বৈদেশিক অনুদানপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অন্যতম বড় সহযোগী সংস্থা যুক্তরাজ্যের ডিপার্টমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট (ডিএফআইডি)। দেশের অনেক এনজিও বড় হওয়ার পেছনেও তাদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান আছে। সময়ের পরিক্রমায় সরকারি অনুদানে সংস্থাটির অংশগ্রহণ কমে এলেও এখনো এনজিওগুলোর তহবিলের বড় উৎস যুক্তরাজ্য সরকারের স্বাধীন এই সংস্থা। তবে ১৭ জুন ডিএফআইডিকে যুক্তরাজ্যের ফরেন অফিসের সঙ্গে একীভূত করার ঘোষণা দিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন। এটি বাস্তবায়িত হলে ডিএফআইডির কর্তৃত্ব চলে যাবে দেশটির ফরেন সেক্রেটারির হাতে। তখন অনুদান প্রদানের ক্ষেত্রে কূটনৈতিক সুসম্পর্কই প্রাধান্য পাবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এ পরিস্থিতিতে অর্থায়ন নিয়ে উদ্বেগে রয়েছে দেশের এনজিওগুলো।
বাংলাদেশকে এ পর্যন্ত প্রায় ৩০০ কোটি পাউন্ড অনুদান বা অর্থায়ন করেছে ডিএফআইডি। বেসরকারি পর্যায়ে অনুদান কার্যক্রম পরিচালনা করলেও বর্তমানে প্রায় ৪০ কোটি পাউন্ডের সরকারি প্রকল্পে অর্থায়ন চলমান রয়েছে সংস্থাটির। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক গত আট বছরে ডিএফআইডি থেকে গড়ে প্রতি বছর ৭ কোটি ৬৩ লাখ ডলার অনুদান পেয়েছে। এ সময়ে ব্র্যাক বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে মোট প্রায় ১৩৩ কোটি ডলারের বেশি অনুদান নিলেও ডিএফআইডির অনুদানের পরিমান ছিল ৬১ কোটি ডলারের বেশি। ফলে সংস্থাটি থেকেই গত আট বছরে মোট অনুদানের প্রায় ৪৬ শতাংশ এসেছে ব্র্যাকের।
শুধু ব্র্যাক নয়, দেশের বেসরকারি খাত, অন্যান্য বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার জন্য নির্ভরযোগ্য অর্থায়নের উৎস হিসেবে আস্থাশীল প্রতিষ্ঠান ডিএফআইডি।
সম্প্রতি বিভিন্ন দেশকে অনুদান বা সাহায্য প্রদানের নিয়মের বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন। তিনি বলেছেন, যুক্তরাজ্যের বিদেশী সহায়তা আকাশে একটি বিশাল নগদ বিন্দুর মতো মনে করছে সহায়তাপ্রাপ্ত দেশগুলো। এটি যুক্তরাজ্যের কোনো ধরনের স্বার্থ বা প্রয়োজন ছাড়াই চলে এসেছে বলে মনে করছেন তারা। তাই ডিএফআইডিকে ফরেন অ্যান্ড কমনওয়েলথ অফিসের (এফসিও) সঙ্গে একীভূত করে দি ফরেন, কমনওয়েলথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিস (এফসিডিও) নামকরণের প্রস্তাব করেন প্রধানমন্ত্রী। তখন কোন কোন দেশকে সহায়তা দেয়া হবে তা চূড়ান্ত করবেন যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র সেক্রেটারি। এতে পুরো কর্তৃত্ব চলে যাবে পররাষ্ট্র বিভাগের ওপর। কূটনৈতিক ও যুক্তরাজ্যের স্বার্থে যাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকবে তারাই কেবল অনুদানপ্রাপ্তিতে এগিয়ে থাকবেন। বাংলাদেশ এক্ষেত্রে যথাযথ যোগাযোগ রাখতে না পারলে সামনের দিনে সরকারি প্রকল্পে কিংবা বেসরকারি খাতে অনুদানপ্রবাহ কমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সাবেক সচিব মনোয়ার আহমেদ এ বিষয়ে বণিক বার্তাকে বলেন, আমি এখনো যুক্তরাজ্য সরকারের চূড়ান্ত ঘোষণা সম্পর্কে পরিষ্কার নই। ডিএফআইডি বাংলাদেশের পরীক্ষিত উন্নয়ন-সহযোগী। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে বেশ কয়েক বছর বাংলাদেশকে সবচেয়ে বেশি অনুদান দিয়েছে তারা। তবে বাংলাদেশের যখন ঋণ নেয়ার সক্ষমতা বেড়েছে তখন সংস্থাটি থেকে অনুদাননির্ভরতা কমে যায়। এই সময় থেকেই সংস্থাটি মূলত দেশের এনজিও ও বেসরকারি খাতের মাধ্যমে বড় ধরনের অর্থায়ন অব্যাহত রাখে। পাশাপাশি সরকারের নীতিসহায়তা ও কাঠামোগত পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে অর্থায়ন এখনো চলমান রেখেছে সংস্থাটি। তাই ডিএফআইডিতে কোনো ধরনের পরিবর্তন এলে তা সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতের জন্যই উদ্বেগের কারণ হবে।
যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি যদি ১৩ শতাংশ হ্রাস পায় তবে সরকার অনুদান বা সাহায্য বাজেট ২ দশমিক ২ বিলিয়ন পাউন্ড কমিয়ে দিতে পারে—এমন গুঞ্জনও বেশকিছু দিন ধরে শোনা যাচ্ছে। যদিও যুক্তরাজ্যের জাতীয় আয়ের (জিএনপি) শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ এ খাতে ব্যয় করার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ডিএফআইডি পররাষ্ট্র দপ্তরের সঙ্গে একীভূত হলে কিংবা বরাদ্দ কমে গেলে তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হবে দেশের এনজিওগুলো। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অনুদান পেয়ে থাকে ব্র্যাক। এর পরই রয়েছে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনসহ বেশ কয়েকটি এনজিও। এরা আবার দেশের আঞ্চলিক ও গোষ্ঠীভিত্তিক শতাধিক এনজিওকে অর্থায়ন করে থাকে।
ব্র্যাকের বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত আট বছরে ব্র্যাক মূলত ডিএফআইডি থেকে ৬১ কোটি ডলারের বেশি অনুদান গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে ২০১৮ সালে ৫ কোটি ৩১ লাখ, ২০১৭ সালে ৭ কোটি ১৩ লাখ, ২০১৬ সালে ৮ কোটি ৮২ লাখ, ২০১৫ সালে ৩ কোটি ৮৬ লাখ, ২০১৪ সালে ৮ কোটি ৯১ লাখ, ২০১৩ সালে ১০ কোটি ১ লাখ, ২০১২ সালে ৮ কোটি ৩৪ লাখ এবং ২০১১ সালে ৮ কোটি ৫৬ লাখ ডলারের অনুদান নিয়েছে। ফলে প্রতি বছর গড়ে মোট অনুদানের ৪৬ শতাংশ বা ৭ কোটি ৬৩ লাখ ডলার অনুদান এসেছে ডিএফআইডি থেকে। সামনের দিনে এ হারে অর্থায়ন থাকবে কিনা, এ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে উন্নয়ন সংস্থাটির মধ্যেও।
ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ্ এ বিষয়ে বণিক বার্তাকে বলেন, ব্র্যাকের সঙ্গে ডিএফআইডির পাঁচ বছরের জন্য স্ট্র্যাটেজিক চুক্তির মেয়াদ আগামী বছরের মার্চে শেষ হচ্ছে। নতুনভাবে চুক্তি যখন প্রক্রিয়াধীন তখনই এ ধরনের একটি ঘোষণা চিন্তা ও দুশ্চিন্তা বাড়াচ্ছে। যদি তাদের মোট বরাদ্দ কমে যায় কিংবা সংস্থাটি যদি পররাষ্ট্র দপ্তরের সঙ্গে একীভূত হয় তাহলে বাংলাদেশের বরাদ্দ কতটুকু কমবে সেটি নির্ভর করছে তারা আমাদের কতটুকু গুরুত্ব দিচ্ছে তার ওপর। আর্থসামাজিক খাতে তাদের অর্থায়নের ফলে কী ধরনের পরিবর্তন এসেছে, তাদের অবদান ও দেশের প্রয়োজন তুলে ধরে সরকারি ও বেসরকারিভাবে এখনই যোগাযোগ বাড়াতে হবে। প্রয়োজনে লবিষ্ট বা সমন্বয়কারীর সহযোগিতা নেয়া যেতে পারে। পাশাপাশি বাংলাদেশী
বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিকদেরও এখানে এগিয়ে আসতে হবে। তাদের সহযোগিতা না পেলে পোস্ট কভিড-১৯ পরিস্থিতি মোকাবেলা ছাড়াও চলমান কার্যক্রম পরিচালনায় বাধা আসতে পারে।
ডিএফআইডি মূলত যুক্তরাজ্যের বৈদেশিক অনুদান পরিচালনার জন্য সরকারি অধিদপ্তর, যাদের প্রধান উদ্দেশ্য হলো উন্নয়নকে টেকসই করা এবং বিশ্ব থেকে দারিদ্র্য নির্মূল করা। এটি মূলত পররাষ্ট্র বিভাগের একটি স্বাধীন কার্যালয় হিসেবে কাজ করে। সংস্থাটি মূলত ত্রাণসহায়তা, জরুরি খাদ্য ও ত্রাণ, প্রাথমিক শিক্ষা, সামাজিক ও কল্যাণ, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা, সরকারের নীতি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা, শিক্ষানীতি, বহুমুখী এইড, সুরক্ষা এবং সহায়তা, প্রজনন স্বাস্থ্য, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ (এসএমই) উন্নয়ন, মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা, আর্থিক নীতি এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা, কৃষি উন্নয়ন এবং পরিবার পরিকল্পনা বিষয়ে অনুদান ও বিনিয়োগ করে থাকে।










