বান্দরবানে এক সময় ব্যাপকভাবে পাহাড়ি বা জুম তুলার আবাদ হতো। সে সময় পাহাড়ে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি অর্থকরী কৃষিপণ্যের মধ্যেও জুম তুলা ছিল একটি। পরবর্তী সময়ে অর্থকরী কৃষিপণ্যের আবাদ বাড়তে থাকে। একই সঙ্গে উদ্ভাবিত হয় উচ্চফলনশীল তুলার জাত। ফলে কমতে থাকে জুম তুলার আবাদ। গত আট বছরে জেলায় ৫ শতাংশের বেশি চাষী কমলেও হাইব্রিড জাতের আপল্যান্ড তুলার আবাদ বেড়েছে ৬ শতাংশের বেশি। একই সঙ্গে বেড়েছে উৎপাদন।

তুলা উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য বলছে, ২০১৫-১৬ মৌসুমে তুলাচাষীর সংখ্যা ছিল ৫ হাজার ৭২৮ জন। সে সময় জেলায় ৮২০ টন তুলা উৎপাদন হয়। আবাদি জমির পরিমাণ ছিল ৫ হাজার ৭০০ হেক্টর। ২০২৪-২৫ বছরে মৌসুমে কিছুটা কমে চাষীর সংখ্যা হয় ৫ হাজার ৪০০ জন। তুলা উৎপাদন হয় ২ হাজার ৮০০ টন। আবাদি জমির পরিমাণ দাঁড়ায় ৫ হাজার ৯৪৫ হেক্টরে।

তুলা উন্নয়ন বোর্ড বান্দরবানের প্রধান তুলা উন্নয়ন কর্মকর্তা মো. আলমগীর হোসেন মৃধা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জুমের সাথী ফসল হিসেবে প্রতি একরে পাহাড়ি বা জুম তুলা উৎপাদন এক মণও হয় না। তবে একই পদ্ধতিতে চাষ করে আপল্যান্ড তুলার উৎপাদন হয় তিন থেকে পাঁচ মণ। যা তিন থেকে চার গুণ বেশি পরিমাণে উৎপাদন হয়। এছাড়া সুতা তৈরির কারখানাগুলোয় আপল্যান্ড তুলার চাহিদা বেশি। একক চাষে জমির মাটিভেদে প্রতি একরে গড়ে ২৫-৩৫ মণ আপল্যান্ড তুলার উৎপাদন হয়। কিন্তু পাহাড়ি তুলার একক চাষ হয় না।’

তিনি জানান, জুম তুলা অর্গানিক। মানও ভালো। মোটা বস্তু ও কম্বল তৈরিতে কাজে লাগে। এক সময় বিদেশে রফতানি হতো। এখন হয় না। তবে ভারতে গবেষণা করে উন্নত জাত করে পাহাড়ি তুলার চাষ বাড়ানো হচ্ছে। বাংলাদেশেও গবেষণা হচ্ছে। তবে জাত পাচ্ছি না। গত মৌসুমে কৃষক আপল্যান্ড তুলার দাম মণপ্রতি ৩ হাজার ৮০০ টাকা করে পেয়েছে। জেলায় উৎপাদিত তুলা যশোরের ঝিকরগাছার হৈবত জিনিং, কুষ্টিয়ার সাত তহবিল, আব্দুল্লাহ ও আল মদিনা জিনিং কারখানায় বিক্রি হয়।

ফলন কম হওয়ার পাশাপাশি জুম চাষের পরিমাণ কমে আসার কারণেও পাহাড়ি তুলার আবাদ কমেছে বলে জানিয়েছেন পাহাড়ি তুলা গবেষণা কেন্দ্রের জ্যেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা কিরণময় দেওয়ান। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মাটির উর্বরতা হ্রাস পাচ্ছে। অন্যান্য কৃষিপণ্যের আবাদ বেড়েছে। এছাড়া জুম তুলার আঁশ ও সুতা মোটা হওয়ায় পোশাক কারখানায় চাহিদা কম। দীর্ঘ সময় ধরে আবাদের কারণে প্রাণশক্তি আপনা আপনিভাবে কমে যায়। ফলে জাতের বলিষ্ঠতা ও উৎপাদনশীলতা কমে অবক্ষয় হয়। অন্যদিকে গবেষণায় উদ্ভাবিত আপল্যান্ড তুলার ফলন বেশি হয়। সুতার কাঁচামাল হিসেবে এ তুলার চাহিদা রয়েছে। দামও বেশি পাচ্ছেন কৃষক। বাংলাদেশে প্রতি বছরে ৮০ লাখ বেল তুলার চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ উৎপাদিত হয় দুই লাখ বেল। বাকি তুলা আমদানি করতে হয়। একই সঙ্গে বর্তমান আবহাওয়া তোলা চাষের উপযোগী। তুলা চাষে জমির উর্বরতা বাড়ে। কারণ তুলা গাছে প্রচুর পরিমাণে পাতা থাকে, যা ঝরে পড়ে, পচে মাটিতে মিশে উর্বরতা বাড়ায়।’