চলতি বছরের শুরু থেকেই বিশ্বের ভোগ্যপণ্যের বাজার অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। বিশেষ করে ফেব্রুয়ারির শেষে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হলে পণ্যবাজারে তার ব্যাপক প্রভাব পড়ে। যুদ্ধ ও বৈশ্বিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে আগের সব রেকর্ড ভেঙে চূড়ায় ওঠে ভোগ্যপণ্যের বাড়তি দাম। তবে সম্প্রতি দাম পড়তে শুরু করেছে। বিশেষ করে খাদ্যপণ্য ও সার রফতানি এবং ইউক্রেনের বন্দর ব্যবহারে রাশিয়া-ইউক্রেন চুক্তি পণ্যবাজারের পতন তৈরিতে বড় ভূমিকা রেখেছে। এটি বাংলাদেশের মতো একটি আমদানিনির্ভর দেশের জন্য সামগ্রিকভাবে স্বস্তির হলেও ব্যবসায়ীদের জন্য মাথাব্যথার বড় কারণ হয়ে উঠেছে। কারণ কমোডিটি এক্সচেঞ্জগুলোয় পণ্যের দামে দ্রুত পতন হওয়ায় আমদানি পাইপলাইনে থাকা পণ্যগুলোতে লাভের পরিবর্তে পুঁঁজি হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছেন দেশীয় আমদানিকারকরা। যা দেশে ভোগ্যপণ্য ও আমদানিনির্ভর বাণিজ্যকে নতুন সংকটের মধ্যে ফেলবে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

দেশে ভোগ্যপণ্যের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ী, ব্যাংকার, সরকারি খাতসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, জুলাইয়ে ভোগ্যপণ্যের আমদানি এলসি (ঋণপত্র) খোলার পরিমাণ কমেছে। যা গত জুনের চেয়ে অন্তত ২০ শতাংশ কম। প্রতিদিন টাকার বিপরীতে ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে আমদানি খরচ বাড়ছে। সাম্প্রতিক সময়ে ভোগ্যপণ্যের দাম কমতে থাকলেও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, শিপিং খরচ বেড়ে যাওয়া, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আমদানীকৃত পণ্য দেশে আসতে সময় লাগছে। যার কারণে চতুর্মুখী সংকটের মধ্যে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। এখন আমদানি কমিয়ে দিয়ে বড় ধরনের লোকসান এড়ানোর চেষ্টা করছেন তারা। অন্যদিকে ব্যাংকগুলো বিনিয়োগের সুরক্ষা দিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের বেঁধে দেয়া এলসি মার্জিনের ক্ষেত্রে কঠোর হয়েছে। এতেও আমদানির ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, পণ্যের দাম যে হারে কমছে তার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি বেড়েছে ডলারের দাম। তাছাড়া এলসি মার্জিন বাড়ানোর ফলে বাড়তি দামে ডলার কিনতে গিয়ে দীর্ঘ সময়ের জন্য বিনিয়োগ আটকে যাচ্ছে। রাশিয়া-ইউক্রেন সংকটে দুবাই, ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ থেকে পণ্য আমদানির সময় আগের চেয়েও বেড়েছে। দ্রুত পতনমুখী বাজারে পণ্য আমদানি করার অর্থ হলো নিশ্চিত লোকসানের শঙ্কায় থাকা। এ কারণেই আগের তুলনায় এলসি খোলার পরিমাণ বেড়েছে।

চট্টগ্রামের আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান মেসার্স অসীম এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী অসীম কুমার দাশ বণিক বার্তাকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে আগে বাংলাদেশে কোনো পণ্য পরিবহনে ৪৫-৫০ দিন সময় লাগত। এখন সেটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে অন্তত ১২০ দিন। তাছাড়া দুবাই থেকে আগে ২০-২২ দিনে পণ্য এলেও এখন সময় লাগছে ৪৫-৫০ দিন। যার কারণে ভোগ্যপণ্যের বাজার অস্থির হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। দীর্ঘ সময়ের কারণে এলসি মার্জিন ব্লক হয়ে যাওয়া, এলসি মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে যাওয়া এবং মেয়াদোত্তীর্ণ এলসি নবায়ন করতে নতুন করে কমিশন দিতে হচ্ছে। এতেও আমদানি ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। যার কারণে ব্যবসায়ীরা আমদানি কমিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন।

এর আগে ২০০৮ সালেও প্রায় একই ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিল বিশ্ব। ২০১০ থেকে ২০১১ সালে ওই ঘটনার প্রত্যক্ষ ভুক্তভোগী হয়েছিলেন বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা। সেই সময় বিশ্ববাজারে পণ্যমূল্যের অস্বাভাবিক বৃদ্ধির পর দ্রুত দর হারানোর কবলে পড়ে দেশের শীর্ষস্থানীয় কমোডিটি জায়ান্টদের বেশ কয়েকটি বড় ধরনের লোকসানের মধ্যে পড়েছিল। শেষ পর্যন্ত এর খেসারত দিতে হয়েছে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোকে। যারা এ লোকসানের ভার চাপিয়েছে বিনিয়োগকারী ব্যাংকের ওপর। চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা সেই সময় সবচেয়ে বেশি ঋণখেলাপি হয়। যার ক্ষত এখনো বয়ে বেড়াচ্ছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও ব্যাংকগুলো।

একসময় দেশের শীর্ষস্থানীয় ভোজ্যতেল, গম আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ছিল চট্টগ্রামভিত্তিক নূরজাহান গ্রুপ। প্রতিষ্ঠানটি ২০০৯ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে কয়েক দফা শীর্ষ ভোজ্যতেল আমদানি করেছিল। ওই সময়ে অপরিশোধিত সয়াবিনের দাম টনপ্রতি ১ হাজার ৩০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। দাম আরো বাড়বে এমন আশঙ্কায় আমদানিও হয়েছিল পর্যাপ্ত। কিন্তু দ্রুত দরপতনে এক মাসের মধ্যে দাম ৭০০ ডলারের নিচে নেমে গেলে বড় ধরনের লোকসানে পড়েন ব্যবসায়ীরা। এ কারণে একের পর এক ব্যাংকের দায় পরিশোধ থেকে বিরত থাকতে শুরু করেন ব্যবসায়ীরা। বন্ধ হয়ে যায় নূরজাহান, মোস্তফা গ্রুপ, মেসার্স ইলিয়াস ব্রাদার্স (এমইবি), মেসার্স রুবাইয়া ভেজিটেবলসহ বিভিন্ন ভোজ্যতেল, গমসহ খাদ্যশস্য আমদানিকারক ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানগুলোর কারখানা।

২০১০-১১ সালের ওই ঘটনার পর দেশের ভোজ্যতেল খাতের নেতৃত্বে পরিবর্তন আসে। শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের আমদানি ও কারখানা বন্ধ হয়ে গেলে নতুন একাধিক শিল্প গ্রুপ এ খাতে বিনিয়োগ শুরু করে। সেই সময়ের মতো এবারো একই ধরনের চাপে পড়েছে শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলো। এরই মধ্যে প্রায় সব প্রতিষ্ঠান তাদের এলসি খোলা কার্যত বন্ধ রেখেছে।

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট সৈয়দ মাহমুদ আক্তার বণিক বার্তাকে বলেন, ভোগ্যপণ্যের বাজার টানা বেড়ে পাওয়ায় মজুদ প্রবণতা ও দাম আরো বাড়ার আশঙ্কায় পর্যাপ্ত আমদানি করা হয়েছিল। বর্তমানে দাম কমতে শুরু করলেও দেশের বাজারে দরপতন, ডলার সংকট সব মিলিয়ে বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে ভোগ্যপণ্য খাত। জুনের তুলনায় এলসির পরিমাণও কমিয়ে দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত ভোগ্যপণ্য আমদানি খাতের এ সংকট কাটবে না বলেই মনে হচ্ছে।

ব্যবসায়ীদের আমদানি কমিয়ে দেয়ার চিত্র উঠে এসেছে উদ্ভিদ সংগনিরোধ কেন্দ্রের (চট্টগ্রাম বন্দর) কয়েক মাসের আমদানি অনুমতির তথ্যেও। সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, চলতি মাসের ২৬ তারিখ পর্যন্ত আমদানি অনুমতি (আইপি) নেয়া হয়েছে ২২৭টি। যা মে মাসে ছিল ৪৮০টি। অর্থাৎ মে মাসের তুলনায় চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরের সংগনিরোধ কেন্দ্র থেকে আমদানি অনুমতিপত্র কম হয়েছে প্রায় অর্ধেক। আইপির পাশাপাশি আমদানি হওয়া পণ্যের রিলিজ অর্ডারও আশঙ্কাজনক পরিমাণ কমেছে বলে জানিয়েছেন কেন্দ্রটির কর্মকর্তারা।

এ বিষয়ে নূরজাহান গ্রুপের পরিচালক মিজানুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ২০১০-১১ সালের বৈশ্বিক ভোগ্যপণ্যের বাজারে এখনকার মতোই অস্থিরতা ছিল। মাত্র এক-দেড় মাসের মধ্যেই ভোজ্যতেলের দাম টনপ্রতি ৩৫০ থেকে ৪০০ ডলার কমে যাওয়ায় শীর্ষ আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো মজুদ পণ্যে বড় ধরনের লোকসান দিয়েছিল। এককভাবে শুধু ভোগ্যপণ্যের ওপর নির্ভরশীল পুরনো ব্যবসায়ীরা ওই সময়ের লোকসানের ক্ষত আর পুষিয়ে নিতে পারেননি। ফলে ব্যাংকও ধীরে ধীরে খেলাপির তালিকায় ফেলে এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে নিয়েছিল। বর্তমানে যেহেতু একই ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে তাই সরকারের উচিত ভোগ্যপণ্য আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোকে জরুরি ভিত্তিতে নীতিসহায়তা দেয়া।

খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা বলছেন, সেই সময়ের লোকসানের পর বর্তমানে নূরজাহান গ্রুপ, রুবাইয়া গ্রুপ, ইয়াসির এন্টারপ্রাইজ, এমইবি, মোস্তফা গ্রুপ ভোগ্যপণ্য ব্যবসা থেকে নিজেদের প্রায় সরিয়ে নিয়েছে। খেলাপি হওয়ার কারণে ভোগ্যপণ্যে নতুন ঋণ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা থাকায় এখন নতুন ব্যবসার মাধ্যমে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন এসব প্রতিষ্ঠানের কর্ণধাররা।

ব্যবসায়ীদের মতে, ভোগ্যপণ্য ব্যবসা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ও অস্থির। দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা, মানুষের প্রধান প্রধান শস্যের জোগান নিশ্চিতে ঝুঁকি নিলেও সংকটময় পরিস্থিতিতে নীতিসহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে কিছুটা পিছিয়ে রয়েছেন এ খাতের উদ্যোক্তারা। যার কারণে একবার পিছিয়ে পড়লে নিজেদের দেউলিয়া ঘোষণা কিংবা পালিয়ে বেড়ানো ছাড়া অন্য কোনো উপায় থাকে না তাদের হাতে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে চট্টগ্রামের এক আমদানিকারক বণিক বার্তাকে বলেন, আমদানি করে ব্যবসা করলেও ভোগ্যপণ্য খাতের ব্যবসায়ীরা যে ঝুঁকি নেন তার জন্য সরকারিভাবে সহায়তার পরিমাণ কম। কৃষিপণ্য অর্থাৎ সারসহ বিভিন্ন পণ্যের ক্ষেত্রে ভর্তুকি দেয়া হলেও ভোগ্যপণ্য আমদানিতে লোকসানে থাকা ব্যবসায়ীদের জন্য তা নেই।

দেশের শীর্ষস্থানীয় ভোগ্যপণ্য আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান বিএসএম গ্রুপের চেয়ারম্যান আবুল বশর চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, বিশ্ব ভোগ্যপণ্য বাজার ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা থেকে কমতে শুরু করেছে। বৃদ্ধির একটি ধারাবাহিকতা থাকলেও কমার ক্ষেত্রে অস্থিতিশীলতা সবচেয়ে প্রকট। বর্তমানে রাশিয়া-ইউক্রেন চুক্তির ফলে বৈশ্বিক শস্যের দামও কমতে শুরু করেছে। একদিকে আমদানি মূল্য কমে যাওয়ায় লোকসানের ঝুঁকি, অন্যদিকে ডলারের অস্বাভাবিক দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে আমদানি খরচ বৃদ্ধিতে ব্যবসায়ীরা উভয় সংকটে পড়েছেন। ফলে আমদানি কমানো কিংবা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা ছাড়া ঝুঁকি এড়ানোর অন্য কোনো পথ তাদের সামনে খোলা নেই।

তবে ভোগ্যপণ্য ছাড়াও স্ক্র্যাপ, ইস্পাতজাতীয় বিভিন্ন পণ্য, ড্রাই ফ্রুটস, কেমিক্যালের বৈশ্বিক দামের ক্ষেত্রেও একই পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে বিশ্ববাজারে।

অন্যদিকে বাংলাদেশের মোট চাহিদার প্রায় ৯০ শতাংশ ভোজ্যতেলই আমদানিনির্ভর। ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া থেকে পাম অয়েল, আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল থেকে সয়াবিন তেল আমদানি করে বাংলাদেশ। চলতি বছরের শুরুতে ইন্দোনেশিয়া হঠাৎ করেই নিজ দেশের দাম নিয়ন্ত্রণে পাম অয়েলের রফতানি বন্ধ করে দিলে বিশ্ববাজারে ভোজ্যতেলের দাম অস্থির হয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে ইন্দোনেশিয়া রফতানি চালু করার পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী পাম অয়েল ও সয়াবিনের উৎপাদন পূর্ববর্তী সময়ের তুলনায় বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হলে বাজার ফের কমতে শুরু করেছে।

জানা গেছে, চলতি বছরের মার্চে অপরিশোধিত সয়াবিনের টনপ্রতি দাম ১ হাজার ৯৫৭ ডলার ও  পাম অয়েলের দাম ১ হাজার ৭৭৭ ডলার উঠে যায়। এর পর থেকে দাম কমতে কমতে বর্তমানে সয়াবিনের টনপ্রতি দাম ১ হাজার ৩২২ ডলার ও পাম অয়েলের দাম ৮৬০ ডলার নেমে এসেছে। সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়ার সঙ্গে ইউক্রেনের শস্য রফতানি ও বন্দর উন্মুক্তকরণের চুক্তি সইয়ের পর গমের দামও কমতে শুরু করেছে।