড়ী, বেগমবাজার, বুয়েট এরিয়া, দনিয়া, দক্ষিণখান, ফরিদাবাগ, ফকিরাপুল, গোলারটেক, হাতিরঝিল, কাঁঠালবাগান, কমলাপুর, করাতিটোলা, কচুক্ষেত, খিলক্ষেত, কলতাবাজার, কুড়িল, মাদারটেক, মানিকদী ও মিরপুর ২ নম্বর এলাকায় একজন করে কভিড-১৯ আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছে। এছাড়াও মহনপুর, মতিঝিল, নওয়াবপুর, নিকুঞ্জ, রায়েরবাজার, রসুলপুর, রূপগঞ্জ, সায়েন্স ল্যাব, শেখের টেক, উর্দু রোড ও ভাটারায়ও একজন করে কভিড-১৯ আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছে।

অথচ, স্বল্পবসতিপূর্ণ এলাকা ধানমন্ডিতে ২৮ জন, গুলশানে ২০ জন, বনানীতে ৯ জন, হাজারীবাগে ২০ জন, মিরপুর ১৪-তে ৩৬ জন, রাজারবাগে ৭২ জনের শরীরে নভেল করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে।

একজন করে কভিড-১৯ আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হওয়া এলাকাগুলোর মধ্যে বসিলা ও বেড়িবাঁধ এলাকা ঘুরে দেখা যায়, এলাকা দুটির মোট বাসিন্দার বড় একটি অংশ রিকশা, সিএনজি অটোরিকশা ও গাড়িচালক। থাকেন ঝুপড়ি ঘরে।

পরিবারগুলোতে শিক্ষার হারও খুব কম। প্রযুক্তি পণ্য বলতে সেলফোনই তাদের একমাত্র ভরসা। এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে কভিড-১৯ সম্পর্কে তেমন কোনো সচেতনতার ছাপ পাওয়া যায়নি। তবে এলাকা দুটির ওষুধের দোকানগুলোতে কথা বলে জানা যায়, কভিড-১৯ আক্রান্ত রোগী একজন করে শনাক্ত হলেও বসিলা ও বেড়িবাঁধে জ্বর-সর্দিতে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা অনেক। অন্য সময়ের তুলনায় দোকানগুলোতে বর্তমানে নাপা-প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধের বিক্রি বেড়েছে কয়েক গুণ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নভেল করোনাভাইরাস শনাক্তের পরীক্ষাটি নির্দিষ্ট একটি পদ্ধতি অনুসরণ করে করাতে হচ্ছে। ফলে নিম্নআয়ের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের অনেকেই এ সুযোগটি পাচ্ছেন না। তাই কভিড-১৯-এর উপসর্গ দেখা দেয়া মাত্রই তারা কাছের ওষুধের দোকানের শরণাপন্ন হচ্ছেন। জ্বর-ঠাণ্ডার ওষুধ খেয়ে এসব উপসর্গ দমিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন। কিন্তু তাদের সংস্পর্শে এসে অনেকেই নভেল করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হচ্ছেন। পাশাপাশি সচেতনতারও কমতি রয়েছে তাদের। পক্ষান্তরে অভিজাত এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে যথেষ্ট মাত্রায় সচেতনতা রয়েছে। নিজের থেকে পরিবারের মাঝে কভিড-১৯ ছড়ানোর আশঙ্কা থেকে সামান্যতম উপসর্গ দেখা মাত্রই তারা পরীক্ষা করাচ্ছেন। তাছাড়া পরীক্ষা করানোর প্রক্রিয়াগুলো সম্পর্কেও এসব এলাকার মানুষজনের পরিষ্কার ধারণা থাকায় ভোগান্তি ছাড়াই তারা নিজেদের কভিড-১৯ শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিচ্ছেন।

আইইডিসিআরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. এএসএম আলমগীর বণিক বার্তাকে বলেন, অভিজাত এলাকার বাসিন্দাদের মাঝে কভিড-১৯ মোকাবেলায় যথেষ্ট সচেতনতা রয়েছে। সামান্য উপসর্গ বোঝা গেলেই তারা চিকিৎসকের কাছে ছুটে আসছেন। আবার অভিজাতপাড়ার মানুষদের বেশি আক্রান্ত হওয়ার ক্ষেত্রে কিছু কারণ রয়েছে, যেমন ধরেন তারা বিভিন্ন ধরনের মিটিংয়ে অংশ নিচ্ছেন। বিভিন্ন ধরনের এলাকায় যাচ্ছেন। কিন্তু নিম্নআয়ের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দারা নির্দিষ্ট একটি এলাকার মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকছেন।