এক ভাই প্রেসিডেন্ট। আরেক ভাই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রাষ্ট্রের নির্বাহী প্রধান। অন্য এক ভাই কিছুদিন আগেও পার্লামেন্টে এমপি ছিলেন। দায়িত্ব পালন করেছেন অর্থ মন্ত্রণালয়েরও। দ্বৈত নাগরিকত্বের কারণে এখন আর জনপ্রতিনিধিত্ব বা নির্বাচনের সুযোগ নেই তার। তার পরও এখনো নিজ দেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে প্রভাবশালীদের একজন তিনি। সবার বড় ভাই দায়িত্ব পালন করছেন সেচমন্ত্রীর। এর আগেও বেশ কয়েকটি মন্ত্রণালয় সামলেছেন তিনি। দীর্ঘ সময় নিয়োজিত ছিলেন পার্লামেন্টের স্পিকার হিসেবে।
এ দৃশ্য শ্রীলংকার। আর এ দৃশ্যপটের প্রধান কুশীলব চার রাজাপাকসে ভাই। তাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় ভাই শ্রীলংকার সেচমন্ত্রী চমল রাজাপাকসে। মেজো ভাই মাহিন্দা রাজাপাকসে দেশটির প্রধানমন্ত্রী। প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসে ভাইদের মধ্যে তৃতীয়। চতুর্থ ভাই বাসিল রাজাপাকসে সরকারি দলের একজন প্রভাবশালী নেতা ও লংকাদ্বীপের সাবেক অর্থনৈতিক উন্নয়নবিষয়ক মন্ত্রী। মন্ত্রিসভায় ও রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছেন তাদের সন্তান-সন্ততিরাও। সেখান থেকে আবার ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব উঠিয়ে আনারও পরিকল্পনা রয়েছে রাজাপাকসে ভাইদের। শ্রীলংকার ক্ষমতাকাঠামোয় রাজাপাকসে পরিবারের এ আধিপত্য পর্যবেক্ষকদের চোখে হয়ে উঠেছে দেশ শাসনের ভাইবেরাদার মডেল।
একটা সময়ে শ্রীলংকার জাতীয় রাজনীতিতে পারিবারিক আধিপত্য ছিল শুধু সেনানায়েকে ও বন্দরনায়েকেদের। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ঐতিহ্য ছিল রাজাপাকসে পরিবারেরও। তবে জাতীয় রাজনীতিতে সেনানায়েকে বা বন্দরনায়েকেদের মতো প্রভাবশালী হয়ে উঠতে পারছিলেন না তারা। আগেও রাজাপাকসে পরিবারের কয়েকজন মন্ত্রিত্ব পেয়েছেন। কিন্তু সেনানায়েকে বা বন্দরনায়েকেদের মতো রাষ্ট্রপ্রধান বা রাষ্ট্রের নির্বাহী প্রধানের পদে আসীন হতে পারেননি তারা। যদিও হাম্বানটোটা জেলায় রাজাপাকসেদের কর্তৃত্ব ছিল প্রশ্নাতীত।
শ্রীলংকায় জাতীয় পর্যায়ে রাজাপাকসে পরিবারের সীমাহীন ক্ষমতাশালী হয়ে ওঠার শুরু ২০০৪ সালে। ওই বছর শ্রীলংকার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পান মাহিন্দা রাজাপাকসে। পরের বছরই তিনি নির্বাচিত হন প্রেসিডেন্ট হিসেবে। এরপর থেকেই দেশটির ক্ষমতাকাঠামোর অংশ হয়ে উঠতে শুরু করেন রাজাপাকসে পরিবারের সদস্যরা।
রাজাপাকসে ভাইয়েরা পরিবারের দ্বিতীয় প্রজন্ম হিসেবে রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছেন। তাদের পিতা ডন আলভিন রাজাপাকসে এক সময় শ্রীলংকার কৃষি ও ভূমিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। পার্লামেন্টের ডেপুটি স্পিকারও ছিলেন কিছুদিন। তার ছোট ভাই জর্জ রাজাপাকসে সামলেছেন কলম্বোর দুটি মন্ত্রণালয়—স্বাস্থ্য ও মৎস্যসম্পদ। আরেক ভাই লাক্সমান রাজাপাকসে কমিউনিস্ট পার্টি থেকে শ্রীলংকান পার্লামেন্টে জনপ্রতিনিধিত্ব করেছেন। তবে এ পরিবারের মধ্যে প্রথম রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছিলেন ডন আলভিন, জর্জ ও লাক্সমান রাজাপাকসের বড় ভাই ডন ম্যাথিউ রাজাপাকসে।
পরিবারটির তৃতীয় প্রজন্মের সদস্যরাও এখন শ্রীলংকার ক্ষমতাকাঠামোর অংশ হয়ে উঠেছেন। দেশটির যুব ও ক্রীড়ামন্ত্রী নমল রাজাপাকসে মাহিন্দা রাজাপাকসের ছেলে। তার আরেক ছেলে ইয়োশিতা রাজাপাকসে এখন লংকান প্রধানমন্ত্রীর চিফ অব স্টাফ হিসেবে নিয়োজিত রয়েছেন। চমল রাজাপাকসের ছেলে শশীন্দ্র রাজাপাকসে ধান ও খাদ্যশস্যবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। এক সময় উভা প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেছেন তিনি। এছাড়া মাহিন্দা, গোতাবায়া ও বাসিল রাজাপাকসের ভাগনে এবং উদীয়মান ব্যবসায়ী নিপুন রানাওয়াকা চমলও লংকান পার্লামেন্টের এমপি।
লংকান ক্ষমতাকাঠামোয় রাজাপাকসে বলয়ের শক্তিশালী হয়ে ওঠার ইঙ্গিত পাওয়া যায় ২০০৫ সালে। মাহিন্দা রাজপাকসে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর পরই ভাই গোতাবায়া রাজাপাকসেকে প্রতিরক্ষা সচিব হিসেবে নিয়োগ দেন। আরেক ভাই বাসিল রাজাপাকসেকে নিয়োগ দেন প্রেসিডেন্টের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা হিসেবে। ২০১০ সালে প্রেসিডেন্ট হিসেবে পুনর্নির্বাচিত হন মাহিন্দা। ওই বছরের সাধারণ নির্বাচনে তার দুই ভাই চমল ও বাসিল রাজাপাকসে এবং ছেলে নমল রাজাপাকসেও এমপি হিসেবে নির্বাচিত হন। পার্লামেন্ট সদস্যদের সর্বসম্মতিক্রমে স্পিকার হিসেবে নিয়োগ পান চমল রাজাপাকসে। বাসিল রাজাপাকসে নিয়োগ পান অর্থনৈতিক উন্নয়নবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের। সে সময় রাজাপাকসে ভাইয়েরা কয়েকটি মন্ত্রণালয়ে সরাসরি নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। এগুলো হলো প্রতিরক্ষা ও নগর উন্নয়ন, আইন-শৃঙ্খলা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, অর্থ ও পরিকল্পনা এবং বন্দর ও জনপদ। বলা হয়, ওই সময় শ্রীলংকার জাতীয় বাজেটের ৭০ শতাংশই চলে যায় রাজাপাকসে ভাইদের নিয়ন্ত্রণে। যদিও এ তথ্যকে তারা বরাবরই অস্বীকার করে এসেছেন।
ভাইদের মধ্যে দ্বিতীয় হলেও ৭৪ বছর বয়সী মাহিন্দা রাজাপাকসেকেই বলা হয় পরিবারের প্রধান। ২০০৪ সালে প্রথমবারের মতো শ্রীলংকার প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন তিনি। প্রেসিডেন্ট ছিলেন ২০০৫ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত। এরপর ২০১৮ সালে আড়াই মাসের জন্য প্রধানমন্ত্রিত্ব করেছেন তিনি। ২০১৯ সালের নভেম্বরে ভাই গোতাবায়া প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। এরপর মাহিন্দা রাজাপাকসে প্রধানমন্ত্রিত্বের পদে ফিরে আসেন।
শ্রীলংকার সংখ্যাগুরু সিংহল-বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদীদের কাছে মাহিন্দা রাজাপাকসের জনপ্রিয়তা অনেক বেশি। বিতর্কিত এক সামরিক অভিযানে তামিল বিচ্ছিন্নতাবাদী বিদ্রোহীদের দমনের মাধ্যমে এ জনপ্রিয়তা অর্জন করেন তিনি।
মাহিন্দা রাজাপাকসের পররাষ্ট্রনীতি চীনঘনিষ্ঠ। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, তার আমলে বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্পের জন্য শ্রীলংকা চীনের কাছ থেকে ঋণ নিয়েছে প্রায় ৭০০ কোটি ডলার। এসব অবকাঠামো প্রকল্পের অনেকগুলোই শেষ পর্যন্ত শ্রীলংকার জন্য রীতিমতো ‘শ্বেতহস্তী’ হয়ে উঠেছে। কোনো কোনোটিতে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগও উঠেছে।
প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে পরিচিত ‘দ্য টারমিনেটর’ হিসেবে। ভাই মাহিন্দা প্রেসিডেন্ট থাকাকালে তার বাহুবল হয়ে উঠেছিলেন গোতাবায়া। সে সময় প্রতিরক্ষা সচিব হিসেবে শ্রীলংকার সশস্ত্র ও নিরাপত্তা বাহিনীর দৈনন্দিন কার্যক্রমে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। তামিল বিদ্রোহীদের দমন কার্যক্রমও সরাসরি তার তত্ত্বাবধানেই পরিচালিত হয়েছে।
বলা হয়, রাজাপাকসে পরিবারের রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণের কাজটি করে থাকেন বাসিল রাজাপাকসে। মাহিন্দা রাজাপাকসে প্রেসিডেন্ট থাকাকালে শ্রীলংকার অর্থনীতি সামলেছেন তিনি। ওই সময় সরকারি কন্ট্রাক্ট থেকে কমিশন নেয়ার অভিযোগ উঠেছিল তার বিরুদ্ধে। যদিও পরবর্তী প্রশাসনগুলো এ অভিযোগ প্রমাণে ব্যর্থ হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও শ্রীলংকার দ্বৈত নাগরিক হিসেবে বর্তমানে তার পক্ষে আর জনপ্রতিনিধিত্বের সুযোগ নেই। তবে বর্তমানে তিনি শ্রীলংকা সরকারের একজন জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করছেন।
সবার বড় ভাই সাবেক স্পিকার ও বর্তমান সেচমন্ত্রী চমল রাজাপাকসে রাজনীতিতে নামার আগে ছিলেন পুলিশের কর্মকর্তা। বিশ্বের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী সিরিমাভো বন্দরনায়েকের ব্যক্তিগত দেহরক্ষী ছিলেন তিনি।
রাজাপাকসে ভাইদের পরের প্রজন্মের মধ্যে রাজনীতিতে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় ধরা হয় নমল রাজাপাকসেকে। মাহিন্দা রাজাপাকসের জ্যেষ্ঠ পুত্র নমল শ্রীলংকার পার্লামেন্টে প্রথম পা রাখেন ২০১০ সালে। সে সময় তার বয়স ছিল মাত্র ২৪ বছর। ওই সময় পিতার মন্ত্রিসভায় ঠাঁই না পেলেও বেশ প্রভাবশালী হয়ে উঠেছিলেন তিনি। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, শ্রীলংকার ভবিষ্যৎ প্রেসিডেন্ট তথা রাজাপাকসেদের রাজনৈতিক সাম্রাজ্যের ভাবী উত্তরসূরি হিসেবে তাকে গড়ে তুলছেন মাহিন্দা রাজাপাকসে।










