বগুড়ায় সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। নিহতদের বড় একটি অংশই কিশোর ও তরুণ। বগুড়া ট্রাফিক বিভাগের পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালে জেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে অন্তত ১২০ জন। অর্থাৎ প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ১০ জন করে প্রাণ হারিয়েছে। তবে বাস্তবে নিহতের সংখ্যা আরো বেশি হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অনেক ক্ষেত্রে আইনি ঝামেলা এড়াতে স্বজনরা পুলিশকে না জানিয়েই মরদেহ দাফন করে ফেলেন।
ট্রাফিক পুলিশ জানায়, সচেতনতার অভাব, যেখানে-সেখানে পার্কিং, নিদ্রাহীন অবস্থায় গাড়ি চালানো, অনভিজ্ঞতা, ত্রুটিপূর্ণ ও ফিটনেসবিহীন যানবাহন, গাড়ি চালানোর সময় মুঠোফোন ব্যবহার, হেলমেট না পরা, অতিরিক্ত গতি, অনিয়মিত ওভারটেকিং, বাস ও ট্রাকে অতিরিক্ত যাত্রী ও পণ্য পরিবহন এবং ট্রাফিক আইন অমান্য করাই দুর্ঘটনার প্রধান কারণ।
উত্তরাঞ্চলের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত বগুড়া জেলা। প্রতিদিন উত্তরবঙ্গের অন্তত ১১টি জেলার যানবাহন চলাচল করে বগুড়ার ওপর দিয়ে। ফলে বগুড়া থেকে উত্তরাঞ্চলগামী মহাসড়কগুলো ২৪ ঘণ্টাই ব্যস্ত থাকে। দিন-রাত মিলিয়ে কয়েক হাজার যানবাহন এসব সড়ক ব্যবহার করে।
ট্রাফিক পুলিশ বলছে, বগুড়ার শেরপুর উপজেলার ঘোগা ব্রিজ ও ধুনট মোড়, নন্দীগ্রাম উপজেলা বাসস্ট্যান্ড ও কুন্দারহাট, শাজাহানপুরের শাকপালা, ছিলিমপুর, বনানী ও লিচুতলা, দুপচাঁচিয়া বাসস্ট্যান্ড, বগুড়া সদরের চারমাথা, তিনমাথা ও বারোপুর, শিবগঞ্জের মহাস্থান ও মোকামতলা, মাটিডালি দ্বিতীয় বাইপাস এবং সাবগ্রাম এলাকায় মাঝেমধ্যেই দুর্ঘটনা ঘটছে। কখনো দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাকে ধাক্কা, কখনো বাস-ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ, আবার কখনো মোটরসাইকেল, অটোরিকশা, নসিমন দুর্ঘটনার কবলে পড়ছে।
অনেক পরিবার একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছে। নিহতদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিক্ষার্থী ও তরুণ। বিশেষ করে কিশোর ও তরুণরা অতিরিক্ত গতিতে মোটরসাইকেল চালাতে গিয়ে বেশি দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে।
বগুড়া শহরের বাসিন্দা জাহাঙ্গীর আলম জানান, কিছুদিন আগে ঠনঠনিয়া এলাকায় রাস্তা পার হওয়ার সময় তার ছেলে দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়। পরে তাকে উদ্ধার করে একটি ক্লিনিকে চিকিৎসা দিতে প্রায় ১ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে।
আরেক ভুক্তভোগী মো. হাবিব জানান, কয়েক বছর আগে মহাসড়কের পাশে তার সন্তানের মরদেহ পাওয়া যায়। তখন বলা হয়েছিল, বাসচাপায় তার সন্তানের মৃত্যু হয়েছে। আজও তিনি সন্তান হারানোর শোক ভুলতে পারেননি। তার কাছে এ বেদনা পাহাড়সম হয়ে আছে।
যাত্রী, বাস-ট্রাক শ্রমিক ও অটোরিকশাচালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনেক ক্ষেত্রে এক পক্ষ সতর্ক থাকলেও অন্য পক্ষের দ্রুতগতিতে চালনার কারণে দুর্ঘটনা ঘটে। গতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা ও ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন দুর্ঘটনার মাত্রা আরো বাড়িয়ে দেয়। এছাড়া মহাসড়কে সিএনজি ও মোটরসাইকেলচালকরা সংযোগ সড়ক ব্যবহার না করে সরাসরি মূল সড়কে ওঠায় ঝুঁকি বাড়ছে। ‘কে কার আগে যাবে’—এ প্রতিযোগিতা অনেক সময় প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে।
ট্রাফিক পুলিশের তথ্যমতে, ২০২৫ সালে জেলার ১২টি থানায় সড়ক দুর্ঘটনায় ১১৩টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে সদর থানায় ২৬টি, শেরপুরে ২১, শাজাহানপুরে ১৮ ও শিবগঞ্জ থানায় ১৫টি মামলা হয়েছে। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ১২৫।
হাইওয়ে পুলিশ বগুড়া রিজিয়নের তথ্য বলছে, রাজশাহী, বগুড়া, পাবনা, নাটোর ও সিরাজগঞ্জ—এ পাঁচ জেলায় মহাসড়কে গত বছর সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে ৩৩১ ও আহত ২৪৬ জন। এসব দুর্ঘটনায় মামলা হয়েছে ২৯৯টি।
বগুড়া সদর ট্রাফিক বিভাগের ইনচার্জ টিআই (প্রশাসন) মো. সালেকুজ্জামান খান বলেন, ‘মহাসড়ককেন্দ্রিক জেলা হওয়ায় বগুড়ায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেশি। দুর্ঘটনা কমাতে চালক ও পথচারীদের আরো সতর্ক হতে হবে।’ ট্রাফিক আইন মেনে চলা ও গণসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) বগুড়া জেলা শাখার সভাপতি মোস্তাফিজার রহমান বলেন, ‘সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিয়মিত লিফলেট বিতরণ, সচেতনতামূলক কার্যক্রম ও ট্রাফিক সহায়তা কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। অদক্ষ চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন ও শিশু বয়সে মোটরসাইকেল চালানো বন্ধ না হলে দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব নয়।’










