দীর্ঘদিন ধরে কুটির, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি (সিএসএমই) ঋণের ঝুঁকি ভাগাভাগির দাবি জানিয়ে আসছিল বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। সে দাবির যৌক্তিকতা আরো দৃঢ় করেছে নভেল করোনাভাইরাস পরিস্থিতি। আর এ পরিস্থিতির কারণেই শেষ পর্যন্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর দাবি মেনে নিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণ বিতরণকারী ব্যাংকগুলোর সঙ্গে সিএসএমই খাতের ঋণের ঝুঁকি ভাগাভাগি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এজন্য নিজস্ব তহবিল থেকে গঠন করা হয়েছে ২ হাজার কোটি টাকার ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিম। এ অর্থ দিয়ে সিএসএমই খাতে বিতরণকৃত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ৮ হাজার ৩২০ কোটি টাকার চলতি মূলধন ঋণের বিপরীতে গ্যারান্টি দেয়া সম্ভব হবে। গতকাল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভায় এ গ্যারান্টি স্কিমটি পাস হয়।
গ্যারান্টি স্কিমটি সিএসএমই খাতে বিতরণকৃত ঋণের জন্য আশীর্বাদ হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, ঋণের ঝুঁকি ভাগাভাগি হওয়ায় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো ছোট উদ্যোক্তাদের ঋণ দিতে উৎসাহিত হবে। চাহিদামতো ঋণ পেলে নভেল করোনাভাইরাসে ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন।
অন্যদিকে ২ হাজার কোটি টাকার গ্যারান্টি স্কিমকে দেশের সিএসএমই খাতের জন্য অনন্য মাইলফলক হিসেবে দেখছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, ছোট ঋণে খেলাপি হওয়ার ঝুঁকি বেশি। আবার প্রকৃতিগতভাবে এ ধরনের ঋণের বিপরীতে যথাযথ জামানত নিশ্চিত সম্ভব হয় না। এজন্য ব্যাংকগুলো সিএসএমই খাতের উদ্যোক্তাদের ঋণ দিতে ভয়ে থাকেন। বাংলাদেশ ব্যাংক গ্যারান্টি স্কিমের মাধ্যমে ঋণের ঝুঁকি ভাগাভাগি করায় এখন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো সিএসএমই খাতে ঋণ দিতে উৎসাহিত হবে।
গ্যারান্টি স্কিম থেকে অর্থ পাওয়ার ক্ষেত্রে বেশকিছু শর্ত নির্ধারণ করে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক পর্ষদ। সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, যেসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ১০ শতাংশের বেশি, সেসব ব্যাংক এ স্কিম থেকে অর্থসহায়তা পাবে না। এ বিবেচনায় দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের প্রায় সবকয়টি ব্যাংকই বাদ পড়ে যায়। এজন্য রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে খেলাপি ঋণের শর্ত থেকে নিষ্কৃতি দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। অর্থাৎ খেলাপি ঋণের হার ১০ শতাংশের বেশি হলেও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো সিএসএমই গ্যারান্টি স্কিম থেকে অর্থ সহায়তা পাবে।
স্কিমের গ্যারান্টি পাওয়ার জন্য আগ্রহী ব্যাংকগুলোকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এসএমই বিভাগের সিজিএস ইউনিটের সঙ্গে চুক্তি করতে হবে। এ স্কিমের সুবিধা নেয়ার জন্য গ্যারান্টির বিপরীতে প্রদত্ত ঋণের ওপর প্রথম বছরে ১ শতাংশ হারে ফি দিতে হবে। পরবর্তী বছরগুলোতে ফি দিতে হবে ঝুঁকির পরিমাপের ওপর ভিত্তি করে। এক্ষেত্রে যেসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ, সেসব ব্যাংককে ফি দিতে হবে দশমিক ৫০ শতাংশ হারে। আর যেসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ, সেসব ব্যাংককে গ্যারান্টি সময়কালের জন্য দশমিক ৭৫ শতাংশ হারে ফি দিতে হবে। যেসব ব্যাংকের শ্রেণীকৃত ঋণের হার সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ, সেসব ব্যাংক এ গ্যারান্টি সুবিধা প্রাপ্য হবে। তবে সরকারি মালিকানাধীন ব্যাংকের জন্য কোনো শর্ত প্রযোজ্য হবে না। অর্থাৎ, সরকারি ব্যাংকগুলো এ গ্যারান্টি স্কিমের সুবিধা প্রাপ্য হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে পাস হওয়া সিএসএমই গ্যারান্টি স্কিমের নীতিমালায় বলা হয়েছে, গ্যারান্টিপ্রাপ্ত ঋণ কোনো কারণে শ্রেণীকৃত হলেও এর বিপরীতে ব্যাংকগুলোকে কোনো প্রভিশন বা সঞ্চিতি সংরক্ষণ করতে হবে না। গ্যারান্টিপ্রাপ্ত ঋণের মধ্যে যে ঋণ কু-ঋণে (বেড অ্যান্ড লস) হিসেবে চিহ্নিত হবে এবং সব চেষ্টার পরও আদায় করা সম্ভব নয় মর্মে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো মনে করবে, তখন ওই ঋণের বিপরীতে গ্যারান্টির টাকা ফেরত পাবে। গ্যারান্টীকৃত ঋণের বিপরীতে পোর্টফোলিও এর ৩০ শতাংশ অথবা একক ঋণ গ্রহীতার ঋণের ৮০ শতাংশ পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ব্যাংকগুলো ফেরত পাবে।
কভিড-১৯-এর ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক বিপর্যয় সামাল দিতে অন্যান্য প্রণোদনার পাশাপাশি সিএসএমই খাতে ২০ হাজার কোটি টাকার ঋণ প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে। যদিও ব্যাংকগুলো বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রণোদনা ঋণের অর্থ ছাড় শুরু করলেও সিএসএমই খাতে ঋণ বিতরণ শুরুই করেনি। এ অবস্থায় ছোট উদ্যোক্তাদের ঋণ দিতে আগ্রহী করে তুলতেই সিএসএমই ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিম নীতিমালা অনুমোদন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক পর্ষদ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, গ্যারান্টি স্কিমের মাধ্যমে ৮ হাজার ৩২০ কোটি টাকার চলতি মূলধন ঋণের গ্যারান্টি দেয়া সম্ভব হবে। এজন্য যে ব্যাংকগুলো সিএসএমই খাতে আগে ঋণ বিতরণ করতে পারবে, সেসব ব্যাংক গ্যারান্টি স্কিম থেকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্যারান্টি পাবে। ঋণ বিতরণে দেরি করা ব্যাংকগুলো গ্যারান্টি স্কিমের সুফল থেকে বঞ্চিত হবে।










