দেশের সবচেয়ে পুরনো পলিটেকনিক বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব গ্লাস অ্যান্ড সিরামিকস। কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের তথ্য বলছে, যেসব বিষয়ে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি আছে, সেগুলোর মধ্যে চাকরির বাজারে এ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছেন। কিন্তু শ্রমবাজারে এগিয়ে থাকলেও বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) পরিসংখ্যান বলছে, এ প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের ভর্তির আগ্রহ কয়েক বছর ধরে কমছে।
প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে প্রতিষ্ঠানটিতে এক বছর মেয়াদি ‘আর্টিজেন’ ডিগ্রি দেয়া হতো। এরপর ১৯৭৮ সালে তিন বছর মেয়াদি এবং ২০০০ সালে চার বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি চালু করা হয়। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে সিরামিকস ও গ্লাস দুই টেকনোলজিতে শিক্ষার্থী ভর্তি হচ্ছেন।
স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থানের হার নির্ণয়ে ২০২২ সালে একটি গবেষণা চালায় কারিগরি শিক্ষা বোর্ড। গবেষণায় দেখা যায়, সিরামিকস বিষয়ে ডিপ্লোমা ডিগ্রিধারীদের মধ্যে বেকারত্বের হার সবচেয়ে কম। তাদের মধ্যে ৯১ শতাংশই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মে রয়েছেন। গ্লাস টেকনোলজিতে এ হার ৬৯ শতাংশ।
চাকরির বাজারে সম্ভাবনা থাকলেও প্রতি বছরই প্রতিষ্ঠানটিতে উল্লেখযোগ্য আসন ফাঁকা থাকছে। প্রতিষ্ঠানটিতে বর্তমানে সিরামিক টেকনোলজিতে দুই শিফটে ৩০০ ও গ্লাস টেকনোলজিতে দুই শিফটে ১০০ শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়। সর্বশেষ শিক্ষাবর্ষে দুই টেকনোলজিতে ৪০০ আসনের বিপরীতে মোট ভর্তি হন ২৬৯ জন।
ব্যানবেইসের শিক্ষা পরিসংখ্যান বলছে, চার বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটিতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমছে। ২০২০ সালে প্রতিষ্ঠানটিতে শিক্ষার্থী ছিল ১ হাজার ২৮৪ জন। পরের বছর কমে দাঁড়ায় ৯৭৮ জনে। ২০২২ সালেও ভর্তি হন ৯৭৮ জন। সর্বশেষ গত বছর এ সংখ্যা আরো কমে দাঁড়িয়েছে ৯০৮-এ। প্রতিষ্ঠানটিতে অনেক শিক্ষার্থী ঝরেও পড়েন। সর্বশেষ ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের প্রথম সেমিস্টারে ২৬৯ জন ভর্তি হলেও রেজিস্ট্রেশন করেন ২৪২ জন।
প্রতিষ্ঠানটিতে ছাত্রীও কমেছে। ২০২০ সালে ছাত্রী ছিলেন ৪৮ জন। ২০২১ সালে এ সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ৩৬-এ। শিক্ষার্থীদের ধারণা, বর্তমানে ছাত্রী সংখ্যা আরো কমেছে।
প্রতিষ্ঠানসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডিপ্লোমা পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের নিজ জেলার কাছাকাছি থাকার প্রবণতা, প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে অজ্ঞতা, ঢাকায় মানিয়ে নিতে না পারা এবং ছাত্রীদের আবাসনের ব্যবস্থা না থাকায় অনেক শিক্ষার্থী এখানে ভর্তি হতে চান না।
প্রতিষ্ঠানটির বেশির ভাগ শিক্ষার্থী মনে করেন, আবাসন সংকটই এখানকার প্রধান সমস্যা। এ কারণেই অনেক শিক্ষার্থী ঝরে পড়েছেন। এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমার পরিবারের আর্থিক অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। এখনো হলে সুযোগ পাইনি। ঢাকায় যে খরচ, তা বহন করা অসম্ভব হয়ে যাচ্ছে। যারা বিভিন্ন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে তারা লেখাপড়ার পাশাপাশি টিউশনের মাধ্যমে নিজেদের খরচ চালিয়ে নিতে পারে। কিন্তু আমাদের ক্ষেত্রে সে সুযোগ নেই বললেই চলে। এরই মধ্যে আমার বেশ কয়েকজন সহপাঠী চলে গেছে। আমিও এখানে লেখাপড়া শেষ করতে পারব কিনা সন্দিহান।’
প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ মো. সামসাদ খলিল বলেন, ‘চাকরির বাজারের বিষয়টি বিবেচনা করলে আমাদের শিক্ষার্থীরা খুবই ভালো করছে। তবে এটা ঠিক যে এর পরও আমাদের কিছু আসন শূন্য থাকছে। এর পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ থাকতে পারে। যেমন আমাদের দেশে এখনো কারিগরি শিক্ষা নিয়ে কিছুটা নেতিবাচক ধারণা রয়েছে। দেখা যায়, যে ছেলে বা মেয়ে লেখাপড়ায় একটু পিছিয়ে আছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাদের কারিগরিতে ভর্তি করা হয়। ফলে অনেকের কাছে হয়তো আমাদের সিলেবাস তুলনামূলক কঠিন মনে হতে পারে। আবার অনেক শিক্ষার্থী ও অভিভাবক প্রতিষ্ঠানটি সম্পর্কে ভালোভাবে অবগতও নন। এছাড়া অনেক সময় দেখা যায়, শিক্ষার্থীরা নিজের বাড়ির কাছাকাছি প্রতিষ্ঠানে পড়তে চায়, ঢাকায় আসতে চায় না। কিছু শিক্ষার্থী আবার ভর্তির পর ঢাকার পরিবেশে মানিয়ে নিতে না পেরেও ঝরে পড়ে।’
তবে ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠানটির প্রতি আগ্রহ বাড়বে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘শিক্ষক, ল্যাবসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার কথা বিবেচনা করা হলে আমরা বেশ ভালো অবস্থানে রয়েছি। এছাড়া দেশে সিরামিক ও গ্লাস উভয় প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাই বাড়ছে। বিশেষ করে সিরামিক শিল্প দ্রুত বাড়ছে। আমরা নিয়মিত ইন্ডাস্ট্রি মালিকদের সঙ্গে সভা-সেমিনার করছি।’
অধ্যক্ষ আরো বলেন, ‘বাজারের চাহিদার কথা বিবেচনা করেই আমাদের শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করা হচ্ছে। এছাড়া ছাত্রীহল নির্মাণসহ ইনস্টিটিউটের উন্নয়নে বেশকিছু পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অপক্ষায় রয়েছে। প্রতিষ্ঠানের সুযোগ-সুবিধা বাড়লে এবং চাকরির বাজারে আমাদের শিক্ষার্থীদের সফলতা অব্যাহত থাকলে স্বাভাবিকভাবেই এ প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বাড়বে।’
প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু ১৯৫১ সালের ১১ মার্চ। শুরুতে নাম ছিল “ইস্ট বেঙ্গল সিরামিকস ইনস্টিটিউট। ১৯৬০ সালে এর নাম হয় ‘ইস্ট পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব গ্লাস অ্যান্ড সিরামিকস’। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে আরেকবার পরিবর্তন করে হয় ‘বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব গ্লাস অ্যান্ড সিরামিকস’।
৭৩ বছরের পুরনো এ প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী সংখ্যা কমার কারণ হিসেবে প্রচারণার অভাবই দায়ী বলে মনে করছেন বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডর চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত দায়িত্ব) অধ্যাপক মো. মামুন উল হক। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘আমরা কিছুদিন আগে চাকরির বাজারে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের অবস্থান নিয়ে একটা গবেষণা করেছিলাম। ওই গবেষণা অনুযায়ী, গ্লাস অ্যান্ড সিরামিক ইনস্টিটিউটের কোনো শিক্ষার্থী বেকার নেই বললেই চলে। এর পরও প্রতিষ্ঠানটিতে শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার কারণ মূলত প্রচারণার অভাব।’
মো. মামুন উল হক বলেন, ‘প্রচারণার বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির যেমন খুব বেশি উদ্যোগ নেই, তেমনি আমাদের বোর্ডের পক্ষ থেকেও আলাদা প্রচার চালানো হয় না। আমরা সার্বিকভাবে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে প্রচার চালাই। প্রতিষ্ঠানটির জন্য আলাদা প্রচার চালানো গেলে শিক্ষার্থী ভর্তি বাড়ত। প্রতিষ্ঠানটির ল্যাব ও পাঠ্যক্রমের আধুনিকায়নও প্রয়োজন।’
ইনস্টিটিউটের উন্নয়নে কিছু উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে সিরামিক শিল্পে জনবলের চাহিদা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। বিষয়টি বিবেচনা করে আমরা এ ইনস্টিটিউটের সঙ্গে ইন্ডাস্ট্রির সংযোগ আরো বাড়ানোর চেষ্টা করছি। এরই মধ্যে এ বিষয়ে বেশকিছু উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। যেমন একজন শিক্ষর্থীকে শুরু দিকেই ইন্ডাস্ট্রিতে সংযুক্ত করে নেয়া হবে এবং সে যদি ২ সপ্তাহ ইন্ডাস্ট্রিতে চাকরি করে তাহলে পরবর্তী দুই সপ্তাহ ক্লাস করবে। এর ফলে তাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা হবে এবং দক্ষ হয়ে উঠবে। এমন একটি ব্যবস্থা এই ইনস্টিটিউট থেকেই চালু করা যায় কিনা আমরা ভাবছি। ছাত্রীহল নির্মাণসহ কয়েকটি কাজ শুরুর অপেক্ষায় রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির যথাযথ প্রচার চালানো গেলে এবং সুযোগ-সুবিধা বাড়লে শিক্ষার্থী সংকট থাকবে না।’










