পাশের জেলা নেত্রকোনায়ও অন্তত ৫০০ হেক্টর জমির ধান তলিয়ে গেছে। তবে এখন পর্যন্ত মোট ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। এদিকে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড ১০ এপ্রিল পর্যন্ত দিয়েছে মাঝারি থেকে ভারি বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস। এতে হাওরাঞ্চলের কৃষকদের মাঝে উদ্বেগ আরো বেড়েছে।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে সুনামগঞ্জ জেলায় বোরো ধানে আবাদ হয়েছে মোট ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে। জেলার সর্বত্রই এখন শোভা পাচ্ছে কাঁচা ধান। এর মধ্যে ১৫ দিন ধরে অব্যাহত বৃষ্টিপাত হচ্ছে। ফলে হাওরাঞ্চলের নিচু জমিগুলোয় দেখা দিয়েছে জলাবদ্ধতা। বিশেষ করে টাঙ্গুয়ার হাওরের পরিস্থিতি বেশি উদ্বেগজনক। তাহিরপুর ও মধ্যনগর উপজেলার ছোট-বড় প্রায় ২০টি হাওর ও বিলের বেশির ভাগ অংশ পানির নিচে তলিয়ে গেছে। পচন ধরেছে কাঁচা ধানে।
স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, টানা বৃষ্টিতে নদীর পানি বাড়ায় টাঙ্গুয়ার হাওরের তাহিরপুর অংশের নজরখালী বাঁধ ভেঙে যায়। রামসার সাইট (আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ সংরক্ষিত জলাভূমি) হওয়ায় সেখানে সরকারি বাঁধ নির্মাণ করা হয়নি। প্রতি বছর কৃষক নিজ খরচে বাঁধটি মেরামত করেন। তবে এবার সেটিও করা হয়নি। এতে টাঙ্গুয়ার হাওরকেন্দ্রিক ৮২টি গ্রামের কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের একজন রাইসুল হক জানান, তার আট কিয়ার বা বিঘা জমি সম্পূর্ণ পানিতে তলিয়ে গেছে এবং সেখান থেকে ধান পাওয়ার আর কোনো সম্ভাবনা নেই। আরেক কৃষক বাবুল মিয়া বলেন, ‘শীষ আসার সময়ই হাওরে পানি ঢুকে পড়ায় ধানে পচন ধরেছে। বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে কৃষকদের পথে বসতে হবে।’
সুনামগঞ্জ কৃষি বিভাগের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক জানিয়েছেন, জেলার বিভিন্ন হাওরে ১ হাজার ১৮৯ হেক্টর বোরো জমি পানিতে আক্রান্ত হয়েছে। তবে ক্ষতির পরিমাণ এখনো নির্ধারণ করা যায়নি। অনেক কৃষক নিজ উদ্যোগে পানি নিষ্কাশনের চেষ্টা করছেন। পাশাপাশি কিছু এলাকায় সরকারি উদ্যোগেও কাজ চলছে।
এদিকে সুনামগঞ্জের ডাকুয়া হাওরে জলাবদ্ধতা বেড়ে যাওয়ায় বাঁধ কেটে দেয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে চারটি গ্রামের লোকজন সংঘর্ষেও জড়ায়। এতে কয়েকজন আহত হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করতে হয় প্রশাসনকে।
নেত্রকোনায়ও ভারি বৃষ্টিতে বোরো ফসল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ধানের শীষ বের হয়ে সোনালি হওয়ার অপেক্ষায় থাকা বিস্তীর্ণ জমি হঠাৎ পানিতে তলিয়ে যায়। স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, অপরিকল্পিতভাবে ফসল রক্ষায় বাঁধ নির্মাণ করায় পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং এতে ক্ষতির মাত্রা আরো বেড়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে নেত্রকোনার হাওরাঞ্চলে ৪১ হাজার ৬৫ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ করা হয়েছে। জেলায় মোট আবাদ হয়েছে ১ লাখ ৮৫ হাজার ৫৪৮ হেক্টর জমি। সাম্প্রতিক বৃষ্টিতে অন্তত ৫০৫ হেক্টর জমির বোরো ধান তলিয়ে গেছে। এর আগে মার্চের মাঝামাঝি শিলাবৃষ্টিতে আরো ৩২৩ হেক্টর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। স্থানীয় কৃষকরা যদিও দাবি করছেন, প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ সরকারি হিসাবের চেয়ে কয়েক গুণ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলার কলমাকান্দা, মোহনগঞ্জ, মদন, খালিয়াজুরী ও বারহাট্টা উপজেলায় ভারি বৃষ্টির কারণে শত শত হেক্টর জমির আধাপাকা ধান ডুবে আছে। জেলার ডিঙ্গাপোতা হাওরাঞ্চলে জলাবদ্ধতা তৈরি হওয়ায় ফসলের ক্ষতির আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। মোহনগঞ্জের গৌড়াকান্দা গ্রামের কৃষক মুখলেছুর রহমান জানান, তিনি ২৫ কিয়ার জমিতে ধান চাষ করেছেন। কিন্তু টানা বৃষ্টিতে পানি জমায় ধান নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
একই ধরনের উদ্বেগ জানিয়েছেন তেঁতুলিয়া পূর্বপাড়া গ্রামের কৃষক কামরুল ইসলাম। তিনি বলেন, স্থানীয় মহাজন, আড়তদার ও এনজিওর কাছ থেকে আগাম টাকা নিয়ে ২০ কাঠা জমিতে ধান চাষ করেছেন। এখন ধান বিক্রি করতে পারবেন কিনা তা নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে শুধু ফসলহানিই নয়, ঋণের বোঝা নিয়ে অনেক কৃষক আর্থিক সংকটেও পড়বেন।
নেত্রকোনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আমিরুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘হাওরে বোরো ধান কাটা শুরু হয় ১৫ এপ্রিলের পর। এবার মার্চের শুরু থেকেই অতিবৃষ্টি হওয়ায় হাওরের কিছু অংশে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। তবে এতে কৃষকদের আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। ধান গাছ পুরোপুরি না ডুবলে বা শীষের নিচ পর্যন্ত পানি থাকলে কোনো সমস্যা নেই।’
হাওরের কৃষকদের প্রয়োজনীয় সহায়তায় সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন নেত্রকোনার জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান।
কিশোরগঞ্জেও মার্চের শেষ দিকে শিলাবৃষ্টিতে কয়েক হাজার একর বোরো ধানের জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একইভাবে মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার হাকালুকি হাওর এলাকার দুটি বিলে প্রায় ১০০ বিঘা আধাপাকা বোরো ধান তলিয়ে গেছে। আশপাশের আরো দুটি বিলের ফসল ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
ভুক্তভোগী কৃষকেরা জানান, গত শুক্রবার রাতে একটানা কয়েক ঘণ্টা ভারি বৃষ্টি হয়। এছাড়া হাওরের সঙ্গে যুক্ত জুড়ী, কণ্ঠিনালা, গোগালিছড়া ও ফানাই নদী দিয়ে উজানের পাহাড়ি ঢল নামে। শনিবার সকাল থেকে হাওরের উগলা ও হাসইরডিবি বিলে পানি ঢুকতে থাকে। দুপুরের দিকে দুটি বিলের ধানখেত তলিয়ে যায়।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানায়, সিলেট বিশেষ করে হাওরাঞ্চলে ১০ এপ্রিল পর্যন্ত মাঝারি থেকে ভারি (প্রতিদিন ২৩-৮৮ মিলিমিটার) বৃষ্টিপাত হতে পারে। তবে ১১ ও ১২ এপ্রিল বৃষ্টিপাত কিছুটা কমে হালকা থেকে মাঝারি পর্যায়ে নেমে আসবে।
পূর্বাভাসে আরো বলা হয়েছে, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রধান নদীগুলোর পানি সমতল বাড়ছে। এর মধ্যে সিলেট ও সুনামগঞ্জ অঞ্চলের সুরমা-কুশিয়ারা এবং কিশোরগঞ্জের ধনু-বাউলাই নদীর পানি বাড়ছে। তবে নেত্রকোনার ভুগাই-কংস নদীর পানি কিছুটা কমছে।
হাওর অববাহিকা ও উজানে গত সাতদিনে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর। এ বিষয়ে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী সরদার উদয় রায়হান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বৃষ্টিপাত বাড়লেও তাৎক্ষণিকভাবে বড় ধরনের বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা কম। পানি সমতল বাড়লেও তা প্রাক-মৌসুমী বিপৎসীমার নিচেই থাকতে পারে।’
(প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন সিলেট ও নেত্রকোনা প্রতিনিধি)










