ইউরোপ, আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মূল্যস্ফীতি চরম আকার ধারণ করেছে, যার প্রভাবে পোশাক শিল্পের কাঁচামালের দাম বেড়েছে অস্বাভাবিক হারে। বিদেশী ক্রেতারা রফতানি আদেশ কমিয়ে দিয়েছে। যেসব রফতানি আদেশ এরই মধ্যে দিয়েছে, তাও ধীরগতিতে শিপমেন্টের জন্য বলছে। অনেক ক্ষেত্রে বাতিল হচ্ছে রফতানি আদেশ। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে পণ্য নিলেও ক্রেতার পক্ষ থেকে অর্থ পরিশোধ বিলম্বিত হচ্ছে। উদ্যোক্তাদের দাবি, কভিডকালের চেয়েও অর্থ প্রত্যাবাসনে বিলম্বের ঘটনা অনেক বেশি। এ প্রেক্ষাপটে পোশাক শিল্পের উদ্যোক্তারা বৈদেশিক মুদ্রাবিধি শিথিলের দাবি জানিয়েছেন।

পোশাকপণ্য প্রস্তুত ও রফতানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএর সূত্র অনুযায়ী, করোনা অতিমারী ও করোনা-পরবর্তী রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে গভীর সংকটের মধ্যে পড়েছে রফতানিমুখী তৈরি পোশাক শিল্প খাত। বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্বিক সহযোগিতায় করোনাকালে অনেক ধরনের ব্যাংকিং সমস্যা থেকে উত্তরণে সক্ষম হয়েছেন শিল্প মালিকরা। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিসহায়তায় তৈরি পোশাক শিল্প খাত তথা রফতানি বাণিজ্যকে চলমান রাখার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন উদ্যোক্তারা। কিন্তু দেশে বিদ্যমান ডলার সংকটে পণ্যের অর্থ প্রত্যাবাসনে ক্রেতাদের দেরিতে রফতানিকারকরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।

শিল্প মালিকরা জানিয়েছেন, ‘করোনা সংকট থেকে উত্তরণের আগেই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে পুনরায় গভীর সংকটে পড়েছে পোশাক শিল্প, যার প্রভাব এরই মধ্যে দৃশ্যমান হয়েছে রফতানি বাণিজ্যে। গত সেপ্টেম্বরে রফতানি প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক ছিল। বছরের পরবর্তী মাসগুলোতেও রফতানি প্রবৃদ্ধির ঋণাত্মক ধারা অব্যাহত থাকবে এমন শঙ্কা রয়েছে। ইউরোপ-আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মূল্যস্ফীতি চরম আকার ধারণ করেছে, যার প্রভাবে শিল্পের কাঁচামালের দাম বেড়েছে অস্বাভাবিক হারে।’

বিদেশী ক্রেতারা রফতানি আদেশ কমিয়ে দিয়েছে জানিয়ে পোশাক শিল্পের উদ্যোক্তারা বলছেন, যেসব রফতানি আদেশ এরই মধ্যে দিয়েছে, তা ধীরগতিতে শিপমেন্টের জন্য বলছে এবং অনেক ক্ষেত্রে আদেশ বাতিল করছে। এতে রফতানিকারকরা রয়েছে সংকটে। ফলে কিছু রফতানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠান তাদের শ্রমিক-কর্মচারীর বেতন-ভাতা সময়মতো পরিশোধ করতে পারছে না। যার ফলে শ্রমিক অসন্তোষও দেখা দিচ্ছে।

জানতে চাইলে নিট পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারকদের সংগঠন বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পণ্য নিলেও ক্রেতারা অর্থ পরিশোধে বিলম্ব করছে। কভিডকাল থেকেই এ সমস্যা মোকাবেলা করতে হচ্ছে আমাদের। তবে এখন সমস্যাটি আরো প্রকট হয়েছে। ফলে বৈদেশিক মুদ্রাবিধি শিথিল করা খুবই প্রয়োজন।’

বিজিএমইএ সূত্র জানিয়েছে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং বর্তমান বিশ্ব অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের ফলে সৃষ্ট কিছু ব্যাংকিং বিষয় (সমস্যা) নিয়ে ১২ ডিসেম্বর এফবিসিসিআইয়ের নেতৃত্বে সব বাণিজ্য সংগঠনের প্রতিনিধি গভর্নরের সঙ্গে সভা করেছেন। সেখানেও বৈদেশিক মুদ্রাবিধি প্রয়োগে বিরাজমান সমস্যাগুলো নিরসনের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে আশ্বস্ত করা হয়।

বিজিএমইএ বলছে, নীতিসহায়তা ব্যবহার করেই রফতানি সক্ষমতা বজায় রাখা সম্ভব। বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটাপন্ন অবস্থা, রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে চলমান যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে সৃষ্ট সমস্যা মোকাবেলা করে রফতানি বাণিজ্যের সক্ষমতা বজায় রাখার জন্য বৈদেশিক মুদ্রাবিধি শিথিলের গুরুত্ব অপরিসীম। এক্ষেত্রে ২০২১ সালের ১৪ মার্চ বাংলাদেশ ব্যাংক একটি প্রজ্ঞাপন জারি করেছিল, যেখানে রফতানির অর্থ প্রত্যাবাসনে সময়সীমা ২১০ দিন করা হয়েছিল। আবার রফতানি উন্নয়ন তহবিলের সুবিধাপ্রাপ্তির সময়সীমাও বাড়ানো হয় সেই প্রজ্ঞাপনে। মূল ঋণপত্রের বিপরীতে ব্যাক টু ব্যাক এলসির অর্থ পরিশোধের সময়সীমাও বাড়ানো হয়। ওই সার্কুলারের মেয়াদ ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানোর পাশাপাশি আরো বেশকিছু বিষয়ে বৈদেশিক মুদ্রাবিধির শিথিলতা প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিজিএমইএ জানিয়েছে, ইএক্সপি ওভারডিউ হওয়ার ফলে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর রফতানি উন্নয়ন তহবিল (ইডিএফ) থেকে সুবিধাপ্রাপ্তি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এক্ষেত্রে রফতানিকারকদের জন্য ইডিএফ তহবিল ব্যবহার, নগদ সহায়তা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার বিষয়টি আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত অব্যাহত রাখতে নির্দেশনা জারি করা হয়। এটাই চাইছেন পোশাক শিল্প মালিকরা।

রফতানির বৃহত্তর স্বার্থে ইডিএফের বিপরীতে খোলা ব্যাক টু ব্যাক এলসির রফতানি মূল্য ১৮০ দিনের পর প্রত্যাবাসন হলেও তা সমন্বয় করার সুযোগ দিয়ে প্রজ্ঞাপনের সংশোধনীও দাবি করছে বিজিএমইএ।

জানতে চাইলে বিজিএমইএর সহসভাপতি শহিদউল্লাহ আজিম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অনেক রফতানিকারক আছেন যাদের পণ্য ক্রেতার কাছে পৌঁছার পরও অর্থ পরিশোধে দেরি হচ্ছে। এ সমস্যা কভিডকালের চেয়েও এখন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। দেশে এখন ডলার সংকট রয়েছে, কিন্তু বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে ক্রেতাদের দুরবস্থা নিয়ে আমাদের কিছুই করার নেই। নিরুপায় হয়েই বৈদেশিক মুদ্রাবিধি শিথিলের প্রত্যাশা করা হচ্ছে।’